করোনা ভাইরাস: ফুসফুস দীর্ঘমেয়াদে বিকল হতে পারে?

ব্রাজিলে বেলো হরিজন্টির এক হাসপাতালের আইসিইউতে কোভিড রোগী

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, করোনাভাইরাসে যারা বেশি অসুস্থ হচ্ছেন তাদের ফুসফুসের ওপর মারত্মক প্রভাব পড়ার লক্ষণ দেখছেন চিকিৎসকরা
    • Author, জিম রিড ও সোফি হাচিনসন
    • Role, বিবিসি নিউজ

ব্রিটেনে কোভিড-১৯য়ে গুরুতর আক্রান্ত হয়ে সেরে উঠেছে, এমন হাজার হাজার মানুষকে হাসপাতালে যাবার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে, তাদের ফুসফুস চিরকালের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কিনা তা পরীক্ষা করার জন্য।

ব্রিটেনে চিকিৎসকরা বিবিসিকে বলেছেন যারা করোনাভাইরাসে গুরুতরভাবে আক্রান্ত হয়েছিলেন, তারা আশংকা করছেন, তাদের একটা বড় অংশের ফুসফুস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে, যাকে বলা হয় পালমোনারি ফাইব্রোসিস।

ফুসফুসের এই ক্ষতি থেকে সেরে ওঠা যায় না, এবং এর উপসর্গগুলো হল মারাত্মক শ্বাসকষ্ট, কাশি এবং ক্লান্তিবোধ।

ইংল্যান্ডের জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অধীনে সেরে ওঠা রোগীদের বিশেষজ্ঞ পরামর্শ দেয়ার ও পুর্নবাসনের জন্য কেন্দ্র খোলা হয়েছে।

ইংল্যান্ডের একজন ট্যাক্সিচালক, কোভিডে আক্রান্ত হবার পর যার অবস্থার অবনতি হয় এবং ১৩দিন ভেন্টিলেটারে থাকাসহ প্রায় চার সপ্তাহ যাকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়, তিনি হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাবার পর এরকম একটি পুর্নবাসন কেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়েছেন আরও দুই সপ্তাহ।

সেরে ওঠার ছয় সপ্তাহ পর এপ্রিলের মাঝামাঝি বাসায় ফিরে অ্যান্টনি ম্যাকহিউ এখনও সিঁড়ি ভাঙতে বা ছোটখাট সহজ কাজ করতে গিয়ে হাঁপিয়ে পড়ছেন। নিচু হতে গিয়েও তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।

ফুসফুসে আস্তরণ

হাসপাতালে সিটি স্ক্যানে দেখা গেছে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হবার পর তার দুটি ফুসফুসের ওপরই একটা সাদা কুয়াশার আস্তরণ তৈরি হয়েছে- অনেকটা ভাঙা কাঁচের মত দেখতে। চিকিৎসকরা বলছেন এটা করোনাভাইরাস আক্রমণের একটা বৈশিষ্ট্য।

করোনাভাইরাসে গুরুতরভাবে আক্রান্ত হলে শরীরের প্রতিরোধী ব্যবস্থা যখন অতিমাত্রায় সক্রিয় হয়ে ওঠে, তখন এর ফলে প্রচুর শ্লেষ্মা, জলীয় পদার্থ এবং কোষ তৈরি হয়, যা ফুসফুসে যে বাতাস চলাচলের থলিগুলো আছে যাকে অ্যালভিওলি বলা হয়, সেগুলোকে ভর্তি করে ফেলে। এটা যখন হয়, তখন নিউমোনিয়া দেখা দেয় এবং সাহায্য ছাড়া মানুষের পক্ষে নিঃশ্বাস নেয়া সম্ভব হয় না।

কোভিড আক্রান্ত হবার আগে ফুসফুসের ছবি
ছবির ক্যাপশান, কোভিড আক্রান্ত হবার আগে সুস্থ ফুসফুসের ছবি
কোভিড আক্রান্ত হবার পর ক্ষতিগ্রস্ত ফুসফুসের ছবি
ছবির ক্যাপশান, কোভিড আক্রান্ত হবার পর ক্ষতিগ্রস্ত ফুসফুসের ছবি

আক্রান্ত হবার ছয় সপ্তাহ পর নেয়া মি. ম্যাকহিউয়ের এক্স-রে-তে দেখা গেছে তার ফুসফুসের ওপর একটা সাদা ছায়ার মত স্তর তৈরি হয়েছে যেটাকে ডাক্তাররা বলছেন পালমোনারি ফাইব্রোসিস বা ফুসফুসে ক্ষত সৃষ্টির প্রাথমিক লক্ষণ।

ব্রিটিশ সোসাইটি অফ থোরাসিক ইমেজিংএর একজন সদস্য এবং রয়াল কলেজ অফ রেডিওলজিস্টের উপদেষ্টা ড. স্যাম হেয়ার বলছেন, "সাধারণত এধরনের ভাইরাস সংক্রমণের পর ছয় সপ্তাহ হয়ে গেলে ফুসফুসের অবস্থা আবার আগের জায়গায় ফিরে যাবার কথা- অন্তত চিকিৎসকরা সেটাই আশা করেন। কিন্তু এক্ষেত্রে সেটা হয়নি এবং সেজন্যই এটা উদ্বেগের কারণ।"

Presentational grey line

পালমোনারি ফাইব্রোসিস কী?

পালমোনারি ফাইব্রোসিস একধরণের রোগ যেখানে ফুসফুসের নরম অংশগুলো নষ্ট হয়ে যায় এবং সেখানে ক্ষতের সৃষ্টি হয়।

  • এতে ফুসফুসের কলাগুলো (টিস্যু) মোটা ও শক্ত হয়ে যায়, ফলে ফুসফুসে বাতাসের থলিগুলো ঠিকমত কাজ করতে পারে না।
  • কোন কোন রোগীর ক্ষেত্রে এর ফলে নিঃশ্বাস নেয়া কষ্টকর হয়ে পড়ে এবং ক্লান্তিবোধ দেখা দেয়। শুধু তাই নয় ভবিষ্যতে অন্য নানা ধরনের ফুসফুসের সংক্রমণে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
  • এই রোগ সারে না। বরং কোন কোন ক্ষেত্রে তা আরও মারাত্মক রূপ নিতে পারে অর্থাৎ দিনে দিনে এই রোগীর অবস্থার অবনতি হতে থাকে।
  • কোভিড-১৯এর ফলে ফুসফুসের যে ক্ষতি হয়, তা নিয়ে গবেষণার কাজ এখনও খুবই প্রাথমিক পর্যায়ে আছে।
Presentational grey line
Banner image reading 'more about coronavirus'
Banner

ধারণা করা হচ্ছে যাদের হালকা উপসর্গ হয়, তাদের ক্ষেত্রে স্থায়ী ক্ষতি হবার সম্ভাবনা কম। কিন্তু যাদের হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে, বিশেষ করে যাদের নিবিড় পরিচর্যায় রাখার দরকার হচ্ছে বা যাদের সংক্রমণ খুবই গুরুতর পর্যায়ে হচ্ছে, তাদের ভবিষ্যতে জটিলতা তৈরি হবার আশংকা আছে।

মার্চ মাসে চীনে চালানো এক জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, সেরে ওঠা ৭০ জন করোনা রোগীর মধ্যে ৬৬জনেরই হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাবার পরেও ফুসফুসের নানা সমস্যা রয়ে গেছে।

ব্রিটেনের রেডিওলজিস্টরা সেরে ওঠা রোগীদের প্রাথমিক স্ক্যান পরীক্ষার ভিত্তিতে বলছেন যারা কোভিডে বেশি অসুস্থ হচ্ছে তাদের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির আশংকা বেশি।

"সেরে ওঠার ছয় সপ্তাহ পর যেসব রোগীর ফুসফুসের স্ক্যান আমরা দেখেছি, তার থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়া ২০ থেকে ৩০ শতাংশ রোগীর ফুসফুসে ক্ষত তৈরির লক্ষণ পরিষ্কার," বলছেন ড. হেয়ার।

অন্য রেডিওলজিস্টরাও বিবিসিকে একই উদ্বেগের কথা বলেছেন, তারাও একই প্যাটার্ন দেখছেন।

এর আগে যে দুটো করোনাভাইরাস সংক্রমণ আমরা দেখেছি- সার্স এবং মার্স - তাতে ২০ থেকে ৬০ শতাংশ রোগীর পালমোনারি ফাইব্রোসিস ধরনের কিছু স্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি হয়েছিল।

তবে সার্স ও মার্স তুলনামূলকভাবে আরও সাফল্যের সাথে মোকাবেলা করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু কোভিড-১৯ এর জীবাণু সারা বিশ্বে ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে। এবং এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত ৮০ লাখের বেশি মানুষ এতে আক্রান্ত হয়েছে।

"আমার মূল উদ্বেগটা হল কোভিড-১৯ বিশাল একটা জনসংখ্যাকে সংক্রমিত করেছে," বলছেন ড. হেয়ার।

"এই ভাইরাস এত মানুষকে আক্রমণ করেছে, ফলে কত মানুষকে যে দীর্ঘমেয়াদে এই ভাইরাস পঙ্গু করে দিয়েছে তার সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বিশাল।"

ফুসফুসের ওপর করোনাভাইরাসের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে চিকিৎসকরা রীতিমত উদ্বিগ্ন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ফুসফুসের ওপর করোনাভাইরাসের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে চিকিৎসকরা রীতিমত উদ্বিগ্ন

ভবিষ্য চিকিৎসা

ফুসফুসের ফাইব্রোসিস বা ফুসফুসের দেয়াল মোটা হয়ে যাওয়া সারানো যায় না, কারণ ফুসফুসের কোষ একবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা চিরস্থায়ী হয়। তবে নতুন ওষুধ দিয়ে এই ক্ষতির মাত্রা কমানো যেতে পারে। হয়ত তা কিছুটা বিলম্বিত বা আটকানোও সম্ভব হতে পারে, তবে তার জন্য এই সমস্যা সময়ে ধরা পড়তে হবে।

"সমস্যাটা কতটা গুরুতর তা বোঝা দরকার এবং জানা দরকার ঠিক কখন এটা আটকাতে ওষুধ দেয়া দরকার," বলছেন ব্রিটেনের স্বাস্থ্য গবেষণা বিষয়ক জাতীয় ইন্সটিটিউটের গবেষক ও অধ্যাপক জিসলি জেনকিন্স।

"আমাদের জীবদ্দশায় এর আগে একই সাথে এত বিপুল সংখ্যক মানুষের ফুসফুস এধরনের আঘাতের মুখোমুখি হয়নি।"

কাজেই করোনাভাইরাস থেকে সেরে ওঠা রোগীদের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির মূল্যায়ন করা এবং তাদের এই ক্ষতি কমাতে সাহায্য করা যায় কিনা সেটাই এখন গবেষক ও চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের সামনে আরেকটা বড় চ্যালেঞ্জ।

ভিডিওর ক্যাপশান, করোনাভাইরাস: ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বাড়াতে সাতটি পরামর্শ