ইউটিউবে খেলনার বাক্স খোলার ভিডিও দেখার সুফল ও কুফল

বার্বি হাউজ নিয়ে এভার সবচেয়ে জনপ্রিয় ভিডিওটি ছিয়াশি লাখ বার দেখা হয়েছে

ছবির উৎস, YOUTUBE

ছবির ক্যাপশান, বার্বি হাউজ নিয়ে এভার সবচেয়ে জনপ্রিয় ভিডিওটি ছিয়াশি লাখ বার দেখা হয়েছে
    • Author, চার্লি জোনস
    • Role, বিবিসি নিউজ

বড়দিন যতই এগিয়ে আসছে, সারা বিশ্বের শিশুরাও বোঝার চেষ্টা করছে উপহারের তালিকায় কোন খেলনাগুলো তাদের রাখা উচিত। অনেকে হয়তো দোকানের তালিকা দেখে নিচ্ছে, কেউ কেউ হয়তো খেলনার দোকান এবং টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন দেখে খেলনা বাছাই করার চেষ্টা করছে। আর অনেক শিশু ইন্টারনেটে নানা খেলনার বাক্স খোলা থেকে শুরু করে বর্ণনা দেখে দেখে তাদের সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে।

এ ধরণের ভিডিওগুলোর কী প্রভাব পড়ছে শিশুদের ওপর? এগুলোর কী কোন ক্ষতিকারক দিক আছে?

নয় বছরের ভেরেটির জন্য খেলনার বিস্তারিত পর্যালোচনার ভিডিওগুলো একটা বিশাল সুযোগ এনে দিয়েছে যার মাধ্যমে সে বোঝার চেষ্টা করছে যে, বড়দিনের জন্য কোন খেলনাগুলো নেবে।

এসব ভিডিওতে শিশুরা, কখনো কখনো আরো কয়েকজনের সহায়তায় প্যাকেট থেকে খেলনা খুলে বের করে এবং সেগুলো নিয়ে খেলা করে।

ভেরেটি বিশেষভাবে শপকিন্স, লেগো এবং হ্যারি পটার খেলনার ভিডিওগুলো ইউটিউবে দেখতে পছন্দ করে। ইউটিউব হচ্ছে এ ধরণের ভিডিওর প্রধান প্লাটফর্ম।

''এখানে একটা বিজ্ঞাপনের চেয়ে অনেক বেশি তথ্য পাওয়া যায়। এটা দেখতেও বেশি ভালো লাগে কারণ এসব ভিডিওতে জানা যায় যে এসব খেলনা কীভাবে কাজ করে এবং কীভাবে সেটি নিয়ে খেলতে হয়।''

আরো পড়ুন:

ক্রিসমাসের তালিকা সংক্ষিপ্ত করতে খেলনা প্যাকেট থেকে বের করে বর্ণনা ভিডিও দেখতে পছন্দ করে ভেরেটি
ছবির ক্যাপশান, ক্রিসমাসের তালিকা সংক্ষিপ্ত করতে খেলনা প্যাকেট থেকে বের করে বর্ণনা ভিডিও দেখতে পছন্দ করে ভেরেটি

হার্টফোর্ডশায়ারের সেন্ট আলবানসে বসবাসকারী ভেরেটি নিজেও ভিডিও বানাতে পছন্দ করে, যদিও সেটা শুধুমাত্র তার পরিবার এবং বন্ধুদের দেখার জন্য।

''আমি চাই না সবাই আমার ভিডিও দেখুক, কারণ তাহলে হয়তো তারা সেগুলো নিয়ে মজা করবে এবং খারাপ মন্তব্য করবে।''

ভেরেটি আরো বলছে, ''অনেক সময় মানুষ নিচু আচরণ করে।''

ইউটিউবে এ ধরণের ভিডিও যে শিশুরা শুরু করেছে, তাদের মধ্যে প্রথমদিকের একজন হলো রায়ান কাজি, যখন তার বয়স ছিল মাত্র চার বছর।

প্রথম দিকের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, সে একটি বিশাল ডিম খুলছে, যার ভেতরে একশো ধরণের জিনিসপত্র রয়েছে। ওই ভিডিওটি একশো কোটি বারের বেশি দেখা হয়েছে।

গত বছর ইউটিউবে সবচেয়ে আয় করা তারকা হলো রায়ান, যার আয় ছিল ১৭ মিলিয়ন পাউন্ড। মূলতঃ বিভিন্ন খেলনা কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি আর নিজের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সে এই অর্থ আয় করেছে।

লেস্টারের বাসিন্দা আট বছর বয়সী এভা তার এই সাফল্যকে ছাড়িয়ে যেতে চায়। তিন বছর বয়সে এভা'স টয় নামে সে একটি ইউটিউব চ্যানেল চালু করেছে। সেখানের একটি ভিডিও, যাতে তাকে বার্বি হাউজ খোলা এবং খেলা করতে দেখা যায়, সেটি ছিয়াশি লাখ বারের বেশি দেখা হয়েছে।

