করোনা ভাইরাস : লকডাউনের কারণে ধর্মীয় উৎসবে কাটছাঁটে ক্ষেপেছেন নেপালের হিন্দু ও বৌদ্ধ নেতারা

একটি রথে বসানো কুমারী দেবীর মূর্তি

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, একটি রথে বসানো কুমারী দেবীর মূর্তি
    • Author, ফণীন্দ্র দাহাল
    • Role, বিবিসি নেপালি, কাঠমান্ডু

নেপালে করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে শত শত বছরের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও উৎসবে নানা রকম কাটছাঁট করছে সেদেশের সরকার।

কিন্তু এর কড়া সমালোচনা করেছেন হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মীয় নেতারা।

তারা বলছেন, এতে দেবতারা ক্রুদ্ধ হবেন এবং তা দেশের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

মার্চ মাস থেকে নেপালে লকডাউনের কারণে মন্দিরগুলো বন্ধ। এক জায়গায় বহু লোকের সমাবেশও নিষিদ্ধ।

এ কারণে হিন্দু ও বৌদ্ধ সংস্কৃতির মিলনস্থল এই নেপালে খুব কম ধর্মীয় উৎসবই হতে পেরেছে।

রাজধানী কাঠমান্ডুতে বিভিন্ন দেবদেবীর সম্মানে বিপুল পরিমাণ লোকজন নিয়ে রথযাত্রা হয়ে থাকে। এগুলো এবার হয় বাতিল করা হয়েছে অথবা ছোট আকারে অনুষ্ঠান করা হয়েছে।

এরকম একটি অনুষ্ঠান সংক্ষিপ্ত করাকে কেন্দ্র করে লোকে এত ক্ষুব্ধ হয় যে সংঘর্ষ বেঁধে যায়।

কৃষির দেবতার সম্মানে একটি রথযাত্রা হয় - যার নাম রাতো মাছিন্দ্রনাথ যাত্রা । গত মাসে ভক্তেরা লকডাউন ভেঙে এই শোভাযাত্রা করতে গেলে দক্ষিণ কাঠমান্ডুতে সংঘর্ষ বেঁধে যায়।

পরে তা পুলিশের উপস্থিতিতে ছোট আকারে পালন করা হয়।

'ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত'

রাতো মাছিন্দ্রনাথ যাত্রার প্রধান পুরোহিত কপিল বজ্রাচারিয়া বলেন, ধর্মীয় কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে সরকার দায়িত্বহীন কাজ করেছে।

"আমার পরিবার শত শত বছর ধরে এ অনুষ্ঠান করছে, কখনো এটা বাতিল হয়নি। আমাকে যে রথযাত্রা করতে দেয়া হয়নি এটা আমাকে গভীর দু:খ দিয়েছে" - বলেন এই ৭২ বছর বয়স্ক পুরোহিত।

"আমি মনে করি নেপাল হচ্ছে দেবতাদের পবিত্র আবাসভূমি। দেবতারা যদি রেগে যান তাহলে আমরা করোনাভাইরাসের চেয়েও গুরুতর বিপদের মধ্যে পড়বো। নেপাল সরকার যেভাবে ধর্মকে নিয়ন্ত্রণ করছে তা নিয়ে আমার গুরুতর আপত্তি আছে - আমার মতে এটা পাপের শামিল। "

কপিল বজ্রাচারিয়া

ছবির উৎস, Bikram Bajracharya

ছবির ক্যাপশান, কপিল বজ্রাচারিয়া

বাবুরাজা জিয়াপু পাতান শহরের একজন ব্যবসায়ী। তিনি বিশ্বাস করেন যে নেপালি সরকারের পদক্ষেপ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিচ্ছে।

তিনি বলেন, "আমার মতে জনগণ ধর্মীয় স্থানগুলোতে যেতে চায়। সরকার যদি এধরনের বিধিনিষেধ চালিয়ে যায় তাহলে লোকের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেবে। "

তবে অন্য অনেকে মনে করেন এবছর যা হচ্ছে তাকে ব্যতিক্রম হিসেবেই দেখা উচিত, এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত হবার পরই ধর্মীয় উৎসবগুলো হতে পারে।

মাস্ক ও স্যানিটাইজার ব্যবহার করছেন 'জীবন্ত দেবী'

অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে নেপালে দুটি বড় ধর্মীয় উৎসব রয়েছে - যার একটি হলো দাশাইন এবং অপরটি তিহার।

নেপালে হিন্দু দেবী দুর্গার অবতার হিসেবে একটি কুমারী মেয়েকে পূজা করা হয় এবং তাতে হিন্দু ও বৌদ্ধ উভয়ে ধর্মের লোকেরাই অংশ নেয়।

এই 'জীবন্ত দেবী'কে এখন কুমারী ঘর নামে একটি বাড়িতে রাখা হয়েছে। তিনি মাস্ক এবং স্যানিটাইজার ব্যবহার করছেন এবং তার সাথে অন্য কাউকে দেখা করতে দেয়া হচ্ছে না, - জানান তার কেয়ারটেকার গৌতম শাক্য।

কাঠমান্ডু শহরের প্যালেস স্কোয়ারে একটি বিশেষ মন্দিরে তিনি বাস করছেন। তিনি জানান, তিনি করোনাভাইরাস থেকে নিরাপদ থাকার নিয়মকানুন মেনে চলছেন।

তার মতে, এবার হয়তো বড় আকারে দাশাইন উৎসব হবে না।

বিকাশ কর্মাচারিয়া

ছবির উৎস, Bishal Karmacharya

ছবির ক্যাপশান, বিকাশ কর্মাচারিয়া

এ উৎসবের অষ্টম দিনে তালেজু মন্দিরে জীবন্ত দেবী কুমারীর উপস্থিত হবার কথা আছে। তবে এ নিয়ে সরকারের সাথে কোন আলোচনা হয়নি বলে জানান মি.শাক্য।

"আমরা দেবীকে সেখানে নিয়ে যাবার ঝুঁকি নিতে পারি না, " বলেন মি. শাক্য "অনেকে বলছেন আমরা যদি যথাযথভাবে পূজা না করি তাহলে খারাপ কিছু ঘটতে পারে, কিন্তু আমার মতে আমাদের বাস্তববাদী হতে হবে, আমরা যদি বেঁচে থাকি তাহলেই তো আমরা আমাদের সংস্কৃতিকে ভবিষ্যতের জন্য ধরে রাখতে পারবো।"

'দেবদেবীদের না মানলে হিতে বিপরীত হতে পারে'

সরকারের পদক্ষেপ সমর্থন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা চক্র বাহাদুর বুধা বলছেন, তারা মানুষজনকে সামাজিক দূরত্ব ও শৃংখলা রক্ষা করে চলতে বলেছেন।

কিন্তু সরকারের পদক্ষেপ দেখে খুবই রেগে গেছেন পদ্ম শ্রেষ্ঠ ।

"সরকার ভীতিকর পরিস্থিতি করেছে, লোকজন ক্ষেপে গেছে। শত শত বছরের পুরোনো পূজা-আচার নিষিদ্ধ করলে লোকজন ধর্ম বা সরকার - সবকিছুর ওপরই বিশ্বাস হারিয়ে ফেলবে" - বলেন তিনি।

তবে নেপালের প্রবীণ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সত্য মোহন বলছেন, ধর্মীয় উৎসবের কথা না বলে মানুষের এখন বিজ্ঞান মেনে চলা উচিত।

সত্য মোহন

ছবির উৎস, Keshav P Koirala

ছবির ক্যাপশান, সত্য মোহন

একশ' এক বছর বয়স্ক এই বিশেষজ্ঞ বলেন, আগে মহামারিকে দেখা হতো দেবতার অভিশাপ হিসেবে। তখন লোকে কাঠমান্ডুর রাস্তায় জড়ো হয়ে দেবতাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে তাদের প্রতি খাদ্য উৎসর্গ করতো, প্রার্থনা করতো।

"এগুলো এখন সেকেলে চিন্তায় পরিণত হয়েছে" - বলেন তিনি।

তবে কাঠমান্ডুর এক দোকানদার হরিশংকর প্রজাপতি বলেন, যে কোন লোকসমাগম থেকেই ব্যাপক সংক্রমণ ছড়াতে পারে।

"আমার মতে স্বাস্থ্য সবার আগে, কারণ স্বাস্থ্য ভাল না থাকতে আমরা ধর্ম পালন করতেই পারবো না। "

মাঝামাঝি পথ নিচ্ছেন স্কুল শিক্ষক বিকাশ কর্মাচারিয়া। তিনি বলছেন, নিরাপদভাবে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ধর্মীয় উৎসব করা উচিত।

হরিশংকর প্রজাপতি
ছবির ক্যাপশান, হরিশংকর প্রজাপতি

তার কথা "দেবদেবীদের সম্মান না করলে হিতে বিপরীত হতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে ঈশ্বরই আমাদের শক্তির উৎস। "

সেপ্টেম্বর মাসের শেষ নাগাদ নেপালে প্রায় ৭৮,০০০ লোকের করোনাভাইরাস সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে, মারা গেছেন ৫০০ জন।

কাঠমান্ডুতে সংক্রমণ এখনো বাড়ছে। সবার ভয়, উৎসবের জন্য লোকে বাড়ি যাওয়া শুরু করলে করোনাভাইরাস আরো ছড়াবে।

আরো পড়তে পারেন: