নারায়ণগঞ্জ মসজিদ বিস্ফোরণ: নিষ্কন্টক জমি ছাড়া কি মসজিদ নির্মাণ করা যায়, ইসলামের ব্যাখ্যা কী?

ছবির উৎস, Monir Hossain
- Author, কাদির কল্লোল
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
বাংলাদেশে নারায়ণগঞ্জের মসজিদে বিস্ফোরণে অনেক মানুষের হতাহতের ঘটনার পর মসজিদ নির্মাণের অনুমোদনের ইস্যুসহ নিরাপত্তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
ইসলামী চিন্তাবিদরা বলেছেন, ইসলামী ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে যে, একেবারে নিষ্কন্টক জমি না হলে এবং পুরোপুরি স্বচ্ছ্বতা ছাড়া কোন মসজিদ নির্মাণ করা যায় না।
মসজিদের ইমামদের একটি সংগঠন জাতীয় ইমাম সমিতির যুগ্ম মহাসচিব এবং লেখক মো: ওসমান গণি বলেছেন, ইসলাম ধর্মে মসজিদ নির্মাণে পুরোপুরি স্বচ্ছ্ব থাকার কথা বলা হয়েছে।
ইসলামের নবীর মসজিদ নির্মাণের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেছেন, "রসুল আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদ নির্মাণের জন্য যে জায়গাটি পছন্দ করলেন, খবর নিলেন যে জায়গাটি কার- জানা গেলো দুই ভাইয়ের জায়গা। তারা যখন জানতে পারলো, নবীজী জায়গাটা মসজিদের জন্য পছন্দ করেছেন, তখন তারা জায়গাটা ফ্রিতে (বিনামূল্যে) দিতে চাইলো। নবীজী বললেন যে, না আমি তোমাদের জায়গা ফ্রিতে নেবো না। তখন নবী করীম (সা:) এটার জন্য একটা ফাণ্ড ক্রিয়েট করলেন এবং সেই ফাণ্ড থেকে উপযুক্ত বাজার মূল্য পরিশোধ করে তারপর সেখানে তিনি মসজিদ কমপ্লেক্স নির্মাণ করলেন। মদিনা শরীফ নামে পরিচিত মসজিদে নববী যেটি।"
ইসলামী ব্যাখ্যায় স্বচ্ছ্বতার বিষয়কেই গুরুত্ব দেয়া হয়েছে বলে তিনি বলেন।
বাংলাদেশের আইনে কি ব্যবস্থা বলা আছে?
বাংলাদেশের কর্মকর্তারা বলেছেন, অন্য সব স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে যেমন নকশা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনুমোদনের প্রয়োজন হয়, মসজিদের ক্ষেত্রেও সেগুলো অনুসরণ করা প্রয়োজন।
কিন্তু মসজিদের নির্মাণ থেকে শুরু করে নিরাপত্তার প্রশ্নে মনিটরিংয়ের কোন নীতিমালা নেই।
সরকারের ইসলামিক ফাউণ্ডেশনের মহাপরিচালক আনিস মাহমুদ বলেছেন, মসজিদের জায়গার বৈধতা এবং নিরাপত্তাসহ সার্বিক বিষয় মনিটর করার জন্য কোন সুনির্দিষ্ট নীতিমালা এবং প্রাতিষ্ঠানিক কোন কাঠামো নেই।
অনেকদিন ধরে ঝুলে থাকা একটি নীতিমালার খসড়া এখন চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নেয়ার কথাও তিনি জানিয়েছেন।
একইসাথে তিনি বলেছেন, নীতিমালা করতে যেহেতু সময় প্রয়োজন, ফলে এই মুহূর্তে নীতিমালা না থাকলেও সারাদেশে মসজিদের নিরাপত্তা খতিয়ে দেখার উদ্যোগ তারা নিচ্ছেন।
বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

নারায়ণগঞ্জের যে মসজিদে বিস্ফোরণ ঘটে, সেই মসজিদের মেঝের নিচে দিয়ে গ্যাসের লাইন থাকার বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে স্থানীয়ভাবে নির্মিত এই মসজিদে বিদ্যুতের দু'টি লাইনের একটি অবৈধ বলে অভিযোগ উঠেছে।
ওয়াকফ অধ্যাদেশ অনুযায়ী জায়গা নিয়ে সেখানে মসজিদ করা হয়েছে কিনা-এই বিষয়টিও সরকারি তদন্ত কমিটি খতিয়ে দেখবে বলে বলা হয়েছে।
এই মসজিদের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি আব্দুল গফুর বলেছেন, মসজিদের নকশা এবং নির্মাণসহ বিভিন্ন বিষয়ে অনুমোদন আছে কিনা-তা তার জানা নাই।
"তারাবারি নামাজের জন্য বিদ্যুতের দু'টা লাইন নেয়া হয়েছে। এটা নারায়ণগঞ্জে বিদ্যুতের কর্মকর্তাকে মৌখিকভাবে বলে এক মাসের জন্য বাড়তি লাইনটা নেয়া হয়েছিল। কিন্তু একটা লাইন বৈধ।"
তিনি আরও বলেছেন, "মসজিদের নকশা এবং এটা কিভাবে নির্মাণ করেছে, এর অনুমতি নিছে কিনা-এগুলো বলতে পারতাম না। আমরাতো নতুন কমিটিতে এসেছি। পুরোনোরাতো অনেকে বেঁচে নাই।"

ছবির উৎস, NURPHOTO
এখন মসজিদ নির্মাণে অনুমোদনের বিষয় সহ নিরাপত্তার নানা প্রশ্ন আলোচনায় এসেছে।
মালিকানার দাবি না রেখে জায়গা মসজিদের জন্য দিয়ে দেয়া হলে সেটাকে নির্ধারিত একটি আইন অনুযায়ী ওয়াকফ সম্পত্তি হিসাবে অনুমোদন নিতে হয়।
এভাবে অনেক মসজিদ গড়ে উঠেছে।
সারাদেশে ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা তিন লাখের বেশি মসজিদ রয়েছে।
ইসলামিক ফাউণ্ডেশনের অধীনে রয়েছে বায়তুল মোকাররম মসজিদসহ দেশে মাত্র চারটি মসজিদ ।
ইসলামিক ফাউণ্ডেশনের মহাপরিচালক আনিস মাহমুদ বলেছেন, যেসব প্রশ্ন এখন উঠছে, সেগুলো মনিটরিংয়ের উদ্যোগ এখন তারা নিচ্ছেন।
"বর্তমান ঘটনার পরে ধর্ম মন্ত্রণালয় একটা উদ্যোগ নিচ্ছে যে এই মনিটরিংয়ের ব্যাপারে একটা নীতিমালা খসড়া পর্যায়ে ছিল। সেটাকে আরও হালনাগাদ করে দ্রুত চুড়ান্ত করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এই মুহূর্তে সুনির্দিষ্ট কোন নীতিমালা নেই। জায়গার ব্যাপারে যেমন খাসজমিতে মসজিদ করতে হলে অবশ্যই সরকারের কাছ থেকে সেই জমির বন্দোবস্ত নিতে হবে। আর বিদ্যুৎ এবং গ্যাসের ব্যাপারে সেসব বিভাগের অনুমতি নিতে হবে। এই নিয়মগুলো অন্যদের সবার মতো মসজিদকেও মানতে হয়।"
তিনি আরও বলেছেন, "আমরা একটা উদ্যোগ নিচ্ছি। এখন সারাদেশে মসজিদগুলোর নিমার্ণের অনুমোদনসহ নিরাপত্তার বিষয়গুলো কী অবস্থায় আছে, সেগুলো স্থানীয় প্রশাসন এবং আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নিয়ে আমরা হয়তো পদক্ষেপ নেবো।"
নারায়ণগঞ্জের ঘটনা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে গত রোববার সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, যারা অপরিকল্পিতভাবে যেখানে সেখানে মসজিদ গড়ে তুলছেন, সেই জায়গা স্থাপনা করার মতো কিনা বা যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি আছে কিনা- এসব বিষয় খতিয়ে দেখা দরকার।
ইসলামী চিন্তাবিদদেরও অনেকে বলেছেন, অনেক সময় স্বার্থন্বেষী মহল সরকারি জায়গা, এমনকী নদী খাল দখলের ক্ষেত্রে মসজিদের ব্যানার ব্যবহার করে থাকে এবং সেখানে মসজিদ নির্মাণে যথাযথ কর্তৃপক্ষে অনুমতি থাকে না। কিন্তু আবেগ এবং ধর্মীয় বিষয় হওয়ায় কর্তৃপক্ষও নীরব থাকে বলে তারা মনে করেন।

ছবির উৎস, Getty Images
জাতীয় ইমাম সমাজ নামের একটি সংগঠনের মহাসচিব এবং ঢাকার চকবাজার শহীবাজার মসজিদের ইমাম মিনহাজ উদ্দিন বলেছেন, অনেক সময় ব্যত্যয় ঘটে। তবে এমন মসজিদের সংখ্যা অনেক কম বলে তিনি মনে করেন।
"মসজিদের নির্মাণ এবং মসজিদ সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়তো নির্ভেজাল এবং স্বচ্ছ্ব হওয়া দরকার। তবে কিছু ব্যত্যয় ঘটে-যা আমরা বিভিন্ন গণমাধ্যমে শুনতে পাই। কিছু কিছু জায়গায় শুনি যে জমি দখলকে কেন্দ্র করে কোন ধরণের বিভেদ-সেটাকে কেন্দ্র করে সেখানে মসজিদকে ব্যবহার করার জন্য স্বার্থন্বেষী মহলের একটা বিষয় কাজ করে। এই কাজগুলো অবশ্যই নিন্দনীয়।"
"তবে নারায়ণগঞ্জের ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে যাতে করে আবার হয়রানিমূলক কোন কার্যক্রম শুরু না হয়ে যায়,এ বিষয়টাও আমাদের চিন্তায় বা আমলে আনা দরকার।''
কর্মকর্তারা অবশ্য বলেছেন, তাদের উদ্যোগ বা পদক্ষেপ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোন হয়রানির ঘটনা যাতে না ঘটে, সে ব্যাপারে তারা সজাগ থাকবেন।
নারায়ণগঞ্জে মসজিদে গত শুক্রবার রাতে বিস্ফোরণে অগ্নিদগ্ধ হয়ে এ পর্যন্ত ২৭জনের মৃত্যু হয়েছে।








