ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে চুরি হওয়া শিল্পকর্ম নিয়ে নতুন বিতর্ক

ছবির উৎস, PA Media
নাইজেরিয়া থেকে নিয়ে আসা এই মোরগ ভাস্কর্যের অনেক বিতর্কিত ইতিহাস রয়েছে, যদিও এটিকে এখন ফেরত দেয়া হচ্ছে।
ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ একটি কলেজ সম্প্রতি ঘোষণা করেছে, তারা তথাকথিত বেনিন ব্রোঞ্জ নামে পরিচিত ঐ ভাস্কর্যটি ফেরত দেবে।
বেনিন শহর, যা বর্তমানে নাইজেরিয়া নামে পরিচিত, সেখানে সামরিক অভিযানের পর ১৮৯৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক বাহিনী সাথে করে ভাস্কর্যটিকে ব্রিটেনে নিয়ে আসে।
মোরগটি 'ওকুকর' নামে পরিচিত।
২০১৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ভাস্কর্যটি ফেরত দেবার দাবি জানিয়ে আন্দোলন শুরু করে। তার আগ পর্যন্ত সেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাইনিং হলে সাজানো ছিল।
ক্যামব্রিজের জেসাস কলেজ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, "ভাস্কর্যটি যে বেনিনের আদালত থেকে লুট করে আনা হয়েছিল তাতে কোন সন্দেহ নেই। ১৯০৫ সালে কলেজের একজন শিক্ষার্থীর বাবা এটি কলেজকে উপহার হিসেবে প্রদান করেন।"
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, ভাস্কর্যটি নাইজেরিয়ার এডো জনগোষ্ঠীর সম্পত্তি।
সাংস্কৃতিক ক্ষতিপূরণ
এই ঘোষণার পরই মূলত ব্রিটেনের বিভিন্ন জাদুঘরে প্রদর্শিত নানা রকম ঐতিহাসিক শিল্পকর্ম ফেরত দেবার দাবি ওঠে।
বার্মিংহ্যাাম সিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কেইন্ডি অ্যান্ড্রুজ বলেছেন, "এসব সম্পত্তির বেশির ভাগই আফ্রিকা এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে লুট করে আনা। যে মোরগ ভাস্কর্যের কথা বলা হচ্ছে সেটি চুরি করে আনা হয়েছে। এর পেছনে একমাত্র যুক্তি হতে পারে ওইসব দেশ তখন ব্রিটেনের উপনিবেশ ছিল।"
কিন্তু এখন এসব যার যার দেশে ফিরিয়ে দেয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেছেন।

ছবির উৎস, AFP
আরো পড়তে পারেন:
ব্রিটেনে শুরু হওয়া এই বিতর্ক এবং তার পরবর্তীতে শিল্পকর্ম ফেরত দেবার উদ্যোগ এখন ইউরোপের অন্য দেশেও ছড়িয়ে পড়েছে, বিশেষ করে ফ্রান্সে।
দেশটির প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রঁ আফ্রিকার সাংস্কৃতিক সম্পত্তিসমূহ আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ফেরত দেবার নির্দেশ দিয়েছেন।
সেনেগালের রাজধানী ডাকারে এক অনুষ্ঠানে ফ্রান্স পশ্চিম আফ্রিকার একজন প্রভাবশালী নেতা ওমর সাইদুল তালের ব্যবহৃত একটি তলোয়ার সেনেগালকে ফিরিয়ে দিয়েছে।
১৯ শতকের দ্বিতীয় অর্ধে এখনকার গিনি, সেনেগাল আর মালির একটি অংশ শাসন করেছেন ওমর সাইদুল তাল।
"আমি ভেবেছিলাম এটি একটি মিথ"
ঐ তলোয়ারটি এখন ডাকারে 'মিউজিয়াম অব ব্ল্যাক সিভিলাইজেশনে' রাখা আছে।

ছবির উৎস, AFP
লোহা, পেতল আর কাঠের তৈরি তলোয়ারের মতো বড় আকৃতির তলোয়ারটিতে ফ্রান্সে বানানো একটি ব্লেড জুড়ে দেয়া হয়েছে, এবং পাখির ঠোটের আকৃতিতে একটি হাতল তৈরি করা হয়েছে।
কিন্তু তলোয়ারটি পাকাপাকিভাবে সেনেগালকে দেয়া হয়নি। এটি স্থায়ীভাবে দিয়ে দেয়া হবে কিনা সে নিয়ে ফ্রান্সের এমপিরা ভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেবেন।
ওমর সাইদুল তালের প্র-প্র-পৌত্র মোমোদো টেইল বিবিসিকে জানিয়েছেন, তিনি ভেবেছিলেন ঐ তলোয়ারটি বুঝি বাস্তবে নেই।
আরো পড়ুন:

ছবির উৎস, Getty Images
তিনি বলেন, "তিনি যেহেতু ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধজয়ী নেতা ছিলেন, এমন অনেক ছবি আছে যেখানে দেখা যায় যে তিনি ঐ তলোয়ারটি সামনে রেখে প্রার্থনা করছেন। কিন্তু আমার মনে হত ওটা বুঝি আসলে মিথ।"
ফরাসী ঔপনিবেশিক শাসকেরা আহমাদুর লাইব্রেরিতে লুটতরাজ চালিয়ে অনেক ঐতিহাসিক বই এবং শিল্পকর্ম নিয়ে যায়।
চুরি যাওয়া সম্পদসমূহ
আফ্রিকায় ঔপনিবেশিক শাসনামলে এমন হাজারো সম্পদ চুরি হয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে, যা পরবর্তীতে ইউরোপের বিভিন্ন জাদুঘরে জায়গা পেয়েছে।

ছবির উৎস, British Museum
কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঐ সব প্রতিষ্ঠান সেসব ফেরত দেবার আশ্বাস দিয়েছে। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটির নমুনা দেয়া হলো:
বেনিন ব্রোঞ্জ
বেনিন ব্রোঞ্জ কালেকশন হচ্ছে বেশ কিছু ভাস্কর্য এবং ফলকের সমন্বয়ে গঠিত শিল্পকর্মের সমষ্টি, এর অধিকাংশ পেতলের তৈরি।
বেনিন রাজ্যের ওবা, ওভনরামেন নোগবাইসির বিভিন্ন রাজপ্রাসাদে সেসব সাজানো ছিল।
ব্রিটিশ শাসনের সময় আফ্রিকা থেকে নেয়া প্রায় এক হাজার শিল্পকর্ম বিশ্বের বিভিন্ন জাদুঘরে প্রদর্শন করা হয়।
গত বছর ঐ সব প্রতিষ্ঠান ঋণ আকারের সেসব শিল্পকর্ম ফেরত দিতে সম্মত হয়, ২০২১ সালে যা নাইজেরিয়ার রাজকীয় জাদুঘরে প্রদর্শন করা হবে।
টাসাভোর নরখাদক
এটা কেনিয়ার টাসাভো অঞ্চলের দুইটি সিংহ, যারা ১৯ শতকের শেষ দিকে বহু রেলওয়ে শ্রমিককে হত্যা করে খেয়ে ফেলেছে বলে জানা যায়।

ছবির উৎস, Field Museum of Natural History
সিংহ দুটিকে হত্যার পর তাদেরকে স্টাফড করে শিকাগোর ফিল্ড মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্টরিতে রাখা হয়।
কেনিয়ার কর্তৃপক্ষ বহুদিন যাবত সেগুলো ফেরত চেয়ে আসছে।
রোসেত্তা পাথর
ব্রিটিশ মিউজিয়ামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি শিল্পকর্ম এই প্রাচীন রোসেত্তা পাথর।
এর গায়ে নানা রকম বার্তা খোদাই করে লেখা রয়েছে, যার মাধ্যমে মিসরীয় হায়ারোগ্লিফিকস কিভাবে পড়া যাবে তার সূত্র লেখা রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

ছবির উৎস, AFP
১৮০১ সালে মিসরে নেপোলিয়নের বাহিনীকে পরাজিত করে ব্রিটিশ বাহিনী এই প্রাচীন রোসেত্তা পাথর নিয়ে এসেছিল ইংল্যান্ডে।
বাঙওয়া রানী
৮১ সেন্টিমিটার লম্বা বাঙওয়া রানী কাঠের তৈরি একটি ভাস্কর্য। এটি ক্যামেরুনের সম্পত্তি, যা ক্ষমতা এবং সুস্বাস্থ্যের প্রতীক বলে বিবেচিত।
বিংশ শতকের শুরুতে এটি জার্মান ঔপনিবেশিক শাসকদের হয় উপহার দেয়া হয়েছিল অথবা তারা নিজেরাই লুট করে নিয়ে গিয়েছিল।
এখন সেটি ফ্রান্সের একটি জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। তবে এটি ফেরত দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির সরকার।

ছবির উৎস, Dapper Foundation
মাগডালা সম্পদসমূহ
মাগডালা সম্পদসমূহের মধ্যে ১৮ শতকের ইথিওপিয়ার স্বর্ণের মুকুট এবং রাজকীয় বিয়ের পোশাক রয়েছে।
১৮৬৮ সালে ব্রিটিশ সেনারা তৎকালীন আবিসিনিয়া থেকে সেগুলো নিয়ে গিয়েছিল।
ইতিহাসবিদেরা বলেছেন, সেসময় লুট করে নেয়া সম্পদ বহন করার জন্য ১৫টি হাতি এবং ২০০ ঘোড়া ব্যবহার করা হয়েছিল।
লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট জাদুঘরে এর অনেক কিছুই এখনো প্রদর্শিত হচ্ছে।

ছবির উৎস, V&A Museum
আফ্রিকার উত্তরাধিকার পুনরুদ্ধার
গত বছর ফরাসী কর্মকর্তাদের প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, আফ্রিকার ঐতিহাসিক চিত্রকর্মের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ রয়েছে বিদেশি জাদুঘরে।
ঐ প্রতিবেদন অনুযায়ী অন্তত আফ্রিকার দেশগুলো থেকে ৯০ হাজার শিল্পকর্ম নেয়া হয়েছে, যা ফ্রান্সের বিভিন্ন জাদুঘরে রয়েছে এখন।
প্যারিসের কোয়ে ব্রানলি জাদুঘরে আনুমানিক ৪৬ হাজার শিল্পকর্ম রয়েছে।
ঐ রিপোর্ট প্রকাশিত হবার পর থেকে ধারাবাহিকভাবে শিল্পকর্ম ফেরত দেবার প্রক্রিয়া শুরু হয়।

ছবির উৎস, Reuters
মে মাসে জার্মানি ঘোষণা করে নামিবিয়া থেকে আনা সমুদ্র দিক নির্ণয়কারী একটি পাথর ফেরত দেবে।
এক শতাব্দীর বেশি সময় আগে অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের চুরি হওয়া শিল্পকর্মও এভাবে ফেরত দেয়া হয়েছিল।








