জর্জ ফ্লয়েড: যে ভিডিও থেকে প্রতিবাদের আগুন সেই ভিডিও তুলেছিল যে তরুণী

যখন কোন ভিডিও ভাইরাল হয়, সেই ভিডিও-র বিষয়বস্তু যখন সংবাদ শিরোনাম হয়, তখন যে ওই ভিডিও তুলেছে তার নাম সংবাদের আড়ালে প্রায়শই ঢাকা পড়ে যায়।

কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান জর্জ ফ্লয়েড নি:শ্বাস নিতে পারছেন না, পুলিশ অফিসার তার গলার ওপর চেপে বসেছে, ভিডিওতে এই ছবি তুলেছিলেন পথচারী ১৭ বছরের তরুণী ডারনেলা ফ্রেজিয়ার।

যখন তিনি ভিডিও ক্যামেরা চালু করেন তখন ৪৬ বছর বয়স্ক জর্জ ফ্লয়েড দম নিতে না পেরে হাঁপাচ্ছেন, কাতর কণ্ঠে বারবার অনুনয় করছেন, "প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ"।

তার ক্যামেরা তখন ছবি তুলছে বিশ সেকেন্ড ধরে। মি. ফ্লয়েড এরপর আর যে তিনটি শব্দ উচ্চারণ করতে পেরেছিলেন, তা এখন বিশ্বজোড়া এক আন্দোলনের মূলমন্ত্র হয়ে উঠেছে।

"আই কান্ট ব্রিদ"-"আমি নি:শ্বাস নিতে পারছি না," মি. ফ্লয়েড কোনমতে বলেছিলেন।

কথাগুলো কিছুটা অস্পষ্ট ছিল। মি. ফ্লয়েডের দুহাত পিছমোড়া করে বেঁধে তখন তাকে মাটিতে শুইয়ে ফেলেছে তিনজন পুলিশ অফিসার। এদের একজন ৪৪ বছর বয়স্ক ডেরেক শভিন তার হাঁটু দিয়ে মি. ফ্লয়েডের গলা চেপে ধরেছেন। মি. ফ্লয়েডের মুখ নিচের দিকে। তিনি কথা বলছেন অতিকষ্টে।

মিস ফ্রেজিয়ার তার নয় বছরের এক কাজিন বোনকে নিয়ে 'কাপ ফুডস্' নামে এক দোকানে যাচ্ছিলেন। দোকানটা মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের মিনিয়াপোলিস শহরে - তার বাসার বেশ কাছেই। পথে তিনি দেখতে পান পুলিশ কীভাবে মি. ফ্লয়েডের গলা চেপে ধরেছে।

তিনি দাঁড়িয়ে যান। তার ফোন বার করেন এবং রেকর্ড বোতামে চাপ দেন।

পুরো দশ মিনিট নয় সেকেন্ড তিনি ভিডিওতে ছবি তোলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত পুলিশ অফিসাররা ও মি. ফ্লয়েড সেখানে ছিলেন। পুলিশ অফিসাররা পায়ে হেঁটে স্থান ত্যাগ করে আর মি. ফ্লয়েডকে স্ট্রেচারে করে নিয়ে যাওয়া হয়।

বিবিসি নিউজের জশুয়া নেভেট লিখছেন, ওই সময়ে মিস ফ্রেজিয়ার ভাবতেও পারেননি তার ভিডিওর ফলশ্রুতিতে কী ঘটতে চলেছে। মোবাইল ফোনের একটা বোতামে চাপ দিয়ে তিনি কীধরনের প্রতিবাদের ঢেউ সৃষ্টি করতে চলেছেন। শুধু আমেরিকায় নয়, সারা বিশ্বে।

"তার মনে হয়েছিল এ ঘটনার প্রমাণ রাখা দরকার," মিস ফ্রেজিয়ারের আইনজীবী সেথ কোবিন বিবিসিকে বলেন, "বলা যায় তার এই ভিডিওর কারণে নতুন রূপে নাগরিক অধিকার আন্দোলনের পুনর্জন্ম হয়েছে।"

হাই স্কুল ছাত্রী মিস ফ্রেজিয়ারের সাথে বিবিসি সাক্ষাৎকার নিতে পারেনি। তার আইনজীবী বলেছেন ২৫শে মে 'কাপ ফুডস্' দোকানের বাইরে তিনি যা দেখেছেন তাতে তিনি আতঙ্কিত। "তার জীবনে সে এর চেয়ে ভয়াবহ কোন ঘটনা দেখেনি।"

বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন:

ভিডিও নিয়ে প্রতিক্রিয়া

তার আইনজীবী বলছেন, তিনি চিকিৎসকের সাথে দেখা করেছেন এবং "মানসিক বিপর্যয় কাটিয়ে উঠছেন।"

তার তোলা ওই ভিডিও যা তিনি ফেসবুকে পোস্ট করেছিলেন তার প্রতিক্রিয়াও তার জন্য বড়ধরনের মানসিক চাপ তৈরি করেছিল। মিশ্র প্রতিক্রিয়ায় কেউ বলেছে তারা স্তম্ভিত, কেউ ক্রুদ্ধ, কেউ তার প্রশংসা করেছে আবার সমালোচনাও করেছে কেউ কেউ।

ফেসবুকে ২৭শে মে শেয়ার করা এক পোস্টে একজন বলেছে তিনি "বাহাদুরি পেতে" ওই ভিডিও তুলেছিলেন এবং মি. ফ্লয়েডের মৃত্যু ঠেকাতে তিনি কিছু করেননি।

উত্তরে মিস ফ্রেজিয়ার লেখেন, "আমি ওই ভিডিও না তুললে ওই চারজন পুলিশ এখনও তাদের দায়িত্বে বহাল থাকত, অন্যদের জন্য সমস্যা তৈরি করত। এই ভিডিও পৃথিবীর মানুষ দেখেছে, তারা জেনেছে কী ঘটেছিল।"

জশুয়া নেভেট বলছেন, মিস ফ্রেজিয়ারের ভিডিও একটা সমস্যাকে সামনে এনেছে যে, যখন পুলিশি অত্যাচার বা নির্মমতার ঘটনার বা কোন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার ভিডিও কোন পথচারী তোলে, তখন পরবর্তীতে তাকে নানাধরনের ঝামেলা বা সমালোচনা সামলাতে হয় - যা মোকাবেলা করা অনেকের জন্য খুব সহজ হয় না।

যখন আবেগ খুব বেশি থাকে, বিশেষ করে যেখানে পুলিশ জড়িত থাকে, যেখানে বর্ণবাদের বিষয়টা বেরিয়ে আসে, পুলিশের বর্বর আচরণ সামনে আসে, তখন মতামত বিভক্ত হয়ে যায়- বর্ণ এবং রাজনৈতিক লাইনে মতামত দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যায়। তখন যে সেই ভিডিও তুলেছে তার কাজ নিয়ে নানা প্রশ্ন, নানা বিতর্ক উঠতে শুরু করে।

অনেকেই এই চাপ সামাল দিতে পারে না। অনেকে এই চাপ মোকাবেলা করতে গিয়ে কঠিন মানসিক বিপর্যয়ে পড়েন বলে লিখছেন বিবিসির সাংবাদিক। আর পরবর্তীতে কীধরনের অসুবিধায় পড়তে হয় এই ভেবেও অনেকে এধরনের ঘটনার ভিডিও তুলতে সংশয়ে থাকেন।

পুলিশের নির্মমতার অতীত ভিডিও

নিউ ইয়র্কে পুলিশের তৎপরতা নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন ডেনিস ফ্লোরেস। তিনি বলছেন ১৯৯০এর দশকের শেষ দিক থেকে নিউ ইর্য়ক পুলিশ বাহিনীর কার্যকলাপ নিয়ে তথ্যসংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি ৭০ বার গ্রেপ্তার হয়েছেন।

পুলিশের অত্যাচারের যেসব ভিডিও তিনি তুলেছেন এবং প্রকাশ করেছেন, তা আমেরিকায় পুলিশকে নির্যাতনের অভিযোগে দায়বদ্ধ করার ক্ষেত্রে একটা ভূমিকা রেখেছে।

বলা হয় আমেরিকায় ১৯৯১ সালে তোলা পুলিশের বর্বরতার একটি ভিডিও প্রথম বিশ্বজুড়ে ভাইরাল হয়েছিল। ভিডিওটি তুলেছিলেন একজন কলের মিস্ত্রি।

ক্যালিফোর্নিয়ার লস এঞ্জেলসে গাড়ি ধাওয়া দিয়ে একজন নিরস্ত্র কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি রডনি কিংকে ধরে পুলিশ অফিসারদের তাকে নৃশংস প্রহার দেয়ার ছবি তুলেছিলেন জর্জ হলিডে নামে ওই ব্যক্তি।

অফিসাররা জানতে পারেনি তাদের ছবি তোলা হচ্ছে। মি. হলিডে তার ফ্ল্যাটের বারান্দা থেকে সেকালের সোনি হ্যান্ডিক্যাম ভিডিও ক্যামেরা দিয়ে ওই ছবি তুলেছিলেন।

টেপটা তিনি তুলে দিয়েছিলেন স্থানীয় এক টিভি চ্যানেলের হাতে। এরপর ওই ভিডিও জাতীয় পর্যায়ে ও বিশ্ব ব্যাপী ক্ষোভের সৃষ্টি করে।

