ইতিহাসের সাক্ষী: কিভাবে সার্স রোগের মোকাবিলা করেছিল হংকং

ছবির উৎস, Getty Images
দু'হাজার তিন সালে পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল সার্স নামের এক সংক্রামক ভাইরাস, যাতে আক্রান্ত হয়েছিলেন ৮ হাজারেরও বেশি লোক এবং ১৭টি দেশে মৃত্যু হয়েছিল ৭৭৪ জনের।
'সিভিয়ার একিউট রেস্পিরেটরি সিনড্রোম' বা সার্স নামের এই রোগের খবর প্রথম বেরোয় ২০০৩ সালে। অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছিল।
ছয় মাসের মধ্যেই এ রোগে ৭ শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়, আর বেশির ভাগ মৃত্যুই হয় পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়।
সংক্রমণের ভয়ে ওই অঞ্চলের জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়ে। ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে ভ্রমণের ওপর নানা রকম নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছিল।
দু:স্বপ্নের মতো এ রোগের সূচনা হয় ২০০২ সালের শেষ দিকে দক্ষিণ চীনের গুয়াংডং-এ। তবে এ রোগ চীনের বাইরে ছড়িয়েছিল একটি বিয়ের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে।
গুয়াংডং-এর এক ডাক্তারের হংকং যাত্রা
সেটা পরের বছর ফেব্রুয়ারি মাসের কথা।
গুয়াংডং-এর এক ডাক্তার ড: লু জানলুং এক অস্বাভাবিক ধরণের নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ক'জন রোগীর চিকিৎসা করে তার পারিবারিক এক বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে হংকং গেলেন।

ছবির উৎস, Getty Images
হংকংএর মেট্রোপোল হোটেলে ৯১১ নম্বর কক্ষে উঠলেন তিনি। হয়তো লিফটে তিনি একবার হাঁচি দিয়েছিলেন, এবং তা থেকেই আরো সাতজন লোক এতে সংক্রমিত হন।
এই সাতজন ভাইরাসটিকে নিয়ে যান ক্যানাডা, সিঙ্গাপুর এবং ভিয়েতনামে। হংকং পরিণত হলো সার্স ছড়ানোর কেন্দ্র বা এপিসেন্টারে।
হাসপাতাল কর্মী টম বাকলির অভিজ্ঞতা
হংকংএর প্রিন্সেস মার্গারেট হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট সেবার প্রধান টম বাকলি।
"আমার উদ্বেগ ছিল, ওই হাসপাতালে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে যারাই আসছিল তাদের কেউই সেরে উঠছিল না। আমার মনে আছে পাঁচ-ছ'দিন পর এমন অবস্থা হলো যে ইউনিটের প্রায় পুরোটাই রোগীতে ভরে গেল। মাত্র একটি কি দুটি বেড খালি ছিল।"
"আমি বাড়িতে ঘুমাতে পারছিলাম না। শুধু মনে হতে লাগলো, এর পর যে রোগীরা আসবে তাদের আমি কোথায় থাকতে দেবো? ভোর পাঁচটার সময় আমি একটা ফোন পেলাম। আমাকে বলা হলো, আরো একজন রোগী এসেছে - এবং আমাকে আইসিইউতে যেতে হবে। "
হংকং হাসপাতালের প্রধান উইলিয়াম হো
সে সময় হংকং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রধান ছিলেন উইলিয়াম হো।
"আমরা নিয়ম করেছিলাম যে সব নিউমোনিয়ার রোগীকে এক সাথে রাখা হবে। তবে তাদের চিকিৎসা হবে আলাদা আলাদাভাবে।"

ছবির উৎস, Getty Images
"আমাদের মেডিক্যাল স্টাফদের দু-ভাগে ভাগ করা হলো - 'ক্লিন' টিম আর 'ডার্টি' টিম। ক্লিন টিমে যারা ছিলেন তারা এই ইউনিটের কোন রোগীর পরিচর্যা করেন নি, তারা সব সময়ই অন্য ওয়ার্ডে কাজ করেছেন।"
"অন্যদিকে ডার্টি টিমের সদস্যরা শুধু এই সংক্রমণে আক্রান্তদেরই পরিচর্যা করেছেন, তারা অন্য কোন ওয়ার্ডের রোগীদের স্পর্শও করতেন না। তখন এর চেয়ে ভালো কিছু করার উপায় ছিল না।"
'বাড়িতেও মুখোশ পরে থাকতাম আমরা'
টম বাকলি বলছিলেন. হাসপাতালের স্টাফদের অনেককে হোটেলে থাকতে হয়েছিল।
"আমি আমার অফিসের মেঝেতে ঘুমোতাম। মাঝে কখনো বাসায় গেলেও আমি বসার ঘরে সোফাতেই ঘুমোতাম। আমি বাড়ি যেতাম অনেক রাতে, আবার অনেক ভোরে বেরিয়ে পড়তাম - আমার স্ত্রী এবং ছেলেমেয়েরা ঘুম থেকে ওঠার আগেই ।"
টম বাকলির কথায় - "আমি বাড়িতে গেলেও কি কি নিয়ম মেনে চলতে হবে তার একটা গাইডলাইন তৈরি করে দেয়া হয়েছিল। এমনকি আমরা বাড়িতেও মুখোশ পরে থাকতাম, যেটা একটা পরাবাস্তব ব্যাপার বলে মনে হতে পারে।"
"আমাদের সম্পূর্ণভাবেই আলাদা থাকতে হতো। বাসায় আমাদের টুথপেস্ট, সাবান - এসবও ছিল আলাদা, যাতে আমার থেকে কোনভাবে অন্য কেউ সংক্রমিত হতে না পারে।"

ছবির উৎস, Getty Images
"এমনকি টয়লেট কি ভাবে ব্যবহার করতে হবে তারও একটা গাইডলাইন ছিল। একটা জরিপে দেখা গিয়েছিল যে আপনি যদি টয়লেটের ঢাকনাটা খোলা রেখে ফ্লাশ করেন - তাহলেও সেখান থেকে ছড়ানো পানির কণা ছাদ পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে।"
সংবাদ মাধ্যমে ঘোষণা প্রচারিত হচ্ছিল, কীভাবে মানুষ নিজেদেরকে সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করবে।
ঘোষণায় বলা হয়, এই রোগ শ্বাস-প্রশ্বাসের সময় নির্গত পানির কণার মাধ্যমে, এবং রোগীর দেহনি:সৃত তরল থেকে ছড়ায়। সংক্রমণের ঝৃঁকি কমাতে তরল সাবান দিয়ে বার বার হাত ধুতে হবে। এবং যে তোয়ালে দিয়ে হাত মুছবেন - তা ফেলে দিতে হবে।
"আপনার চোথ, নাক বা মুখ স্পর্শ করার আগে হাত ধুতে হবে। হ্যান্ডশেক করা এড়িয়ে চলুন।"
'রাস্তাঘাটে মুখোশ পরা লোক বাড়তে লাগলো'
টম বাকলি বলছিলেন, "প্রথম দিকে হংকংএর লোকজন এত সচেতন ছিল না যে কি ঘটছে। তবে এ অস্বাভাবিক নিউমোনিয়া মোকাবিলার ব্যাপারে সরকার সক্রিয় হয়ে ওঠার পর, টিভিতে এ বিষয়ে নানা রকম নির্দেশিকা প্রচারিত হতে লাগলো।"
"প্রথম দিকে শহরের কাউকেই প্রকাশ্যে মুখোশ পরতে দেখা যেতো না ।"
"কিন্তু ধীরে ধীরে রাস্তাঘাটে মুখোশ পরা লোক বাড়তে লাগলো, এবং দিন দশেকের মধ্যে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ লোকের মুখে মুখোশ দেখা যেতে লাগলো।"

ছবির উৎস, PETER PARKS
"মানুষও অনেক সচেতন হয়ে উঠলো, তারা নিজে থেকেই রেস্তোরাঁয় খেতে যাওয়া বা রেসকোর্সে যাওয়া বন্ধ করে দিলো, শপিংএ যাওয়া কমিয়ে দিলো।
মার্চের শেষ দিকে হংকংএ সার্স নিয়ে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ভাষণ দিলেন উইলিয়াম হো। তার পরপরই তিনি নিজেও সার্স সংক্রমণে আক্রান্ত হন।
'আমি কল্পনাই করতে পারিনি যেআমার সার্স হতে পারে'
উইলিয়াম হো বলছিলেন, "ওই সম্মেলনে আমিই প্রথম বক্তব্য দিলাম। তার পর আমি হাসপাতালে গেলাম, পরে আবার কনফারেন্সের ডিনার ইত্যাদির জন্য ফিরে এলাম।"
"সেদিন ছিল শনিবার। পর দিন রোববার সকালেই আমার অসুস্থ, জ্বর-জ্বর বোধ হতে লাগলো।"
"ভাবলাম নিশ্চয়ই সার্স নয়, অন্য কিছু হয়েছে - তবে নিশ্চিত হবার জন্য আমি একটা এক্সরে করালাম।"
"এক্সরে থেকেই এটা স্পষ্ট হয়ে গেল যে আমার সার্স হয়েছে। আমার সহকর্মীরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লো।"
"এটা ছিল আমার কাছে এক বিরাট আঘাত। তখন পর্যন্ত আমি কখনো কল্পনাই করতে পারি নি যে আমার সার্স হতে পারে। আমার জীবনে হঠাৎ করেই যেন একটা বিরাট ছেদ পড়ে গেল।"

ছবির উৎস, Getty Images
সংবাদমাধ্যমে এটা ছিল এক বিরাট খবর - কারণ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী স্বয়ং সার্স রোগে আক্রান্ত হয়েছেন।
এপ্রিল মাসের প্রথম দিকে হংকং এ ভ্রমণ না করার জন্য এক নির্দেশিকা জারি করলো বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ।
হংকং বাসিন্দাদের মধ্যে ততদিনে আতংক তৈরি হয়েছে।
হংকং-এ সার্স আতংক
টম বাকলি বলছিলেন, তার বন্ধুদের ৮০ শতাংশই হংকং ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।
"আমি ও আমার স্ত্রী একটা পরিকল্পনা তৈরি করলাম - এ পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতে আমরা কী কী করবো।"
"আমরা ঠিক করলাম, আমরা যেখানে থাকি - সেখানে কেউ সংক্রমিত হলে আমরা পুরো পাড়াটাকেই কোয়ারেন্টিন করে ফেলবো, যেখানে মোট সাতটি পরিবার থাকতো।"
"আর যদি এ পরিবারগুলোর মধ্যেই কারো কিছু হয় - তাহলে আমার পরিবার নিজেদেরকে এবং আমাদের বাড়িটাকে কোয়ারেন্টিন করবে। সুপার মার্কেটে যাবো আমি, খাবার কিনে দরজার সামনে রেখে যাবো।"
'ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় আমার হাত-পা ফুলে গেল'
সার্স আক্রান্ত উইলিয়াম হো-কে হাসপাতালের একটি কোয়ারেন্টিন ইউনিটে আলাদা করে রাখা হলো।
সার্সের কোন সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই, তাই ডাক্তাররা তাকে পরীক্ষামূলকভাবে স্টেরয়েড এবং এন্টিভাইরাল ওষূধ দিতে লাগলেন।
হো বলছিলেন, তাতে তার বেশ তীব্র পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়েছিল।
"আমার যেহেতু বয়স খুব বেশি নয় তাই আমার জীবন বাঁচাতে কড়া ডোজে স্টেরয়েড দেয়া হলো। ফলে আমার হাত-পা ফুলে গেল। তারা ইনজেকশন দেবার জন্য শিরা খুঁজে পাচ্ছিল না।"
"আমি আবার তাদের কাছে জানতে চাইছিলাম বাইরের অবস্থা কি, হাসপাতালে ভাইরাস সংক্রমণ রোধ করা গেছে কিনা, আমার মনের মধ্যেও একটা যুদ্ধ চলছিল।"
"আমি ঠিক অন্যরোগীদের মতো ছিলাম না। আমার সহকর্মীরা যখন এই রোগের বিরুদ্ধে লড়ছে, তখন আমি নিজে আমার মনকে শান্ত করতে পারছিলাম না।"

ছবির উৎস, PETER PARKS
"আমার নিজের ফুসফুসের মধ্যে যেমন ভাইরাস ছড়াচ্ছিল, তেমনি হাসপাতালের ভেতরেও রোগ ছড়াচ্ছিল। ফলে দুটি বিষয় নিয়েই আমার দুশ্চিন্তা হচ্ছিল।"
ডা. হো অবশ্য সার্স থেকে পুরোপুরি সেরে উঠেছিলেন। তবে হাসপাতাল থেকেই তিনি দেখেছিলেন হংকং শহরের ওপর এই রোগ কী প্রভাব ফেলেছে।
'সমাজের ভালো দিকগুলো দেখতে পেয়েছিলাম'
"হংকংএর জন্য এটা ছিল খুবই অন্ধকার সময়। টিভিতে দেখছিলাম শহরের বিমানবন্দর এবং রাস্তাঘাট জনশূন্য, ভুতুড়ে চেহারা নিয়েছে। শহরের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।"
"তবে শহরের মানুষ ঐক্যবদ্ধ ছিল। অনেক স্বাস্থ্যকর্মী যারা বাড়ি যেতে পারতেন না - তাদের ছেলেমেয়েদের দেখাশোনা করছিলেন প্রতিবেশীরা।"
"যারা এ রোগের বিরুদ্ধে লড়ছিলেন, তারা নানাভাবে মানুষের সমর্থন পেয়েছেন। আমাদের সমাজের এই সংহতির ভালো দিকগুলো তখন দেখতে পেয়েছিলাম। আশা করি সেটা টিকে থাকবে।
শেষ সার্স রোগীর অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছিল ২০০৪ সালের মে মাসে। তার পর আর কেউ এ রোগে আক্রান্ত হয় নি।
সে বছর জুন মাসের ৫ তারিখ একটা ভালো খবরের কথা জানায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
"আমরা মনে করছি আমরা এই মহামারির সবচেয়ে খারাপ পর্বটি পার হয়ে এসেছি। এর পরে কী ঘটবে তা আমরা জানি না। আক্রান্তের সংখ্যা কমে এসেছে, আমরা এতে স্বস্তি বোধ করছি। কিন্তু লোকজনকে এখনো সতর্ক থাকতে হবে" - বলেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কর্মকর্তা।

ছবির উৎস, BBC Sport









