করোনাভাইরাস: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে যেভাবে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে নতুন মহামারি

কাজী জেসিন
    • Author, কাজী জেসিন
    • Role, সাংবাদিক, নিউ ইয়র্ক

যে শহর কোনদিন ঘুমায় না সেই শহর ঘুমিয়ে আছে - কবে এই ঘুম ভাঙবে কেউ জানে না। চারিদিকে স্তব্ধ। কোথাও কোনো আওয়াজ নেই।

বাইরে যাওয়া হয় না বলে, রোদের আশায় সারাদিন জানালা খুলে রাখি, কোনো মানুষ দেখা যায় না কোথাও। শুধু থেকে থেকে অ্যাম্বুলেন্সের আওয়াজ। মনে হয় কোনো উত্তরাধুনিক এক চলচ্চিত্রে পুরো পৃথিবী, পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ অভিনয় করছে - কিন্তু কেউ জানে না এই চলচ্চিত্রের শেষ কোথায়।

ঠিক ক'দিন আগেও যে নিউ ইয়র্ক শহর সরগরম ছিল, ঠিক ক'দিন আগেও যে শহর ছিল আলো ঝলমল, আজ সেই শহর স্তব্ধ, অন্ধকার। পুরো নগরী যেন এখন মৃত্যুপুরী।

অসুস্থের সংখ্যা আর মৃতের সংখ্যা ছাড়া কোথাও কোনো খবর নেই।

গতকাল আমাদের বাসার ঠিক উল্টোদিকের বাসা থেকে একজন রোগীকে নিয়ে গেলো অ্যাম্বুলেন্স। বয়স্ক লোক। এই ভদ্রলোক ক'দিন আগেও সম্ভবতঃ ৯১১ কল করেছিলেন। অ্যাম্বুলেন্স এসেছিল, কিন্তু তখন তাকে নিয়ে যায়নি।

কাল যখন অ্যাম্বুলেন্স এলো, দেখলাম অ্যাটেনডেন্টদের বারবার তিনি অসহায়ভাবে হাত দিয়ে তার গলা দেখাচ্ছেন।

নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিন হাসপাতালে লাশ বের করে আনছে স্বাস্থ্য কর্মীরা, ০৭-০৪-২০২০।

ছবির উৎস, Barcroft Media

ছবির ক্যাপশান, মৃতের সংখ্যাই খবর: নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিন হাসপাতালে লাশ বের করে আনছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা

'চিন্তার কিছু নেই'

শুনেছি অসুস্থ হলেই সবাইকে এখন আর হাসপাতালে নেয়া হচ্ছে না। সবাইকে হাসপাতালে নেয়া হলে জায়গার সংকুলান হবে না। অর্থাৎ কেউ যথেষ্ট পরিমাণ অসুস্থ হলেই তাকে হাসপাতাল নেয়া হবে, ততদিনে হয়তো তার মৃত্যু ঝুঁকি আরও বেড়ে যাবে।

গত মাসের ১ তারিখে নিউইয়র্ক রাজ্যের গভর্নর অ্যান্ড্রু কুওমো প্রথম কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীর তথ্য নিশ্চিত করেন। ঠিক সেই সপ্তাহে আমরা জানতে পারি কিছু রোগী বারবার চেয়েও কোভিড-১৯ টেস্ট করতে পারেনি। (বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন )

এর আগে প্রথম রোগী শনাক্ত হওয়ার পর গভর্নর কুওমো বলেন, "এটা কমিউনিটিতে ছড়াবে, কিন্তু চিন্তার কিছু নেই।" আমরা দেখছিলাম চীনে যখন শত শত মানুষ নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে, তখন আমেরিকায় চলছে আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার নিশ্চিত করছিলেন, করোনা আমেরিকাকে আক্রান্ত করতে পারবে না।

পুরো জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে ট্রাম্প বলেছেন, করোনাভাইরাস নিয়ে ভয় পাবার কিছু নেই, করোনাভাইরাস আমেরিকাকে আঘাত করতে পারবে না, সবকিছু নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আছে। এমনকি তিনি নভেল করোনাভাইরাসকে সাধারণ ফ্লু'র সাথে তুলনা করেন।

