দিল্লির বাসে গণধর্ষণ: সাত বছর পেরিয়ে গেলেও ধর্ষণকারীদের মোকাবেলায় ভারতের বিচার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?

ছবির উৎস, Getty Images
ভারতের রাজধানী দিল্লিতে একটি বাসে নৃশংস গণধর্ষণ ও হত্যার সাত বছর পেরিয়ে গেছে - এই ঘটনার পর থেকে এখনও দেশটির বিচার ব্যবস্থা সবার মনোযোগ আকর্ষণ করে চলেছে।
শুরুতে, ওই ভয়াবহ ঘটনাটি সংক্ষেপে মনে করিয়ে দিতে চাই - ওই তরুণী এবং তার পুরুষ বন্ধু ২০১২ সালের ১৬ই ডিসেম্বর রাত নয়টার পরে বাসে উঠেছিলেন।
তারপরে বাসচালক ও অন্য পাঁচজন মেয়েটিকে গণধর্ষণ করে তার বন্ধুকে মারাত্মক মারধর করে। পরে তাদের দুজনকে উলঙ্গ ও রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তার পাশে মৃত্যুর জন্য ফেলে রেখে তারা পালিয়ে যায়।
কয়েকজন পথচারী তাদের দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দেয়, পরে তাদেরকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
গুরুতর আঘাত নিয়ে পনেরো দিন ধরে জীবিত ছিলেন ওই তরুণী। তার বন্ধু বেঁচে আছেন ঠিকই, কিন্তু সেই ভয়াবহ স্মৃতির ক্ষত এখনও বয়ে বেড়াতে হচ্ছে তাকে।
এই নির্যাতনের বর্বরতা গোটা ভারতকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল এবং সংবাদমাধ্যম মেয়েটিকে নির্ভয়া বলে অভিহিত করতে থাকে - এর অর্থ 'যার কোন ভয় নেই- নির্ভীক'।
অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ডের সাজা দেয়া হয়েছে তবে কখন তা কার্যকর হবে সেটা অনিশ্চিত।
ভারতে ধর্ষণের হার উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে কারণ, ২০১৭ সালের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী সারা ভারতে প্রতিদিন গড়ে ৯০টিরও বেশি ধর্ষণের খবর পাওয়া যায়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ধর্ষণের সংখ্যা আরও বেড়েছে বলে জানা গেছে, যদিও এই ধর্ষণের শিকার বেশিরভাগ নারীই তাদের ধর্ষণকারীদের দোষী সাব্যস্ত হতে দেখেন না।
বিবিসি, অন্যান্য দেশের সাথে ভারতের এই পরিসংখ্যান তুলনা করে দেখেছে।

বিচার ব্যবস্থায় কী হয়েছে?
২০১২ সালের গণধর্ষণ ও হত্যার পর থেকে ভারতে নারীদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা ইস্যুটি বেশি মনোযোগ পেয়েছে।
সরকারি হিসাব থেকে দেখা গেছে যে, নির্ভয়া হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশের কাছে দায়ের হওয়া ধর্ষণ ঘটনার সংখ্যা ব্যাপক বেড়ে গেছে।
২০১২ সালে এই সংখ্যা ২৫,০০০ এর কিছু কম ছিল। ২০১৬ সালে সেটা ৩৮,০০০ ছাড়িয়ে যায়।
সবশেষ ২০১৭ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ৩২,৫৫৯টি ধর্ষণের অভিযোগ পুলিশের কাছে রিপোর্ট করা হয়।
তবে ভারতের আদালতকে এই ক্রমবর্ধমান ধর্ষণের মামলা মোকাবেলায় লড়াই করতে হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।
কারণ ২০১৭ সালের শেষের দিক পর্যন্ত এক লাখ ২৭ হাজার ৮শ'টিরও বেশি মামলা বিচারাধীন ছিল।
সেবছর কেবলমাত্র ১৮,৩০০টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছিল।
অথচ ২০১২ সালে আদালত ২০,৬৬০টি মামলার নিষ্পত্তি করে এবং সে বছরের শেষ দিকে বিচারাধীন ছিল অন্তত এক লাখ ১৩ হাজার মামলা।

দোষী সাব্যস্ত করার হার কেমন?
২০০২ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে এটি আদালতে যাওয়া সমস্ত মামলার প্রায় ২৬% মামলায় অভিযুক্তদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
২০১২ সালের পরে, দোষী সাব্যস্ত হওয়ার হার কিছুটা বাড়তে থাকে। তবে ২০১৬ সালে এই হার ২৫%-এ নেমে আসে।
২০১৬ সালে এই দোষী সাব্যস্ত হওয়ার হার বেড়ে ৩২%-এ দাঁড়ায়।
মামলাগুলি আদালতে পৌঁছাতে যে সময় লাগে, এবং ভুক্তভোগী এবং সম্ভাব্য সাক্ষী উভয়ের ওপর প্রায়ই যে চাপ প্রয়োগ করা হয়, সে অবস্থায় অপরাধীদের দোষী সাব্যস্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এছাড়া বিবাদী, অর্থাৎ যার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে তিনি যদি হাইপ্রোফাইল বা রাজনৈতিক ভাবে প্রভাবশালী কেউ হন, তখনও তাদের দোষ প্রমাণ করা কঠিন হয়ে যায়।
উদাহরণস্বরূপ, ২০১৮ সালে দোষী সাব্যস্ত হওয়া আধ্যাত্মিক গুরু আশারাম বাপুর বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণ মামলায় কমপক্ষে নয় জন সাক্ষীর ওপর হামলা চালানো হয়েছিল।
গত বছর, ভারত সরকার জানায় যে ধর্ষণের মামলার জট মোকাবেলা করার জন্য অতিরিক্ত এক হাজার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে।
ভারতকে কীভাবে আন্তর্জাতিক বিশ্বের সাথে তুলনা করা হচ্ছে?
ভারতে ধর্ষণের মামলায় দণ্ডাদেশের হার অন্য কয়েকটি উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় বেশি বলে মনে করা হয়।
দক্ষিণ আফ্রিকায়, ২০১৭ সালে গবেষণা থেকে জানা গেছে যে, আদালতে মুখোমুখি হওয়া ধর্ষণকারীদের মাত্র ৮% দোষী সাব্যস্ত হয়েছে।
বাংলাদেশে একটি নারী অধিকার গ্রুপের ২০১৮ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী দেখা গেছে যে, বাংলাদেশে ধর্ষণের মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার হার খুবই কম।
যেসব দেশে অপরাধের কারণে দোষী সাব্যস্ত করার হার বেশি, সেখানে একটি বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, সেটা হল হাতে গোনা কয়েকটি মামলা আদালতে নিষ্পত্তি হচ্ছে।
অর্থাৎ ধর্ষণের কারণে অপরাধীদের দোষী সাব্যস্ত করার হারও কম।
যুক্তরাজ্যের একাংশে, পুলিশের কাছে দায়ের হওয়া ধর্ষণের মামলার সংখ্যা এবং বিচারের ফলাফলের সংখ্যার মধ্যে ব্যাপক ব্যবধান দেখা গেছে।
এই বছর, ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসে রিপোর্ট হওয়া ধর্ষণের ঘটনা আদালত পর্যন্ত যাওয়ার অনুপাতটি গত এক দশকের বেশি সময় ধরে সর্বনিম্ন স্তরে রয়েছে।
এই হিসাব, দোষী সাব্যস্তের হার ৬০% রাখার জন্য বিচারিক কর্তৃপক্ষের আকাঙ্ক্ষার সাথে যুক্ত।
সুইডেন এবং অন্যান্য নর্ডিক দেশগুলো লিঙ্গ সমতায় জন্য বৈশ্বিক সমীক্ষায় অনেক ভাল স্কোর করলেও, ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের মতো অপরাধের ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার হার ওই দেশগুলোয় তুলনামূলক কম হওয়ায় অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাদের সমালোচনা করেছে।
তবে ধর্ষণ, পুলিশ রেকর্ডিংয়ের পদ্ধতি এবং বিচার ব্যবস্থার আইনি সংজ্ঞাগুলো একেক দেশে একেক রকম।








