'ল্যাপটপ, সেলফোন আর দুজন নায়ক নায়িকা- এটাই নাটক'

ছবির উৎস, চ্যানেল আই
- Author, আকবর হোসেন
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
বাংলাদেশের সরকার সম্প্রতি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোকে জানিয়েছে যে অনুমতি ছাড়া বাংলায় ডাবিং করা বিদেশী সিরিয়াল প্রচার করা যাবে না।
তথ্য মন্ত্রণালয় সম্প্রতি এক চিঠির মাধ্যমে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোকে এ বার্তা দিয়েছে।
গত কয়েক বছর ধরে নাটকের শিল্পী এবং কলা-কুশলীরা ডাবিং করা বিদেশী সিরিয়াল প্রচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন। সে প্রেক্ষাপটে তথ্য মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্ত এসেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত ডাবিং করা বিদেশী সিরিয়ালগুলো দর্শকদের একটি অংশের মধ্যে জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
রাজশাহীর বাসিন্দা সানজিদা আলম বলছেন, এসব সিরিয়াল দেখার মাধ্যমে তিনি ভিনদেশী সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারেন।
অন্য দেশ, সংস্কৃতি এবং ইতিহাস সম্পর্কে জানার তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকে তিনি বাংলায় ডাবিং করা বিদেশী সিরিয়াল দেখতে পছন্দ করেন।
"এগুলো দেখতে আমার ভালো লাগে। ঘটনাগুলো কিভাবে ঘটেছিল সেটা দেখতে আগ্রহ হয়। এজন্যই ভালো লাগে," বলছিলেন সানজিদা আলম।
শিল্পী এবং নির্মাতাদের অনেকেই দাবি তুলেছেন এসব বিদেশী সিরিয়ালের সম্প্রচার নিষিদ্ধ করার জন্য।

ছবির উৎস, বিবিসি বাংলা
আরো পড়তে পারেন:
এই দাবির অগ্রভাগে ছিলেন বাংলাদেশের একজন সুপরিচিত নাটক নির্মাতা এবং অভিনেতা মামুনুর রশিদ। তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম বিদেশী সিরিয়ালগুলো কি বাংলাদেশের নাটকের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে.?
"হ্যাঁ, করছে। বিদেশে থেকে আনা এসব টিভি সিরিয়ালের মূল্য এতো কম যে আমাদের টেলিভিশন চ্যানেলগুলো তাদের ব্যবসার কারণে ওগুলোই চালাতে চাচ্ছে," বলছেন মামুনুর রশিদ।
বছর তিনেক আগে নতুন সম্প্রচারে আসা একটি বেসরকারি টেলিভিশন তুরস্কের অটোম্যান সাম্রাজ্যের ঘটনাবলীর অবলম্বনে সুলতান সুলেমান নামে একটি সিরিয়াল প্রচার শুরু করে।
এর ফলে নতুন সে চ্যানেলটি দর্শকদের মাঝে বেশ দ্রুত পরিচিত হয়ে উঠে। এরপর আরো কয়েকটি চ্যানেল এখনো সে ধরনের সিরিয়াল প্রচার করছে।
কিন্তু সবগুলোই যে জনপ্রিয় হয়েছে সেটি বলা যাবেনা। বেসরকারি এসএ টিভির অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান জারিন আলতাফ বলছেন, ঐতিহাসিক ঘটনা নিয়ে নির্মিত সিরিয়ালগুলো দর্শকদের বেশি টানে।

ছবির উৎস, বিবিসি বাংলা
"বাংলাদেশে যেসব বিদেশী সিরিয়াল ভালো করছে সেগুলো একটু ইসলাম-ভিত্তিক, একটু মুসলিম বেইজড। ঐগুলোর উপরেই দেখলাম চাহিদা বেশি। দর্শক যখন রিলেট করতে পারে তখনই সেটা সাকসেসফুল হয়," বলছিলেন জেরিন আলতাফ।
টেলিভিশন নাটকে বিজ্ঞাপনের মাত্রাতিরিক্ত আধিক্য নিয়ে যেমন সমালোচনা আছে তেমনি দর্শকদের চাহিদার কথা চিন্তা করে গল্প কতটা তৈরি করা হচ্ছে সেটি নিয়েও বিতর্ক আছে।
বিশ্লেষকরা বলেন, তরুণদের অনেকেই এখন বিনোদনের জন্য নানা মাধ্যমের উপর নির্ভর করছে।
ইউটিউব, নেটফ্লিক্সসহ নানা মাধ্যম এখন তাদের জন্য বেশি উপযোগী। অন্যদিকে যারা বাসায় টেলিভিশন দেখেছে তাদের জন্য উপযোগী অনুষ্ঠান তৈরি করা হচ্ছে কিনা, সেটি এক বড় প্রশ্ন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম এন্ড টেলিভিশনের শিক্ষক হাবিবা রহমান ব্যাখ্যা করছিলেন, কেন বাংলাদেশের দর্শকদের একটি অংশের মাঝে ডাবিং করা বিদেশী সিরিয়ালগুলো জায়গা করে নিয়েছে।
"আমাদের নাটগুলোতে গল্পের দুর্বলতা সাংঘাতিক মাত্রায় চোখে পড়ছে। টেলিভিশনে যদি ভালো জিনিস দেয়া হয়, সেটা দর্শক নিবেই। যখন টেলিভিশন আসে তখন মনে করা হয়েছিল যে গণমাধ্যম যাই দিবে দর্শক সেটাই গ্রহণ করবে। কিন্তু পরবর্তীতে সে ধারণার পরিবর্তন হয়েছে। গণমাধ্যম যেটাই দিবে মানুষ সেটা গ্রহণ করবে না," বলছিলেন হাবিবা রহমান।

ছবির উৎস, বিবিসি বাংলা
টেলিভিশন চ্যানেলগুলো বলছে, বাংলায় ডাবিং করা বিদেশী সিরিয়াল প্রচারের কারণে কোন কোন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নাট্যশিল্পী এবং নির্মাতারা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তাতে কোন সন্দেহ নেই।
কিন্তু তারা মনোযোগ দিচ্ছেন দর্শকদের চাহিদার দিকে। যেসব টেলিভিশন চ্যানেল ডাবিং-কৃত এসব সিরিয়াল প্রচার করছে তারা মনে করছে দর্শকরা এসব সিরিয়ালের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে।
এসব বিদেশী সিরিয়াল প্রচারে কারণে একটি প্রতিযোগিতাও তৈরি হয়েছে বলে উল্লেখ করেন বেসরকারি এসএ টিভির অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান জারিন আলতাফ।
নাট্যকার এবং অভিনেতা মামুনুর রশিদও বাংলাদেশের নাটকের মান নিয়ে উদ্বিগ্ন। সমালোচকর বলছেন এসব নাটকের ৯০ শতাংশই টিন এজ প্রেম নির্ভর।
টিভি নাটকে দর্শকদের আকর্ষণ করার মতো গল্পের অভাব রয়েছে বলেও অনেকে বিশ্লেষক মনে করেন।
নাট্যকার মামুনুর রশিদও বিষয়টিকে স্বীকার করে নিচ্ছেন। তবে এজন্য তিনি স্বল্প বাজেটকে দায়ী করছেন।
মি: রশিদ আক্ষেপ করে বলেন, " সস্তার তিন অবস্থা। সস্তায় কাজ করতে গিয়ে এখন যেটা হচ্ছে, একটা ল্যাপটপ, তিনটা সেলফোন, একজন নায়ক এবং একজন নায়িকা - তাদের বাবা-মা নাই- এটা হচ্ছে। "
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম এন্ড টেলিভিশনের শিক্ষক হাবিবা রহমান বলছেন, বাংলাদেশে নির্মাতাদের জন্য সীমাবদ্ধতা আছে। সেটি মেনে নিয়েই কিভাবে ভালো অনুষ্ঠান তৈরি করা যায় সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে।
টেলিভিশনের অনুষ্ঠানের মান উন্নয়নে দৃষ্টি না দিয়ে শুধু সংস্কৃতি রক্ষার কথা বললে তাতে কোন লাভ হবে না বলে তার ধারণা ।