তার মা লিনসে ব্রাউন বলছেন, এভা সবসময়েই একজন শিল্পী এবং ভিডিও করতে পছন্দ করে।

''এভা সিদ্ধান্ত নেয় যে কোন খেলনাগুলো নিয়ে কে খেলবে। আমরা বুঝতে পারে, যখন তারা বাবা এসব ভিডিও সম্পাদনা করেন, সেটা দেখে সে অনেক কিছু শিখছে। শিশুরা তার সঙ্গে বেশ একাত্মবোধ করে।''

সব খেলনাই স্থানীয় দাতব্য সংস্থায় দান করে দেয় এভা, যার মধ্যে রয়েছে একটি বিশেষ চাহিদার স্কুল। সে খুব ভালোভাবে জানে, তার অনেক অনুসারী, যারা ফিলিপিন্সে বাস করে, তার মতো এতটা ভাগ্যবতী নয়।

''অভিভাবক হিসাবে এটা খুব হতাশার যে, আপনি একটা খেলনার পেছনে অনেক খরচ করলেন, অথচ পরে সেটা একটা আবর্জনায় পরিণত হলো। সুতরাং আমাদের আশা, অভিভাবকদের আমরা সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবো যে, বড়দিনের সময় আসলে কোন খেলনাগুলো কেনা ভালো হবে।'' তিনি বলছেন।

রায়ান কাজি গতবছর ইউটিউবে সবচেয়ে বেশি আয় করা তারকা। তার একটি ভিডিও একশো কোটি বারের বেশি দেখা হয়েছে

ছবির উৎস, YOUTUBE

ছবির ক্যাপশান, রায়ান কাজি গতবছর ইউটিউবে সবচেয়ে বেশি আয় করা তারকা। তার একটি ভিডিও একশো কোটি বারের বেশি দেখা হয়েছে

শৈশবকালীন খেলাধুলা নিয়ে গবেষণাকারী, ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী গবেষক ডেভ নেল বিশ্বাস করেন, এসব ভিডিও-র একটি ইতিবাচক দিক আছে, যদি সেটা শিশুদের খেলনা নিয়ে খেলা করতে উৎসাহিত করে এবং সেগুলো ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করে।

''শৈশবে খেলা করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটা আমাদের ভাষা শিক্ষা দেয় এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে শেখায়, কীভাবে অন্যদের সঙ্গে ভাগাভাগি এবং যোগাযোগ করতে হয়, যা আসলে আসলে সম্পর্কের অভিজ্ঞতা তৈরি করে। সুতরাং খেলা করতে উৎসাহিত করে এমন সব কিছুই ভালো,'' তিনি বলছেন।

তবে পারস্পরিক যোগাযোগ এবং সামাজিকতার অভাবের বিষয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

''যখন শিশুরা খেলনা নিয়ে খেলা করে, তখন তারা সমস্যা সমাধান এবং সৃষ্টিশীল মনোভাবের থাকে, তারা নিজেরা জানার চেষ্টা করে কীভাবে খেলনাটি কাজ করে অথবা এটা নিয়ে আর কী করা যেতে পারে। এসব ভিডিও দেখার ফলে তাদের আর সেটা করা হয় না।''

খেলনা নিয়ে একটি শিশু

ছবির উৎস, YOUTUBE

এসব ভিডিওর প্রভাব যেখানে সাত বছরের যমজ অলিভার এবং টমাসের ওপর পড়েছে, তা পছন্দ করতে পারছেন না তাদের মা, সাফোকের বাসিন্দা তিন সন্তানের জননী এমা কোনেল-স্মিথ।

''এসব খেলনা খুবই দামি এবং তাদের যদি সেটা কিনে দেয়া সম্ভব না হয়, তাহলে শিশুরা অপ্রাপ্তির কষ্টে ভোগে,''তিনি বলছেন।

''আর এসব ভিডিও এতো লম্বা যে শিশুটা তখন আর অন্য কোন দিকেই তাদের চোখ সরাতে চায় না।''

তার তিন বছর বয়সী কন্যা তিতলি এসব ভিডিও দেখতে চায়, কিন্তু মিসেস কোনেল-স্মিথ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, তাকে আর এগুলো দেখতে দেবেন না।

''এসব খেলনার ভিডিও অল্পবয়সী শিশুদের উদ্দেশ্যে বানানো যেখানে শিশুদের অনেক ভাষা ব্যবহার করা হয়। বাচ্চারা যখন এসব ভিডিও দেখে, তারাও সেসব শব্দ বলতে থাকে, অনেক সময় তারা বুঝতে পারে না এসব শব্দের ব্যবহার কীভাবে করা উচিত।''

