২১শে অগাস্ট: শেখ হাসিনার ওপর গ্রেনেড হামলার ঘটনা আদালতের পর্যবেক্ষণে যেভাবে উঠে আসে

হামলায় অল্পের জন্যে বেঁচে যান আওয়ামী লীগের নেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, হামলায় অল্পের জন্যে বেঁচে যান আওয়ামী লীগের নেত্রী ও বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় ২০০৪ সালের ২১শে অগাস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার সাথে জড়িত থাকার দায়ে তৎকালীন সরকারের দু 'জন মন্ত্রীসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলো ঢাকার একটি আদালত।

লুৎফুজ্জামান বাবর এবং আব্দুস সালাম পিন্টু ছিলেন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য।

এছাড়া, সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন বিএনপির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, সাবেক প্রতিমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ সহ ১৯ জন অভিযুক্ত।

২০১৮ সালের অক্টোবরে মাসে ওই রায় দেয়া হয়েছিল।

গ্রেনেড হামলার ঘটনায় দায়ের করা হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে দায়ের করা পৃথক দুটি মামলায় সাজা ঘোষণার পাশাপাশি আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছিলো বেশ গুরুত্বপূর্ণ কিছু মন্তব্য, যা মামলার সাথে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা পরবর্তীতে গণমাধ্যমের কাছে তুলে ধরেন।

মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের একজন মোশাররফ হোসেন কাজল বিবিসি বাংলাকে বলছেন যে আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করতেই ২১শে অগাস্টের হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছে এবং এই হত্যাকাণ্ডে রাষ্ট্রযন্ত্র জড়িত ছিল বলে রায়ের পর্যবেক্ষণে তখন উঠে এসেছিলো।

আদালতের রায় ঘোষণার পর তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, "আদালত তার পর্যবেক্ষণে বলেছেন ১৯৭৫ সালের ১৫ই অগাস্টের মতোই ২১শ অগাস্টের হামলার মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে হত্যা এবং আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করতে চেয়েছিল৷ আর এই ষড়যন্ত্রে তখনকার সরকার ও রাষ্ট্রযন্ত্র জড়িত৷ তারেক রহমানের হাওয়া ভবনে বসে এই হামলার ষড়যন্ত্র হয়েছে৷''

তবে তারেক রহমানের দল বিএনপি সবসময়ই এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

হাওয়া ভবন সম্পর্কে আদালতের পর্যবেক্ষণের বিষয়য়ে মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, "তারা এক ও অভিন্ন উদ্দেশে এই ষড়যন্ত্র করে আইনের আশ্রয়ে এই অপরাধীদের সোপর্দ না করে তারা এই ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে কাজ করেছে।"

রায়ে বলা হয়, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরীসহ যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনা ও আলামত ধ্বংসে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এ পরিকল্পনার অপরাধে তাদের যাবজ্জীবন দেয়া হয়।

রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, এটি ছিল পরিকল্পিত গ্রেনেড হামলা, যা তৎকালীন বিরোধী দলের নেতা শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে চালানো হয়। রায়ে ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের ঘটনা না ঘটে, সেজন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্তক থাকার নির্দেশ দেয় আদালত।

মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, তখন আদালতের পর্যবেক্ষণে প্রশ্ন তোলা হয়েছিলো যে 'রাজনীতি মানে কি বিরোধী দলের ওপর পৈশাচিক আক্রমণ?'

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

ঘটনার পরের দিন শেখ হাসিনা যখন সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন, তখনও তিনি হত-বিহ্বল

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ঘটনার পরের দিন শেখ হাসিনা যখন সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন, তখনও তিনি হত-বিহ্বল

রায়ে বলা হয়েছিলো, "এই রাজনীতি এ দেশের জনগণ চায় না। সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে শত বিরোধ থাকবে, তাই বলে নেতৃত্বশূন্য করার চেষ্টা চালানো হবে? রাজনীতিতে এমন ধারা চালু থাকলে মানুষ রাজনীতি বিমুখ হয়ে পড়বে।'

রায় ঘোষণার পর আইনজীবীদের উদ্ধৃত করে আদালতের আরেকটি পর্যবেক্ষণ প্রকাশিত হয়েছিলো গণমাধ্যমে।

তাতে বলা হয়েছে, "আদালত এ দেশে আর এমন হামলার পুনরাবৃত্তি চান না—মন্তব্য করে বিচারক শাহেদ নূর উদ্দীন বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়ার ওপর হামলা বা রমনা বটমূলে হামলার মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি চায় না"।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ক্ষমতায় যে দলই থাকবে, বিরোধী দলের প্রতি তাদের উদারনীতি প্রয়োগের মাধ্যমে গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টা থাকতে হবে বলেও পর্যবেক্ষণে উঠে আসে।

মোশাররফ হোসেন কাজল জানান, তখন রায় ঘোষণার সময় আদালত বলেছিলেন যে রাজনৈতিক জনসমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে রাজনৈতিক নেতা ও সাধারণ জনগণকে হত্যার এ ধারা চালু থাকলে সাধারণ মানুষ রাজনীতি বিমুখ হয়ে পড়বে।

আদালতে ঘোষিত রায়ে বলা হয়েছিলো যে বিরোধী নেতাদের হত্যা করে ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক ফায়দা লোটা গণতান্ত্রিক চিন্তার বহিঃপ্রকাশ নয়। জনগণ এ রাজনীতি চায় না। আদালত এ দেশে আর এমন নৃশংস ঘটনার পুনরাবৃত্তি চান না।

পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছিলো, "আর্জেস গ্রেনেডের মতো অস্ত্র, যা যুদ্ধে ব্যবহার হয়, রাষ্ট্রযন্ত্রের সাহায্যে তার বিষ্ফোরণ ঘটানো হলো প্রকাশ্য দিবালোকে আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে"।

আদালতের প্রশ্ন ছিলো - "কেন এসব মারণাস্ত্র ব্যবহার করা হলো?"

"রাজনীতির মানে কি বিরোধী দলের ওপর এমন নৃশংস হামলা করা ? এটা সাধারণ কোনো হামলা ছিলো না, এটা ছিলো একটি দলকে নেতৃত্বশূণ্য করার চেষ্টা"।

নিজের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছিলো যে আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে এ ধরণের নৃশংস হামলার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো সম্ভব।

২১শে অগাস্টে গ্রেনেড হামলার পর বঙ্গবন্ধু অ্যাভেনিউতে পরে ছিল জুতা, স্যন্ডেল - এমনকি অবিস্ফোরিত গ্রেনেড

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ২১শে অগাস্টে গ্রেনেড হামলার পর বঙ্গবন্ধু অ্যাভেনিউতে পরে ছিল জুতা, স্যন্ডেল - এমনকি অবিস্ফোরিত গ্রেনেড

মামলা ও বিচার সম্পর্কে কিছু তথ্য:

গ্রেনেড হামলার ঘটনায় দুইটি মামলা করা হয়, একটি হত্যা মামলা এবং অন্যটি বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলা।

মামলায় মোট আসামি ছিলেন ৪৯ জন আর রাষ্ট্রপক্ষে সাক্ষী দিয়েছেন ২২৫ জন। অন্যদিকে, আসামি পক্ষে সাক্ষী দিয়েছেন ২০ জন।

গ্রেনেড হামলার সময় এবং তারপরের তদন্ত নিয়ে পুলিশের নিস্ক্রিয়তায় অভিযোগ উঠেছিল তৎকালীন বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে।

জজ মিয়া নামের এক ব্যক্তিকে দিয়ে গ্রেনেড হামলার বিষয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয়ার বিষয়টি ব্যাপক সমালোচনারও জন্ম দিয়েছিল।

২০০৭ সালের সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ওই হামলার ঘটনায় পুনরায় তদন্ত হয়।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে পুনরায় তদন্ত হয় যদিও বিএনপি এই তদন্তকে 'রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমূলক' বলে বর্ণনা করেছিলো।