মার্কিন নৌবাহিনীর ভাসমান হাসপাতাল 'কমফোর্ট' গ্রহণ করছেন নিউ ইয়র্ক রাজ্যের গভর্নর এ্যান্ড্র কুওমো, ৩০-০৩-২০২০।

ছবির উৎস, Barcroft Media

ছবির ক্যাপশান, সামরিক সাহায্য: মার্কিন নৌবাহিনীর ভাসমান হাসপাতাল 'কমফোর্ট গ্রহণ করছেন নিউ ইয়র্ক রাজ্যের গভর্নর অ্যান্ড্রু কুওমো (বাঁয়ে)

জরুরি পদক্ষেপ নেয়া হয়নি

এর অর্থ কি এই যে নভেল করোনাভাইরাস বিষয়ে প্রেসিডেন্টের কাছে যথেষ্ট তথ্য ছিল না?

কিন্তু সংবাদ মাধ্যমের বরাত দিয়ে আমরা জানতে পারি সিনেটর রিচার্ড বার একটি ব্যক্তিগত লাঞ্চে "তার হিল" সদস্যদের সবাইকে এই বলে সর্তক করেন যে, "আগের যে কোন সময়ের চেয়ে ভয়াবহ করোনা আমেরিকাকে আঘাত করবে শীঘ্রই। যা কিনা ১৯১৮ সালের মহামারির মতো ভয়ানক হবে।''

বলা বাহুল্য, ১৯১৮ সালের মহামারিতে বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ আক্রান্ত হয়েছিল, এবং শুধু আমেরিকায় প্রায় সাত লক্ষ মানুষ মারা গিয়েছিল। শাসকদের কাছে এ রকম ভয়াবহ তথ্য থাকার পরও সাধারণ জনগণকে তা জানানো হয়নি, এমনকি এই ভাইরাস যাতে আর না ছড়ায় সেই উদ্দেশ্যে সাথে সাথে জরুরি কোনো পদক্ষেপও নেয়া হয়নি।

নিউইর্য়ক শহরে বাসায় থাকার (স্টে অ্যাট হোম) অর্ডার দেয়া হবে কি-না, এই নিয়ে চলেছে সপ্তাহ জুড়ে সিটি মেয়র আর গর্ভনরের বিতর্ক। আর এই সময়ের মধ্যে আরও দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে গেছে ভয়াবহ করোনাভাইরাস।

মানুষ এখন হয়ে পড়েছে সংখ্যা মাত্র। আর এই সংখ্যায় আমরা ভারাক্রান্ত হচ্ছি প্রতিদিন। শঙ্খ ঘোষ লিখেছিলেন, ''ছিল, নেই - মাত্র এই''। গত এক মাসে ৮ই এপ্রিল দুপুর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে মারা গেছে ১২,৯০৫ জন, যার মধ্যে শুধু নিউইর্য়কে মারা গেছে ৫,৪৮৯ জন।

সংখ্যা দ্রুতগতিতে বাড়ছে। বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত দেশ যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসা ব্যবস্থার ত্রুটি মুখ হা করে তাকিয়ে আছে। ভেনটিলেটরের অভাবে এখন ডাক্তারদের সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে কাকে প্রাধান্য দেয়া হবে। ( বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন )

ক্যালিফোর্নিয়ায় গৃহহীন, ২৬-০৩-২০২০।

ছবির উৎস, Genaro Molina

ছবির ক্যাপশান, ক্যালিফোর্নিয়ায় গৃহহীন: ধনীদের জন্য সাহায্য, গরীবদের জন্য শুধু দুর্ভাগ্য?

