মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র: বর্ণবাদ ও পুলিশ-বিরোধী বিক্ষোভকে নির্বাচনী হাতিয়ার করছেন ট্রাম্প

বর্ণবাদ-বিরোধী বিক্ষোভকারীকে ওয়াশিংটনে পুলিশ গ্রেফতার করছে, ০১-০৬-২০২০।

ছবির উৎস, Anadolu Agency

ছবির ক্যাপশান, বর্ণবাদ-বিরোধী বিক্ষোভকারীকে ওয়াশিংটনে পুলিশ গ্রেফতার করছে।
    • Author, শাকিল আনোয়ার
    • Role, বিবিসি বাংলা

মিনিয়াপোলিসে গত সপ্তাহে একজন শ্বেতাঙ্গ পুলিশ কর্মকর্তার হাঁটুর চাপে জর্জ ফ্লয়েড নামে এক কৃষ্ণাঙ্গের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভে টালমাটাল হয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

উনিশশো আটশট্টি সালে মার্টিন লুথার কিংয়ের হত্যাকাণ্ডের পর এত বড় সহিংস বিক্ষোভ আমেরিকাতে আগে হয়নি।

চল্লিশটির মত বড় বড় শহরে সন্ধ্যার পর থেকে কারফিউ চলছে। বাইশটি অঙ্গরাজ্যে ন্যাশনাল গার্ড অর্থাৎ অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় রিজার্ভ সেনা ইউনিটের ১৭হাজারেরও বেশি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে হোয়াইট হাউজের কাছে শুক্রবার থেকে বিক্ষোভের মাত্রা যেভাবে বাড়তে থাকে, তাতে উদ্বিগ্ন দেহরক্ষীরা কিছুক্ষণের জন্য প্রেসিডেন্টকে মাটির নীচে একটি বাঙ্কারে নিয়ে গিয়েছিল।

হোয়াইট হাউজের কাছে বিক্ষোভের সময় ক্ষতিগ্রস্ত একটি গির্জার সামনে বাইবেল হাতে দাঁড়িয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প

ছবির উৎস, Getty

ছবির ক্যাপশান, হোয়াইট হাউজের কাছে বিক্ষোভের সময় ক্ষতিগ্রস্ত একটি গির্জার সামনে বাইবেল হাতে দাঁড়িয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প

কিন্তু এই সঙ্কটের মধ্যেই গত এক সপ্তাহ ধরে তিনি যেসব টুইট করছেন, এবং বিশেষ করে গতকাল (সোমবার) সন্ধ্যায় হোয়াইট হাউজে যে ভাষণ তিনি দিয়েছেন, তাতে অধিকাংশ পর্যবেক্ষক নিশ্চিত যে বর্ণবাদ বিরোধী এই বিক্ষোভকে মি. ট্রাম্প নভেম্বরের নির্বাচনে জেতার প্রধান হাতিয়ার করতে চাইছেন।

হোয়াইট হাউজের রোজ গার্ডেনের লনে সংক্ষিপ্ত এক বিবৃতিতে মি. ট্রাম্প ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত শহর এবং গভর্নরদের একহাত নিয়েছেন। তিনি হুঁশিয়ার করেছেন, তারা যদি ‘সাধারণ মানুষের জানমাল এবং সম্পদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হন, তাহলে তিনি সেনা মোতায়েন করে নিজেই “তাদের হয়ে সমস্যার সমাধান করে দেবেন।“

কয়েকশ বছরের পুরনো যে আইনের ভিত্তিতে প্রেসিডেন্ট সেনা মোতায়েনের কথা বলছেন, তার জন্য গভর্নরদের কাছ থেকে অনুরোধ আসতে হবে, এবং পার্লামেন্টের অনুমোদন নিতে হবে।

ক্যালিফোর্নিয়ার লংবিচে টহল দিচ্ছে ন্যাশনাল গার্ডের সদস্যরা

ছবির উৎস, Getty

ছবির ক্যাপশান, ক্যালিফোর্নিয়ার লংবিচে টহল দিচ্ছে ন্যাশনাল গার্ডের সদস্যরা

শেষবার এই আইন কার্যকর করে সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল ১৯৯২ সালে লস এঞ্জেলসে পুলিশের বর্ণবাদী আচরণের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া বিক্ষোভ থামাতে।