নিজের সন্তানদের ইউটিউবে খেলনা খোলার ভিডিও দেখতে দেন না এমা কোনেল-স্মিথ

ছবির উৎস, EMMA CONNELL-SMITH

ছবির ক্যাপশান, নিজের সন্তানদের ইউটিউবে খেলনা খোলার ভিডিও দেখতে দেন না এমা কোনেল-স্মিথ

দুই সন্তানের মা এমা ওরোলোর 'শিশু সংস্কৃতি এবং খেলা' বিষয়ে লিখেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, এ ধরণের বিষয়গুলো অনেক সময় আসক্তির জন্ম দিতে পারে। এই ধারা কমে যাওয়ার কোন লক্ষণও তিনি দেখছেন না।

''সারা বিশ্বের শিশুদের দৃষ্টি এসব ভিডিওর প্রতি, যারা এসব খেলনা বের করা, খেলা করার উপাদানগুলোর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছে। এসব ভিডিওতে কোন বর্ণনা নেই, কোন চরিত্র নেই, কোন সমাপনী নেই। ফলে একটি শিশুর পক্ষে এ থেকে বেরিয়ে আসা বা অর্থবোধকভাবে এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার কোন সুযোগ নেই।''

''এই অভিজ্ঞতাটি অনেকটা সম্মোহনী শক্তির মতো এবং এসব ভিডিও দেখার ফলে শিশুদের আচরণে নেতিবাচক প্রভাব বলে অনেক অভিভাবক অভিযোগ করেছেন।''

ব্রাজিলে শিশুদের জন্য কোনরকম বিজ্ঞাপন দেয়া অবৈধ। সেখানকার সরকারি কৌঁসুলি ইউটিউবের এসব ভিডিওর বিষয় ধরে একটি মামলা করেছেন। ইউটিউবের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে যে, এর মাধ্যমে শিশুদের উদ্দেশ্যে অপব্যবহারমূলক বিজ্ঞাপন প্রচার করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রে শিশু ইউটিউবার রায়ান কাজির বিরুদ্ধে সম্প্রতি ফেডারেল ট্রেড কমিশনে (এফটিসি) একটি মামলা করেছে দেশটির ওয়াচডগ গ্রুপ। তাদের অভিযোগ, সে খুব ছোট শিশুদের ভুল বুঝিয়ে নিজের কাজে ব্যবহার করছে, যারা একটি বিজ্ঞাপন ও পর্যালোচনার পার্থক্য বুঝতে সক্ষম নয়।

ইউটিউবের মালিক প্রতিষ্ঠান গুগল সম্প্রতি একটি নতুন ব্যবস্থা চালু করেছে, যার ফলে শিশুদের উদ্দেশ্যে কোন কনটেন্ট বা বিষয়বস্তু হলে সেটা পরিষ্কারভাবে উল্লেখ থাকতে হবে, যাতে তারা 'টার্গেটেড অ্যাডভার্ট' (কাউকে লক্ষ্য করে প্রচারিত বিজ্ঞাপন) বন্ধ করতে পারে।

এই ভিডিওটি ২৭৬ মিলিয়নবার দেখা হয়েছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে যে স্পাইডারম্যানের পোশাক পড়া ছোট একটি শিশু একটি খেলা গাড়ি বের করে সংযোজন করে নিচ্ছে

ছবির উৎস, YOUTUBE

ছবির ক্যাপশান, এই ভিডিওটি ২৭৬ মিলিয়নবার দেখা হয়েছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে যে স্পাইডারম্যানের পোশাক পড়া ছোট একটি শিশু একটি খেলা গাড়ি বের করে সংযোজন করে নিচ্ছে

শিশুদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনজনিত একটি মামলায় এফটিসির সঙ্গে সমঝোতার অংশ হিসাবে তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

যুক্তরাজ্যে ইউটিউবের একজন মুখপাত্র বলেছেন, টাকার বিনিময়ে প্রচারের উদ্দেশ্যে বানানো যেসব ভিডিও এটি ঘোষণা করে না বা ইউটিউবের শিশুদের অ্যাপে পাওয়া যায় না বলে ঘোষণা করে, সেসব ভিডিও তারা খুব তাড়াতাড়ি বাতিল করে দিচ্ছে।

তবে ভিডিওতে দেখানোর বিনিময়ে শিশুদের যেসব খেলনা দেখা হচ্ছে, এ নিয়ে অবশ্য কোন বিধিবিধান নেই।

যখন নতুন খেলনা প্যাকেট থেকে বের করার বা খেলার ভিডিও সারা বিশ্বে লাখ লাখ দেখা হচ্ছে, তখন অভিভাবকদেরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, এগুলো কি শিশুদের ক্রিসমাসের উপহার বাছাই করার জন্য ভালো একটি উপায় নাকি আসলে তাদের শিশুদের শোষণ করার একটি উপায় মাত্র।

আরো পড়তে পারেন: