নাগরিকত্ব বিলের বিরুদ্ধে ভারতে তীব্র প্রতিবাদ, বন্ধ

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
- Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি
সোমবার মধ্যরাতে ভারতের লোকসভায় বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল বিপুল ভোটে পাস হওয়ার পরও নানা মহলে এই বিলের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ হচ্ছে।
দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের ডাকে এই বিলের বিরুদ্ধে মঙ্গলবার ১১ ঘন্টার সর্বাত্মক বন্ধও পালিত হয়েছে।
কংগ্রেস, তৃণমূল-সহ বিভিন্ন বিরোধী দল যেমন পার্লামেন্টে এই বিলের বিরোধিতা করেছে, তেমনি বিভিন্ন মুসলিম দলের নেতারাও বিলটিকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন।
ভারতের অ্যাক্টিভিস্ট ও সাবেক আমলাদের একাংশ তো এই বিলের বিরুদ্ধে আইন অমান্য আন্দোলন গড়ে তোলারও ডাক দিচ্ছেন।
হাজারো প্রতিবাদের মুখেও সরকার অবশ্য তাদের অবস্থানে অনড়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখন বিলটিকে রাজ্যসভায় আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ছবির উৎস, Getty Images
সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডেমন্ট বিল বা সিএবি নামে পরিচিত এই বিতর্কিত বিলটির বিরুদ্ধে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল প্রতিবাদে উত্তাল গত বেশ কিছুদিন ধরেই - আর মঙ্গলবার তা তুঙ্গে পৌঁছয়।
অল অরুণাচল প্রদেশ ছাত্র ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট হাওয়া বাগাংয়ের কথায়, "সরকার নিজেদের রাজনৈতিক অভিসন্ধিতে এই বিল এনেছে।"
"আমরা উত্তর-পূর্বের লোকজন নিজেদের ভারতীয় ভাবি, দেশপ্রেমী ভাবি।"
"অমিত শাহ্ও যদি নিজেকে ভারতীয় ভাবেন, তার উচিত হবে এটি প্রত্যাহার করে নেওয়া।"
"আর বাংলাদেশ-পাকিস্তান থেকে আসা হিন্দুদের তিনি এদেশে বসত করতে দেবেন বলছেন, তো সেই জায়গাটা কোথায়? আমাদের এখানে তো কোনও জায়গাই দেখছি না!"

ছবির উৎস, Getty Images
বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর:
উত্তর-পূর্ব ভারতের সবক'টি ছাত্র সংগঠন মিলেই এদিন ওই অঞ্চলের সাতটি রাজ্যে সকাল-সন্ধ্যো হরতাল পালন করেছে। বিক্ষোভে-প্রতিবাদে স্তব্ধ হয়ে গেছে গুয়াহাটি থেকে আগরতলা।
অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন বা আসুর নেতা লুরিনজ্যোতি গগৈও বলছেন, "এই বিলের নাম করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নতুন করে বিদেশিদের ঢোকানোর চেষ্টা ছাত্ররা কিছুতেই মেনে নেবে না।"
"এদের কারণেই এই অঞ্চলের ভূমিপুত্রদের ভাষা-কৃষ্টি-রাজনৈতিক অধিকার অনেক আগে থেকেই হুমকির মুখে।"
কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীও এদিন টুইট করেছেন, এই বিলটি ভারতীয় সংবিধানের ওপর সরাসরি একটি আক্রমণ।

ছবির উৎস, Getty Images
এই বক্তব্যে সায় দিচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসও। তৃণমূল এমপি মহুয়া মৈত্র যেমন বলছেন, "বিলটি সংবিধানের মৌলিক ভাবনারই পরিপন্থী।"
"আর একজন হিন্দু যদি বাংলাদেশে নির্যাতিত হন, আর একজন মুসলিমও তো মিয়ানমারে নির্যাতিত হচ্ছেন।"
"নির্যাতিতদের যদি আমরা আশ্রয় দেওয়ারই সিদ্ধান্ত নিই, তাহলে তিনি কোন ধর্মের সেটা দেখব কেন?", প্রশ্ন মিস মৈত্রর।
আসামের এআইইউডিএফ দলের নেতা বদরুদ্দিন আজমল আবার পার্লামেন্টে বলেছেন, "এই বিল আমার রাজ্যে আদিবাসী-হিন্দু-মুসলিম, বাঙালি-অসমিয়া সবার মধ্যে লড়াই বাঁধিয়ে দিচ্ছে - কাজেই এটা একটা ডিভাইড অ্যান্ড রুল বিল।"

ছবির উৎস, Getty Images
"আমার প্রশ্ন, ভারতের স্বাধীনতায় কি এদেশের মুসলিমরা, আমাদের বাপ-দাদারা আত্মত্যাগ করেননি?"
হায়দ্রাবাদের এমপি আসাদউদ্দিন ওয়াইসি তো লোকসভায় বিলের কপিই ছিঁড়ে ফেলেছেন।
উমর খালিদ, কানহাইয়া কুমারের মতো অ্যাক্টিভিস্টরা আবার ডাক দিচ্ছেন সিএবি-র বিরুদ্ধে আইন অমান্য আন্দোলনের।
তবে পার্লামেন্টে বিজেপি এমপি লকেট চ্যাটার্জির কথা থেকেই স্পষ্ট, তার দল এটিকে হিন্দুরাষ্ট্র গড়ার অবতারণা হিসেবেই দেখছে।
বিলটি নিয়ে আলোচনার সময় মিস চ্যাটার্জি লোকসভায় বলেন, "অনেকে বলেন ভারত না কি হিন্দুরাষ্ট্র নয়!"

ছবির উৎস, Getty Images
"কিন্তু যখন কোনও ইসলামি রাষ্ট্রে কেউ নির্যাতিত হন এবং শরণার্থী হয়ে দেশ ছাড়ার কথা ভাবতে হয় তার কিন্তু প্রথমে ভারতের কথাই মনে পড়ে।"
"কারণ তিনি জানেন ভারতই একমাত্র রাষ্ট্র যে তাকে বাঁচাতে পারে, সেই শরণার্থীকে সম্মান দিতে পারে।
"কাজেই সেই শরণার্থীর চোখে ভারত অবশ্যই হিন্দুরাষ্ট্র", বলেন তিনি।
বিলটি পাস হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই এই বিলের তীব্র সমালোচনা করেছে ইউএস কমিশন অন ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডমও।
কিন্তু ভারত সরকার এদিন পাল্টা বিবৃতি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে, ওই সমালোচনা সম্পূর্ণ অবাঞ্ছিত এবং মার্কিন ওই কমিশনের বক্তব্যও তারা আদৌ আমলে নিচ্ছে না।