তার ভাষণে মি ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, চলতি বিক্ষোভের সাথে কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর সম্পর্ক কম, বরঞ্চ কট্টর বামপন্থীরা প্রতিবাদের নামে বিশৃঙ্খলা এবং লুটপাট করছে। তিনি বলেন ফ্যাসীবাদ-বিরোধী সংগঠন “আ্যান্টিফা“ কে তিনি সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকায় ঢোকাবেন।

‘আমি ল অ্যান্ড অর্ডার প্রেসিডেন্ট‘

কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, সেনা মোতায়েন করতে পারুন আর নাই পারুন মি. ট্রাম্প দেখাতে চাইছেন ডেমোক্র্যটরা অথর্ব, তারা মানুষের জানমাল রক্ষা করতে পারেনা, ফলে তিনিই একমাত্র ত্রাতা, তার কোনো বিকল্প নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতির অধ্যাপক এবং গবেষণা সংস্থা আটলান্টিক কাউন্সিলের সিনিয়র ফেলো ড. আলী রীয়াজ বলছেন, সোমবার হোয়াইট হাউজের লনে তার বিবৃতির প্রধান টার্গেট ছিল ভোটাররা।

“তিনটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল - এক, তিনি নিজেকে ‘আইন-শৃঙ্খলার প্রেসিডেন্ট‘ হিসাবে বর্ণনা করেছেন। দুই, বক্তব্য শেষ করে তিনি বিক্ষোভে ক্ষতিগ্রস্ত একটি গির্জার কাছে গিয়ে বাইবেল হাতে ছবি তুলেছেন যার লক্ষ্য রক্ষণশীল খ্রিষ্টান ভোটার গোষ্ঠী। তিন, তিনি সেকেন্ড অ্যমেন্ডমেন্ডের প্রসঙ্গ টেনেছেন যেটা শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্টত্ববাদী এবং ঘরে বন্দুক রাখার পক্ষের মানুষজনের মনের কথা।“

নিউ ইয়র্কের রাস্তায় বিক্ষোভ

ছবির উৎস, Getty

ছবির ক্যাপশান, নিউ ইয়র্কের রাস্তায় বিক্ষোভ

ওয়াশিংটন থেকে বিবিসির অ্যান্থনি জারকারও বলছেন, বিক্ষোভ শুরুর সাতদিন পর জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প “এই অসন্তোষের মূল কারণ বা পুলিশের সংস্কার নিয়ে টু শব্দও করেননি।“ বদলে তিনি নিজেকে এমন একজন প্রেসিডেন্ট হিসাবে তুলে ধরেছেন যিনি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার কাণ্ডারি।“

ডেমোক্র্যাটদের কাঠগড়ায় তোলা হচ্ছে

মি. ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগীরাও তার সাথে গলা মেলাতে শুরু করেছেন। নিউ ইয়র্কের সাবেক মেয়র এবং মি. ট্রাম্পের ব্যক্তিগত আইনজীবী রুডি জুলিয়ানি টুইট করেছেন, “তাকিয়ে দেখুন যে সব শহরে শত শত মিলিয়ন ডলারের সম্পদ ধ্বংস হচ্ছে, সহিংসতা হচ্ছে, সবগুলোর নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে। ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করলে আপনাদের এই পরিণতিই হবে।“

নিউ ইয়র্ক টাইমসের হোয়াইট হাউজ সংবাদদাতা পিটার বেকার বলছেন, সঙ্কট নিয়ে একটি ঐক্যমত্য তৈরির চেষ্টার বদলে প্রেসিডেন্ট মেরুকরণের চেষ্টায় নেমে পড়েছেন।

