বৈরুত বিস্ফোরণঃ ‘বড় ভাইয়ের মৃত্যুতে আমি অভিভাবক হারালাম’

মিজানুর রহমান

ছবির উৎস, Family Handout

ছবির ক্যাপশান, মিজানুর রহমান বৈরুতের একটি রেস্টুরেন্টে কাজ করতেন।
    • Author, শাহনাজ পারভীন
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বছর তিনেক হল কাজের খোঁজে লেবাননে গিয়েছিলেন মিজানুর রহমান। মাত্র ২৭ বছর বয়স ছিল তার।

লেবাননের রাজধানী বৈরুতে বিস্ফোরণে নিহত অন্তত: তিনজন বাংলাদেশীর একজন তিনি।

মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার শিকারমঙ্গল ইউনিয়নের বাসিন্দা মিজানুর রহমান বৈরুতের একটি রেস্তোরাঁয় কাজ করতেন।

চার ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে বড় ছিলেন মিজানুর রহমান। টেলিফোনে কথা বলছিলাম তার ছোটভাই আব্দুর রহমানের সাথে।

তিনি বলছিলেন, "ঘরে একটাই বড় ভাই। সে ছিল আমার অভিভাবকের মতো। আমাদের বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে পরিবার ছেড়ে চলে যাওয়ার পর আর খোঁজ খবর নিত না। বাবা চলে গেলে ঘরে অভিভাবক থাকে তার বড় ভাই। এখন সেও চলে গেল। এতে একটা পরিবারের অবস্থা কেমন হয়?"

আব্দুর রহমান জানিয়েছেন, বাবা চলে যাওয়ার পর তাদের মা পরিবারের হাল ধরেছিলেন।

ঢাকায় কষ্ট করে কাজ করে টাকা জমিয়ে ছেলেকে পাঠিয়েছিলেন বিদেশে।

তিনি বলছেন, "আমার মা মায়ের এখন দুটো কিডনিই অকেজো হয়ে গেছে। চলতে পারেন না। চোখেও দেখতে পান না। অসুস্থ এই মায়ের জন্য ঔষধ, পরিবারের খরচ, আমার ছোট ভাইয়ের পড়ালেখার খরচ সব বড়ভাই চালাত। তার আড়াই বছর বয়সী মেয়েটার এখন কি হবে?"

বৈরুতে বসবাসরত এক আত্মীয় ফোনে ভাইয়ের মৃত্যুর খবরটি দিয়েছেন। কর্তৃপক্ষের কেউ এখনো তাদের সাথে যোগাযোগ করেনি।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন:

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মেহেদি হাসান।

ছবির উৎস, Bangladesh Embassy, Beirut

ছবির ক্যাপশান, বিস্ফোরণে নিহত আরও একজন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মেহেদি হাসান।

লেবাননের বৈরুতে বন্দরের কাছে বিস্ফোরণে নিহত আরও একজন হলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মেহেদি হাসান।

অন্য আর একজন সম্পর্কে এখনো কোন তথ্য পাওয়া যায়নি।

এই বিস্ফোরণের নানা রকম ভিডিও পাওয়া যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে। যাতে দেখা যাচ্ছে বিস্ফোরণের শব্দ, এর ফলে সৃষ্ট কাঁপুনি আর তিন রঙের ধোঁয়া।

চারপাশে বহুদূর পর্যন্ত ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে ভবন ও পার্ক করা গাড়ি। মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গও পড়ে থাকতে দেখা গেছে।

বৈরুতের জাম্মু এলাকায় বসবাসরত আতিয়া সোনিয়া বাংলাদেশি অভিবাসীদের ভাষা ও অন্যান্য বিষয়ে প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেন।

তিনি বলছেন, "প্রথমে ভাবলাম ঘূর্ণিঝড় হচ্ছে। তারপর মনে হল এদেশে তো ঘূর্ণিঝড় হয় না। তারপর আমার মালিক বলল বোমা।"

তিনি জানিয়েছেন, তার বাড়ির তিনটি জানালার কাঁচ ভেঙে চুরমার গেছে। ঘরের ভেতরে থাকা কফির কাপ ভেঙেছে।

বৈরুতে বাংলাদেশ দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি আবদুল্লাহ আল মামুন বলছিলেন, "গতকাল অফিস শেষ করে যখন বাড়ি ফিরেছি, ঠিক তখনই হঠাৎ ভূমিকম্পের মতো কেঁপে উঠলো চারপাশ। আমরা সবাই দৌড়ে নিচে নামলাম। "

"আমার বাসা ঘটনাস্থল থেকে ৬ কিলোমিটার মতো দুরে অবস্থিত। আমার বাসাতেও জানালার কাঁচ ভেঙে গেছে।"

বিস্ফোরণে বন্দরের ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বিস্ফোরণে বন্দরের ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছে।

এই বিস্ফোরণে বৈরুত বন্দর প্রায় পুরোটাই ধ্বংস হয়ে গেছে।

আতিয়া সোনিয়া বলছেন, "লেবাননে সব খাদ্যদ্রব্য বিদেশ থেকে আমদানি হয়। মূলত এই বন্দর দিয়ে তা আসে। এইখানে যে বাংলাদেশিরা আছে তারা এমনিতেই লকডাউনের কারণে বিপদে আছেন। আর এখন খাদ্য সংকট হতে পারে, এমনটাই বলাবলি করছেন তারা।"

তিনি জানিয়েছেন, এমনিতেই করোনাভাইরাসের মহামারির কারণে দেশটিতে লকডাউন বিদ্যমান ছিল। যা আরো বাড়ানো হয়েছে।

কিন্তু তারপরও কিছু সুপারমার্কেট খোলা ছিল। কিন্তু বিস্ফোরণের পর পুরো বৈরুত শহরের সবকিছু বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

আরো খবর: