আড়ং-এর চেঞ্জ রুমে গোপনে ভিডিও করার কথা যেভাবে জানা গেল

বাংলাদেশে পুলিশ বলছে, আড়ং-এর সাবেক এক কর্মীর বিরুদ্ধে তার নারী সহকর্মীদের পোশাক বদলানোর দৃশ্য গোপনে ভিডিও করার অভিযোগ ওঠার পর আটক ওই ব্যক্তির মোবাইল ফোনে এধরনের শতাধিক ভিডিও পাওয়া গেছে।
শুধু তাই নয়, সেসব ভিডিও ব্যবহার করে তিনি একাধিক নারীকে 'ব্ল্যাকমেইল' করার চেষ্টা করেছিলেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
গত ডিসেম্বর মাসে একজন নারী বিক্রয় কর্মীর সাথে অসদাচরণের অভিযোগ ওঠার পর ওই ব্যক্তিকে বরখাস্ত করা হয়েছিল বলে আড়ং-এর একজন কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন।
গত ২৫শে জানুয়ারি অভিযুক্ত ওই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের পর তাকে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে।
ফ্যাশন ও গৃহস্থালি সামগ্রীর একটি সুপারস্টোর আড়ং-এর যে নারী কর্মী ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছিলেন, বিবিসি বাংলাকে তিনি জানিয়েছেন কীভাবে আর কখন তিনি গোপন রেকর্ডিং-এর বিষয়টি টের পেয়েছেন।
তিনি অনিচ্ছুক হওয়ায় এই প্রতিবেদনে তার নাম বা পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
আরো পড়ুন:

কীভাবে জানা গেল?
আড়ং-এর ওই নারী বিক্রয় কর্মী বলেছেন, ''জানুয়ারি মাসের ১০ তারিখে ফেসবুকের একটি ফেকআইডি থেকে একজন আমাকে নক করে। কিন্তু আমার প্রোফাইল লক থাকায় সে আমাকে সরাসরি ম্যাসেজ পাঠাতে পারেনি। ম্যাসেজে সেটা ছিল, কিন্তু আমি আর দেখিনি।''
''পরের দিন সে (গ্রেফতারকৃত সাবেক সহকর্মী) তার আসল আইডি থেকে আমাকে নক করে। তখন সে আমাকে ফেক আইডির লিংক দিয়ে বলে, ওই আইডি থেকে তোমার কথা জিজ্ঞেস করছে। এটা কে? আমি বললাম আমি তো চিনি না। তোমার কথা জিজ্ঞেস করছে, ওই আইডি থেকে ম্যাসেজ দিয়েছে। তুমি ম্যাসেজটা দেখো।''
তিনি বলেন, ''পরের দিন দেখলাম যে ওই ফেক আইডি আমাকে খুব বাজেভাবে ম্যাসেজ করেছে, আমার ব্যক্তিগত ছবি তার কাছে আছে। এসব আজেবাজে কথা লিখে ম্যাসেজ করেছে। তখন আমি জানতে চাইলাম, কে আপনি? কিসের ছবি?''
বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:
''তখন সে আমাকে একটা ভিডিওর স্ক্রিনশট পাঠাল। তারপরে বলেছে, ভিডিও কি দেখবা? তখন আমি বললাম, হ্যাঁ দেখবো।'
''তিনি বললেন, তাহলে ভিডিও কল দিচ্ছি, আপনি ফোন ধরেন।''
''তিনি ফোন দেয়ার আগেই মোবাইলে যে স্ত্রিন রেকর্ডার থাকে, আমি সেটা চালু করলাম। সে ভিডিও কল দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে সব রেকর্ড হচ্ছিল। তখন সে মোবাইলে ভিডিও কলে ওই ভিডিওটা দেখালো যে, আমি ওয়াশরুমে কাপড় চেঞ্জ করছিল।''
কীরকম প্রতিক্রিয়া হয়েছিল?
আড়ং-এর ওই নারী কর্মী বলছিলেন সেদিনের পর তিনি কতটা আতঙ্কের মধ্য দিয়ে গেছেন।
''আমি সারারাত ঘুমাতে পারিনি। সারারাত একটা সেকেন্ডও ঘুমাতে পারিনি।''
''রাতেই আমি অফিসে যোগাযোগ করেছিলাম। কিন্তু তখন অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। পরে সকাল সাতটায় ফোন দিলাম। সারা রাত না ঘুমিয়ে সকাল আটটার মধ্যে অফিসে চলে এলাম। আমি বুঝতে পারছিলাম না কে এই ভিডিও করেছে।''
অনেক প্রশ্ন
তিনি বলেন ভিডিওটির কথা জানার পর তার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে।
''প্রথমে তো আমি বুঝতেই পারছিলাম না, এটা আমার ভিডিও, কে করলো ভিডিও- কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।"
''ওই ব্যক্তিকে (ফেক আইডিধারী ব্যক্তি) আমি ফোনে জিজ্ঞেস করেছিলাম সে কে? সে বলেছে, সে আমার অফিসের কেউ না। আমাকে নাকি কোন একসময় প্রপোজ করেছিল। আমি তাতে রাজি হয়নি বলে সে এমনটা করেছে।"
"আমি রাজি হলে নাকি এরকম করতো না। রাজি হইনি বলে টাকাপয়সা খরচ করে অন্য একজনকে দিয়ে নাকি আমার ভিডিও তৈরি করিয়েছে। সে নাকি ১৩,০০০ টাকা খরচ করেছে। সে বলেছে, সে নাকি আমার একার ভিডিও করেছে।''

ছবির উৎস, আড়ংয়ের ফেসবুক পাতা থেকে নেয়া
ফেক আইডির ব্যাপারে সাবেক ওই পুরুষ সহকর্মী প্রথমে জানানোর কারণে তার ওপরেই প্রথম সন্দেহ হয় হয়রানির শিকার ওই নারী কর্মীর।
''আমি ওই ফেক আইডিকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কিভাবে জানেন যে, সে (সাবেক সহকর্মী) এখানে চাকরি করে? তখন ফেক আইডি থেকে বলা হয়, আরো অনেককে সে নক করেছে, কিন্তু সে সাড়া দেয়নি। শুধু ওই ব্যক্তি সাড়া দিয়েছে।''
তিনি জানান, ফেক আইডির একটি প্রোফাইল পিকের সূত্র ধরে তিনি তাকে শনাক্ত করতে সক্ষম হন।
''সে হয়তো কোনভাবে জানতে পেরেছে, যে আইডির ছবির ব্যাপারে সন্দেহ হয়েছে। দুইদিন পরে সে ফেক আইডি চালু থাকলেও ছবি দুইটা মুছে ফেলে।''
সাধারণ ডায়রি করার পর থেকে ওই ফেক আইডি থেকে কাউকে আর পাওয়া যায়নি।
কী ধরণের হুমকি দিতো
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই নারী বলছিলেন, ''সে আমাকে বলতো, আমি তোমার কোন ক্ষতি করতে চাই না। তুমি শুধু আমাকে সময় দিবা। সামনাসামনি দেখা করতে হবে না, ফেসবুকে সময় দিলেই হবে।''
''ওয়াশরুমে গিয়ে ছবি তুলে পাঠাতে হবে। চেহারাও দেখাতে হবে না, কিন্তু ওয়াশ রুমে গিয়ে এই এই করতে হবে। তাহলে ভিডিও আর ভাইরাল হবে না।''
ভয়ের মধ্যে বসবাস
হয়রানির শিকার এই নারী কর্মী বলছিলেন, এই ঘটনার পর তাকে চরম ভীতি আর ট্রমার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে।
''এই কাহিনী হওয়ার পর পুরো এক সপ্তাহ আমি একা একা ওয়াশরুমে যেতে পারিনি। অফিসের ওয়াশরুমে তো যাইনি, বাসাতেও ওয়াশরুমে গেলে কাউকে সঙ্গে নিয়ে গেছি।''
''আমার সারাক্ষণ ভয় লাগতো। আমি তো কল্পনাও করিনি কেউ একজন ভিডিও করবে। ওয়াশরুমে গেলেই ভয় কাজ করতো যে, কেউ একজন হয়তো আমাকে ফলো করছে, আমাকে ভিডিও করছে। প্রচণ্ড ভয়ে কেটেছে।''

তিনি জানান, অভিযুক্ত ওই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের পর তার এখন একটু নিরাপদ লাগছে।
''এখন আমি বাসাতেও, নিজের রুমেও যদি কাপড় পাল্টাই, তখন মনে হয়, কেউ কি আমার কিছু করছে। এখন বাসায় লাইট বন্ধ করে কাপড় পাল্টাই। যখনই কাপড় পরিবর্তনের ব্যাপার আসে, ওয়াশরুমের ব্যাপার আসে, তখন যেন অটোমেটিকলি এটা মাথায় চলে আসে।''
পুরুষ সহকর্মীদের ব্যাপারে মনোভাব কি বদলেছে?
সন্দেহ হলেও সাবেক ওই সহকর্মীকে গ্রেপ্তারের আগে পর্যন্ত তার ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারছিলেন না ওই নারী কর্মী।
''তখনও ভাবছিলাম, হয়তো তাকে দোষ দেয়ার জন্য অন্য কেউ করছে। কিন্তু কারো সঙ্গেই স্বাভাবিক বোধ করতাম না। শিওর হতে না পারায় সবাইকেই সন্দেহ হতো।''
কিন্তু এখন সেই অনুভূতি কেটে গেছে বলে তিনি জানান।
প্রথমে তিনি থানায় অভিযোগ করতে গেলে থানা থেকে বলা হয়, সাইবার ক্রাইম বিভাগে যাওয়ার জন্য। সেখানে যাওয়ার পর তারা বিস্তারিত শুনে লিখে নেয়। এরপরে তারা বলে, "আমরাই পরবর্তী ব্যবস্থা নিচ্ছি, আপনি শুধু বনানী থানায় গিয়ে একটি সাধারণ ডায়রি করুন।" এরপরে তারা সেখানে একটি সাধারণ ডায়রি করেন।
তার কয়েকদিন পরেই সাবেক ওই সহকর্মীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
সাইবার সিকিউরিটি ইউনিটের দায়ের করা এজাহারে বলা হয়েছে, "মেসেজটি ওপেন করে ওই কর্মচারী দেখেন যে একটি ভিডিও প্রেরণ করা হয়েছে যেখানে ওই কর্মচারী আড়ং-এর চতুর্থ তলায় চেঞ্জ রুমে পোশাক পরিবর্তন করছেন, যা তার অজান্তে ধারণকৃত। তখন আইডিটি তাকে ভিডিও কলে শরীর দেখাতে বলে এবং না করলে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল করার হুমকি দেয়।"
আড়ং-এর ওই নারী বিক্রয় কর্মী বলেছেন, "যত সিকিউরিটি থাকুক না কেন, সবার উচিত কাপড় পরিবর্তনের সময় সতর্ক থাকা। বিশেষ করে অন্তত লাইট বন্ধ করে কাপড় বদলানো উচিত।"