“পুরো সঙ্কটকে একটি রাজনৈতিক বিভাজন হিসাবে দেখানোর জন্য মরিয়া হয়ে পড়েছেন তিনি...একজন নেতা হিসাবে তার যে মৌলিক চরিত্র তা আরেকবার স্পষ্ট হয়ে পড়েছে।“

নিউ ইয়র্কের এমহার্টস হাসপাতালের বাইরে দু'জন স্বাস্থ্যকর্মী।

ছবির উৎস, Spencer Platt

ছবির ক্যাপশান, করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় ট্রাম্প সরকার ব্যর্থ হয়েছে বলে প্রতিপক্ষ অভিযোগ করছে।

নির্বাচনের বছরে করোনাভাইরাস সামাল দেওয়া নিয়ে তার নিজের এবং তার প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রচণ্ড চাপে রয়েছেন মি ট্রাম্প। এখন পর্যন্ত যে ৪০টির মত জনমত জরীপ হয়েছে, তার সবগুলোতেই তিনি সম্ভাব্য ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেনের চেয়ে পিছিয়ে।

নভেম্বরের নির্বাচন যেন করোনাভাইরাসের ওপর একটা গণভোটে না হয়ে যায় তা নিশ্চিত করতে তার বুদ্ধিদাতারা মরিয়া হয়ে পড়েছিলেন। যখনই মি. ট্রাম্প চাপের মধ্যে পড়েন, তখনই কল্পিত একটি শত্রু খাড়া করে হম্বিতম্বি, দোষারোপ শুরু করে দেন।

চলতি বিক্ষোভ তিনি একইরকম আচরণ শুরু করেছেন। তিনি বলার চেষ্টা করছেন, সব সমস্যার মূল কারণ ডেমোক্র্যাটিক পার্টি।

আসলে নির্বাচনের বছরে গত পাঁচ মাসে যুক্তরাষ্ট্রে যেভাবে রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে গেছে তা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ছয়মাস আগেও কল্পনাও করতে পারেননি।

‘বিভক্তি তৈরি করা ছাড়া রাস্তা নেই‘

ড. আলী রীয়াজ বলছেন, তার আশা ছিল স্থিতিশীল অর্থনীতির ওপর ভিত্তি করে সহজে তিনি জিতে যাবেন, কিন্তু করোনাভাইরাস সঙ্কটে পরিস্থিতি আমূল বদলে গেছে। কয়েক মাসের মধ্যে চার কোটি মানুষ বেকার হয়ে পড়েছে।

“সুতরাং মূল্যবোধ-সংস্কৃতির ভিত্তিতে সমাজে একটি বিভক্তি তৈরি করে তার সমর্থকদের এককাট্টা করা ছাড়া কোনো রাস্তা মি. ট্রাম্পের কাছে এখন নেই।“

বর্ণবাদ বিরোধী সহিংস বিক্ষোভ তাকে সেই সুযোগ এনে দিয়েছে সন্দেহ নেই।

কৌশল কাজে লাগবে?

কিন্তু মি. ট্রাম্পের এই কৌশল কি কাজে দেবে? কেউ জোর দিয়ে বলতে পারছেন না যদিও এমন উদাহরণ রয়েছে আমেরিকার ইতিহাসে।

উনিশশো আটশট্টি সালে বর্ণবাদ বিরোধী বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে যে নির্বাচন হয়েছিল সেখানে রিচার্ড নিক্সনের প্রধান স্লোগান ছিল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা। সেই নির্বাচনে জিতেছিলেন তিনি।

ড. রীয়াজ বলছেন, কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠী এবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের পেছনে হয়তো গতবারের চেয়ে শক্তভাবে দাঁড়াবে, কিন্তু “ডেমোক্র্যাটদের একটি সরু সুতোর ওপর হাঁটতে হবে।“

তাদের দেখাতে হবে তারা আইন-শৃঙ্খলার পক্ষে, সহিংসতার বিপক্ষে আবার একইসাথে নাগরিক অধিকারের পক্ষে এবং বৈষম্যের বিরোধী। রিপাবলিকানরা আশা করছে এই ব্যালেন্স রক্ষা করা ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে কঠিন হবে।“