সৌদি আরবে গৃহকর্মী : 'এক কুলসুমের লাশ ফিরেছে, আরো কত কুলসুমের লাশ মর্গে পড়ে আছে হিসেব নেই'

ছবির উৎস, NurPhoto
সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে যাওয়া বাংলাদেশি কিশোরী কুলসুমের মৃতদেহ দেশে আসার পর সৌদি আরবে বাংলাদেশি নারী কর্মীদের সাথে হওয়া নির্যাতন ও অনিয়মের বিষয়গুলো আবারো আলোচনায় উঠে এসেছে।
গত বছরের এপ্রিল মাসে একটি বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে কুলসুম সৌদি আরব যায়। এবছরের অগাস্টের শুরুর দিকে তার পরিবার কুলসুমের মৃত্যুর কথা জানতে পারে।
কুলসুমের মা নাসিমা বেগম জানান এবছর মে মাসে কুলসুম যখন ফোন করে তখন তারা জানতে পারেন যে সৌদি আরবে গৃহকর্তার অত্যাচারে তার দুই পা, কোমড়, একটি হাত ও একটি চোখ নষ্ট হয় গেছে। সেসময় কুলসুম হাসপাতালে ছিল।
নাসিমা বেগম বলেন, "আমার মেয়ে বারবার ফোন করে আমাদের বলেছে তাকে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে। যার মাধ্যমে সে সৌদি আরব যায়, তার কাছে বারবার গিয়ে বলি আমার মেয়েকে ফিরিয়ে আনায় সাহায্য করতে, তার ভিডিও, ছবি দেখাই। কিন্তু তারা আমাদের কোনো সাহায্যই করেনি।"
কুলসুমের মা জানান গত বছরের এপ্রিলে সৌদি আরব যাওয়ার পর প্রথম কয়েকমাস নিয়মিত বাড়িতে টাকা পাঠালেও তারপর বেশ কয়েকমাস সে কোনো টাকাও পাঠায়নি। ঐ সময়ে সৌদি আরব থেকে তার কোনো খবরও পাওয়া যায়নি।
কয়েকমাস খবর না থাকার পরে এবছরের মে মাসে কুলসুমের সাথে কথা হওয়ার পর তার সাথে হওয়া শারীরিক নির্যাতনের বিষয়ে জানতে পারে তার পরিবার।
আরো পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, র্যাব
পরে অগাস্টের শুরুর দিকে তার পরিবার কুলসুমের মৃত্যুর খবর জানতে পারে। একমাস পর গত শনিবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তার পরিবারের কাছে কুলসুমের মরদেহ হস্তান্তর করা হয়।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায় কুলসুমের মরদেহে স্পষ্ট আঘাতের চিহ্ন থাকলেও সৌদি আরব থেকে দেয়া মৃত্যুর সনদে মৃত্যুর কারণে 'স্বাভাবিক মৃত্যু' উল্লেখ করা ছিল।
সৌদি আরব থেকে এর আগেও বাংলাদেশি নারী গৃহকর্মীর মরদেহ আসার ঘটনা ঘটলেও কুলসুমের মৃত্যুর ঘটনা আলোচনা তৈরি করার পেছন প্রধান কারণ - কুলসুমের বয়স ছিল ১৪।
অপ্রাপ্তবয়স্ক হলেও তাকে সৌদি আরবে পাঠানোর জন্য রিক্রুটিং এজেন্সি'র কর্মকর্তারা বয়স বাড়িয়ে ভুয়া পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট বানিয়ে সৌদি আরব পাঠায়।
এই ঘটনায় কুলসুমের পরিবার বাদী হয়ে একটি মামলা করে। ঐ মামলার জের ধরে বৃহস্পতিবার ঢাকার ফকিরাপুল এলাকা থেকে এম এইচ ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের দুইজন কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করে র্যাব।

ছবির উৎস, NURPHOTO
'নির্যাতনের শিকার কত নারী আসার অপেক্ষায় রয়েছেন হিসাব নেই'
বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকরে অভিবাসন কর্মসূচীর গত বছরের হিসেব অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে এ পর্যন্ত সৌদি আরবে ৩ লাখ ৩০ হাজারের বেশি নারী কর্মী গিয়েছেন।
এই নারীদের প্রায় শতভাগই সৌদি আরবে গিয়েছেন গৃহকর্মী হিসেবে। এদের অনেকে নির্যাতনের শিকার হয়ে, মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে, সৌদি আরবে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সময় পার করে দেশে ফিরেছেন। কেউ কেউ আবার ফিরেছেন লাশ হয়ে।
গত কয়েক বছরে সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশি নারী কর্মীদের ফেরত আসার হার আগের তুলনায় বেড়েছে বলে মনে করে অভিবাসন নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থাগুলো।
এরকম একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নারী শ্রমিক কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম বলেন সৌদি আরবে নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরতে চায়, এরকম কত নারী শ্রমিক রয়েছে তার সঠিক হিসাব নেই।

ছবির উৎস, Getty Images
সুমাইয়া ইসলাম বলেন, "একটা কুলসুমের লাশ ফিরে এসেছে। কিন্তু আরো কত কুলসুম যে সৌদি আরবে নির্যাতিত, নিগৃহীত হচ্ছে, সেখানকার মর্গে দিনের পর দিন কতজনের লাশ পরে আছে, তার কোনো হিসেব নেই।"
ফিরে আসা এই নারী শ্রমিকরা ধর্ষণ, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগের পাশাপাশি এমন অভিযোগও তুলছেন যে তাদের খাবার দেয়া হতো না এবং চুক্তি অনুযায়ী বেতন দেয়া হতো না।
আর সাম্প্রতিক সময়ে নারী শ্রমিকদের মৃতদেহ দেশে আসার হারও বেড়েছে বলে মনে করছে অভিবাসন বিষয়ক সংস্থাগুলো।
বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচীর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের প্রথম ১০ মাসে শুধু সৌদি আরব থেকেই ৪৮ জন গৃহকর্মীর মৃতদেহ দেশে আনা হয়, যাদের মধ্যে ২০ জনই সৌদি আরবে নির্যাতনের অভিযোগ তুলে আত্মহত্যা করেছেন বলে জানানো হয়।
বাংলাদেশের নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়ে আলোচনা করতে গত বছর প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের একটি দল সৌদি আরব সফর করলেও নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা ব্যাপারে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।