একবছর পর ১৯৯২ সালে এই ক্ষোভ মারাত্মক বর্ণবাদী দাঙ্গায় রূপ নেয়। চারজন শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসারকে অভিযুক্ত করা হয়, কিন্তু তারা নির্দোষ প্রমাণিত হয়।

মি. ফ্লোরেস বিবিসিকে বলেছেন রডনি কিং-কে পুলিশি প্রহারের ওই ছবি ছিল, ভিডিওতে সাক্ষ্যপ্রমাণ হিসাবে ছবি তোলার শুরু।

বিবিসির সংবাদদাতা বলছেন আমেরিকায় সাধারণ মানুষের পুলিশের ভিডিও তোলার অধিকার সুরক্ষিত করা হয়েছিল দেশটির সংবিধানের প্রথম সংশোধনীতে।

প্রথম দিকে যেখানে সেখানে দ্রুত ছবি তোলার জন্য স্মার্টফোন ছিল না, ভিডিও শেয়ার করার জন্য সামাজিক যোগাযাগ মাধ্যম ছিল না, ফাইভ জি ইন্টারনেট পরিষেবা ছিল না।

তবে মি. হলিডে তার ভারী এসএলআর ক্যামেরা দিয়ে রডনি কিং-য়ের ছবি তুলে পুলিশকে দায়বদ্ধতার যে জায়গায় দাঁড় করাতে পেরেছিলেন, তার সূত্র ধরে পুলিশের নির্মমতার ছবি তোলা এখন অনেক সহজ হয়ে গেছে।

এখন পুলিশের অজান্তে মানুষ তাদের বর্বরতার ছবি তুলে সামাজিক মাধ্যমে তা ছড়িয়ে দিতে পারছে অনায়াসে। এবং এধরনের ভিডিও তোলার ঘটনাও বেড়েছে কারণ এধরনের ভিডিও সাক্ষ্যপ্রমাণ হিসাবে এবং অভিযোগ গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

মি. ফ্লয়েডের মামলায় মি. শভিনকে যখন বিচারের কাঠগড়ায় তোলা হবে তখন কৌঁসুলিদের কাছে এই ভিডিও থাকবে।

মি ফ্রেজিয়ারের আইনজীবী মি. কোবিন বলেছেন তদন্তকারীরা তার মক্কেলের ফোন থেকে এই ভিডিও সাক্ষ্যপ্রমাণের জন্য নামিয়ে নিয়েছেন। সাক্ষ্য দেবার জন্য মিস ফ্রেজিয়ারকে হয়ত আদালতে হাজিরা দিতে হতে পারে।

ইতোমধ্যেই তিনি এফবিআইয়ের নাগরিক অধিকার বিভাগ এবং মিনেসোটার ফৌজদারি ব্যুরোর কর্মকর্তার কাছে প্রত্যক্ষদর্শীর বিবৃতি দিয়েছেন।

মি. কোবিন বলছেন তার বিবৃতি খুবই মর্মস্পর্শী। মিস ফ্রেজিয়ার "খুবই আবেগপ্রবণ ছিলেন, কাঁদছিলেন। মানসিকভাবে তিনি কতটা বিপর্যস্ত সেটা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল। তিনি বলেন যখনই তিনি চোখ বোজেন, তিনি ওই দৃশ্যটা দেখতে পান। তিনি জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া মুখটা দেখতে পান। চোখ খুললে সে মুখটা মিলিয়ে যায়। চোখ বুজলেই আবার মুখটা ফিরে আসে।"

মিস ফ্রেজিয়ার কোন হত্যা মামলায় জড়িয়ে পড়তে চাননি। মি. ফ্লয়েডের মৃত্যুর ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করে তিনি কোন বাহবা নিতে বা নাম কিনতে চাননি।

আলাবামায় ১৯৫৫ সালে রোজা পার্কস নামে যে আফ্রিকান আমেরিকান নারী একজন শ্বেতাঙ্গকে বাসে তার সিট ছেড়ে দিতে অস্বীকার করেছিলেন তার সাথে মিস ফ্রেজিয়ারের তুলনা টেনেছেন মি. কোবিন।

তিনি বলেছেন রোজা পার্কস কখনও নাগরিক অধিকার আন্দোলনের প্রতীক হয়ে উঠতে চাননি। তিনি যা করেছিলেন তা তার সঠিক মনে হয়েছিল তাই করেছিলেন। মিস ফ্রেজিয়ারও তাই- বলেছেন মি. কোবিন, "তিনি ঘটনার সময় সেখানে হাজির ছিলেন, তার যেটা করা উচিত মনে হয়েছিল, তিনি সেটা করেছেন। তিনি হিরো হবার জন্য এটা করেননি।"