মৃত্যু আতঙ্ক বনাম অর্থ আতঙ্ক

ট্রাম্প সরকার ইতিমধ্যে দুই ট্রিলিয়ন ডলারের একটি প্যাকেজ ইমার্জেন্সি বিল পাস করেছে। এই সহায়তা প্যাকেজে ব্যাংক, বীমা ও ব্যবসায়ীদের জন্য বড় অঙ্কের অনুদান ঘোষণা করা আছে। যারা বেশি আয় করছেন, বেশি ট্যাক্স দিচ্ছেন তাদের জনপ্রতি দেয়া হবে ১২০০ ডলার, আর যারা কম ট্যাক্স পরিশোধ করছেন তাদের দেয়া হবে ৬০০ ডলার।

অথচ এই সহায়তা বেশি প্রয়োজন তাদের, যাদের আয় কম, যাদের কোনো সঞ্চয় নেই।

সরকার বাড়ির মালিকদের জন্য তিন মাসের মর্টগেজ মাফ করেছে, কিন্তু বাড়ি ভাড়া মাফ করা হয়নি - অর্থাৎ যারা প্রতি মাসে কাজ করে বাড়ি ভাড়া দিতো, তাদেরও এখন বাসা ভাড়া দিতে হবে। এই পরিস্থিতি নিশ্চয়ই নভেল করোনা আতঙ্কের মধ্যে আরও উদ্বিগ্ন করে তুলছে সাধারণ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ গৃহহীন মানুষ বাস করে যারা রাস্তায়, সাবওয়েতে ঘুমায়। ক্যালিফোর্নিয়ার কংগ্রেস প্রতিনিধি ডেভিন নিউনেস ক'দিন আগে তার এলাকার গৃহহীনদের এক ধরণের সিনেমায় কবর থেকে উঠে আসা 'জিন্দা লাশের' পৃথিবী দখলের সাথে তুলনা করেন। তাদের অনেকেই মাদক সেবনের ফলে অসুস্থ বলে তিনি দাবী করেন। তিনি বলেন, "গৃহহীনদের বাড়তি প্রতিরোধ আছে কারণ তারা বাইরে আছে।'' ( বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন )

কি চমৎকার কথা! আর, নিউইর্য়কে হোমলেস শেল্টারগুলোতে করোনাভাইরাস মোকাবেলার জন্য কোনো ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি। যেখানে শারীরিক দূরত্বের কথা বলা হচ্ছে, সেখানে হোম শেল্টারগুলোতে একটা কিচেন ব্যবহার করতে হয় অনেক আশ্রিতকে।

নিউ ইয়র্কের রাস্তায় গৃহহীন যুবক, ০৭-০৪-২০২০।

ছবির উৎস, John Lamparski

ছবির ক্যাপশান, নিউ ইয়র্কের রাস্তায় গৃহহীন যুবক।

আমেরিকায় ধনী-গরিব বৈষম্য

হোম শেল্টারে থাকা একজন মহিলা তার করুণ অবস্থার কথা জানান, যেখানে একটি মাইক্রোওভেন ব্যবহার করতে হয় সেখানে বাস করা ৫৫টি শিশু ও ৭০ জন মানুষকে। প্রত্যেকটা পরিবারের জন্য বরাদ্দ একটি করে রুম, অর্থাৎ পরিবারের একজন অসুস্থ হলে কোয়ারেন্টিনের কোনো উপায় নেই। ( বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন)

প্রায় দুই কোটি ৭০ লাখ মানুষের হেলথ ইনস্যুরেন্স নেই যুক্তরাষ্ট্রে। ফেডারেল গভর্নমেন্ট যদিও কোভিড-১৯ টেস্ট সবার জন্য ফ্রি করে দিয়েছে, তবু আক্রান্তদের হেলথ ইনস্যুরেন্স না থাকলে মোটা অঙ্কের টাকা গুনতে হবে চিকিৎসার জন্য, যা হেলথ ইনস্যুরেন্স যাদের নেই তাদের সবার জন্যই কঠিন। কারণ মূলত আর্থিক সঙ্কটের কারণেই অনেকে হেলথ ইনস্যুরেন্স নিতে পারে না।

এইসব মানুষ যদি এখন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করে, হয়তো তাদের নিঃস্ব হয়ে যেতে হবে, নয়তো তাদের সারাজীবন বইতে হবে ঋণের বোঝা।

নভেল করোনাভাইরাস যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসা ব্যবস্থার ত্রুটিই শুধু তুলে ধরেনি, ধনী-গরিবের প্রতি রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গিকেও তুলে ধরেছে প্রকটভাবে।

এখন প্রতিদিন সবাই আগাম সর্তকবার্তা পাচ্ছে আরও কতজন মানুষ মারা যেতে পারে, আগামী দুই সপ্তাহ আরও কতো ভয়াবহ হতে পারে ইত্যাদি নিয়ে। সবকিছুর সাথে এখন ছড়িয়ে পড়েছে খাবার স্বল্পতার আতঙ্ক।

নিউ ইয়র্কের বাসিন্দা মাস্ক পড়ে সাইকেলে চড়ে কাজে যাচ্ছেন, ০৬-০৪-২০২০।

ছবির উৎস, Noam Galai

ছবির ক্যাপশান, পরিবেশবান্ধব বিশ্ব? নিউ ইয়র্কের বাসিন্দা মাস্ক পড়ে সাইকেলে চড়ে কাজে যাচ্ছেন।

যুক্তরাষ্ট্রে ২১ কোটি লোক আক্রান্ত হতে পারে

খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) জানিয়েছে, কোভিড -১৯ সংকটকালে আমেরিকায় খাবার সঙ্কট হবে না, এবং এজন্য তারা অডিট পন্থাও শিথিল করেছে। এরপরও অনেকের আশঙ্কা ট্রাক ডেলিভারি কর্মকর্তার অভাবে খাবার সঙ্কট হতেও পারে।

ইতিমধ্যে নিউইয়র্কে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবারের দাম বেড়ে গেছে। অনলাইনে বড় গ্রোসারিগুলোতে খাবার পাওয়া গেলেও ডেলিভারি স্লটের অভাবে তা কেনা যাচ্ছে না। অনেক গ্রোসারি বন্ধ হয়ে গেছে, তাদের কর্মকর্তারা করোনায় আক্রান্ত হওয়ার কারণে।

আমাজনের মতো বৃহৎ প্রতিষ্ঠানে কর্মীরা আন্দোলন করছে নভেল করোনাভাইরাস নিয়ে তাদের ব্যবস্থার প্রতিবাদ করে। এ রকম পরিস্থিতিতে আগামী দিন কেমন হবে তা এখন আর নিশ্চিত করে কেউ জানে না। ( বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন )

যুক্তরাষ্ট্র রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি)-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, "যুক্তরাষ্ট্রে ১৬ কোটি থেকে ২১ কোটি ৪০ লক্ষ মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে। এবং তা কয়েক মাস থেকে এক বছরেরও অধিক স্থায়ী হতে পারে। মারা যেতে পারে দুই লাখ থেকে সতেরো লক্ষ মানুষ।" (বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন )

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, পৃথিবী যে আগে কোনো মহামারি মোকাবেলা করেনি তা তো না। যে ১৯১৮ সালের মহামারির মতো ভয়াবহভাবে নভেল করোনাভাইরাস যুক্তরাষ্ট্রকে আঘাত করবে বলে বলা হয়েছে, সেই মহামারি মোকাবেলার পরও কি প্রস্তুতি যুক্তরাষ্ট্র নিয়েছে আরেকটি মহামারি মোকাবেলা করার?

ইতালির কাসতেলডিডনে স্ট্রবেরি তুলছেন এক যুবক, ০৬-০৪-২০২০।

ছবির উৎস, Marco Mantovani

ছবির ক্যাপশান, মানুষ-বান্ধব বিশ্ব? ইতালিতে ফল তোলার মৌসুম চলে এসেছে।
Banner image reading 'more about coronavirus'
Banner

দরিদ্র জনগোষ্ঠিই বেশি আক্রান্ত

কৃষ্ণ মৃত্যু, স্প্যানিশ ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো মহামারিগুলো আমাদের বলে দেয় দরিদ্র জনগোষ্ঠীই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়, সবচেয়ে বেশি প্রাণ দেয় যে কোন মহামারিতে। কিন্তু শাসকগোষ্ঠীরা বারবারই ভুলে যায়, শ্রমিকের ঘামের সাথেই ঘুরতে থাকে অর্থনীতির চাকা। করোনা কোনো নতুন বিষয় নয়।

২০০২-এ চীনে এসএআরএস বা সার্স ভাইরাসের উত্তরণের সময় বিজ্ঞানীরা বিশ্বকে সর্তক করেছিল এই বলে যে পরবর্তী ভাইরাস হবে ভয়াবহ। জলবায়ু পরিবর্তন ও বিশ্বায়ন তা তরান্বিত করবে। সার্স মোকাবেলার সাথে সাথে মানুষ এই ভাইরাসের কথা, বিজ্ঞানীদের সর্তকবার্তা সব ভুলে যায়।

২০০৯ সাল। এবার আসে সোয়াইন ফ্লু - যুক্তরাষ্ট্রে, মেক্সিকোর শুকরের খামার থেকে যার উৎপত্তি হয়। বিজ্ঞানীরা এবারও সর্তক করেন, বলেন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি। সোয়াইন ফ্লু চলে যায়, আবারও সবাই ভুলে যায় আসন্ন মহামারির আশঙ্কার কথা।

২০১৪। পশ্চিম আফ্রিকাকে আক্রান্ত করে ইবোলা। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা কিছু পদক্ষেপ নিলেও তা অবাস্তবায়িত থেকে যায়।

এখন পৃথিবী হিমশিম খাচ্ছে এসএআরএস - কোভিড ১৯ মোকাবেলায়। কেউ জানে না, এর শেষ কোথায়। ঘরে বসে প্রতিটা মানুষ এক অজানা শত্রুকে মোকাবেলা করছে। আর যার হাতে পয়সা নেই, খাবার নেই, যে সরকারের কোনো সাহায্য পাবে না সে হয়তো করোনাভাইরাসে না হলেও না খেয়ে মারা যাবে। হয়তো তারও করোনাভাইরাস আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে বলে ধরে নেয়া হবে।

স্বাস্থ্যকর্মীদের সম্মানে নিউ ইয়র্ক-এর এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং-এ লাল আলো, ০৭-০৪-২০২০।

ছবির উৎস, Gary Hershorn

ছবির ক্যাপশান, করোনাভাইরাসে আমেরিকার সব চেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শহর নিউ ইয়র্ক-এ স্বাস্থ্যকর্মীদের সম্মানে ভবনে লাল আলো

জীবাণু ঘুমিয়ে আছে মাত্র

পুরো পৃথিবী যেন এক হয়ে চিত্রায়িত করছে আলবেয়ার কাম্যুর উপন্যাস "দ্য প্লেগ"। প্লেগ চলে গেলেও যেমন ডাক্তার রিয়িঁউ জানতেন, প্লেগের জীবাণু চলে যায়নি। ঘুমিয়ে আছে, আবারও কোনো এক সময় জেগে ওঠার জন্য।

তেমনি করোনাভাইরাস ছিল, আবার জেগে উঠেছে। নভেল করোনাভাইরাস শুধুমাত্র এক জীবাণু নয়, বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থার মানুষে মানুষে বৈষম্য, ভোগবাদ, পরিবেশ বিনষ্টকারী, প্রকৃতি বিরুদ্ধ এক অসুখের নাম, কোভিড-১৯।

বর্তমান অবস্থাকে এখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মনে করা হচ্ছে। এই নভেল করোনাযুদ্ধ পরবর্তী পৃথিবী কেমন হবে কেউ জানে না। নতুন পৃথিবী কি প্রস্তুত হবে একটি জনবান্ধব, পরিবেশ-বান্ধব বৈশ্বিক পরিবেশ তৈরি করতে?

যতদিন বিশ্ব ব্যবস্থা মানুষের চেয়ে, প্রকৃতির চেয়ে গুরুত্ব দেবে মুনাফা স্ফিতীকরণে, যতদিন ভোগবাদ গ্রাস করে রাখবে, ততদিন পৃথিবী এই জীবাণু থেকে মুক্তি পাবে না। শুধু নভেল করোনা মোকাবেলা নয়, টিকে থাকতে হলে নতুন পৃথিবীতে প্রয়োজন হবে শ্রমিক-বান্ধব, প্রকৃতি-বান্ধব সর্বোপরি মানুষ-বান্ধব এক নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা।

কিন্তু সেদিন কতদূর তা আমরা জানি না। মৃত্যুর সংবাদের মধ্যে বসে দিন গোনা দুরূহ কাজ।

(প্রতিবেদনে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব)