নানজিং হত্যাকাণ্ড: চীনাদের গণহত্যা থেকে বাঁচিয়েছিলেন যে ডেনিশ নাগরিক

জাপানি সেনাদের শরণার্থী শিবির থেকে দূরে রাখতে ডেনমার্কের পতাকার আশ্রয় নিতেন সিন্ডবার্গ

ছবির উৎস, Aarhus City Archives

ছবির ক্যাপশান, জাপানি সেনাদের শরণার্থী শিবির থেকে দূরে রাখতে ডেনমার্কের পতাকার আশ্রয় নিতেন সিন্ডবার্গ

পেশাগতভাবে সিমেন্ট ফ্যাক্টরির গার্ড ছিলেন তিনি, কিন্তু চীনে তাকে 'শাইনিং বুদ্ধা' অথবা 'গ্রেটেস্ট ডেন' হিসেবেই ডাকা হয়।

বার্নহার্ড আর্প সিন্ডবার্গ ১৯৩৭ সালে নানজিংয়ে জাপানের ইম্পেরিয়াল আর্মির ভয়াবহ নৃশংসতার সময় চীনের হাজার হাজার মানুষের জীবন বাঁচিয়েছেন।

এত বছর পর ডেনমার্কে তাকে বীরের মর্যাদায় ভূষিত করা হচ্ছে।

শনিবার তাঁর শহর আর্হাসে সিন্ডবার্গ ৩ মিটার (১০ ফিট) উঁচু একটি ব্রোঞ্জের মূর্তি উন্মোচন করেন রানী মার্গ্রেথে।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৩৬ বছর আগে মি. সিন্ডবার্গ মারা যান।

আরো পড়ুন:

আর্হাস শহরের মেমোরিয়াল পার্কে সিন্ডবার্গের মূর্তি

ছবির উৎস, AFP

ছবির ক্যাপশান, আর্হাস শহরের মেমোরিয়াল পার্কে সিন্ডবার্গের মূর্তি

নানজিং শহরের পক্ষ থেকে আর্হাস শহরকে এই উপহার দেয়া হয়। ভাস্কর্যটি তৈরি করেন তিনজন পুরস্কারজয়ী শিল্পী, চীনের শ্যাং রং এবং ফু লিছেং আর ডেনমার্কের লেনে ডেসমেন্টিক।

সিন্ডবার্গের বীরত্বগাঁথার তুলনা করা হয় অস্কার শিন্ডলারের কিংবদন্তীর সাথে, যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১২০০ ইহুদিকে ফ্যাক্টরিতে চাকরি দিয়ে নাৎসিদের গণহত্যার হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। হলিউডের শিন্ডলার্স লিস্ট সিনেমা তৈরি হয়েছে তার কাহিনি অবলম্বনে।

কী করেছিলেন সিন্ডবার্গ?

নানজিংয়ে জাপানি সেনাদের সহিংসতা চালানোর সময় সিন্ডবার্গের বয়স ছিল মাত্র ২৬ বছর। জাপানি সেনাদের ঐ আক্রমণকে 'নানজিং হত্যাকাণ্ড' বা 'নানজিংয়ের ধর্ষণ' হিসেবেও বর্ণনা করা হয়।

সেই সময় শহরটির নাম ছিল নানকিং - যা ছিল গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের রাজধানী।

আর্হাস শহরের সংরক্ষাণাগারের প্রধাম সোরেন ক্রিস্টেনসেন জানান শহরের বাইরে একটি সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতে ৬ হাজার থেকে ১০ হাজার বেসামরিক চীনা নাগরিককে চিকিৎসা সেবা প্রদান করেন এবং আশ্রয় দেন সিন্ডবার্গ, যেখানে তিনি এবং এক জার্মান গার্ড হিসাবে কাজ করছিলেন।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

নানজিংয়ে থাকাকালীন সিন্ডবার্গ

ছবির উৎস, Mariann Arp Stenvig

ছবির ক্যাপশান, নানজিংয়ে থাকাকালীন সিন্ডবার্গ

চীনাদের হিসাব অনুযায়ী, মি. সিন্ডবার্গ প্রায় ২০ হাজার মানুষকে সাহায্য করেছিলেন।

মি. ক্রিস্টেনসেনের ভাষ্যমতে, সিন্ডবার্গ এমন একজন মানুষ ছিলেন যাকে 'দারিদ্র ও বিস্মৃতির আড়ালে মৃত্যুবরণ করতে হলেও আমাদের সর্বকালের সেরা নায়কদের মধ্যে একজন ছিলেন তিনি।'

কার্ল গান্থার নামের একজন জার্মান একটি অস্থায়ী ক্যাম্প ও চীনাদের জন্য একটি হাসপাতাল তৈরি করতে সহায়তা করেন মি. সিন্ডবার্গকে।

১৯৩৭ সালে ড্যানিশ ফার্ম এফ এল স্মিড্থের হয়ে কাজ শুরু করেন সিন্ডবাগং। তার কিছুদিন পরেই জাপানিরা নানজিং দখল করে নেয়।

ছয় সপ্তাহ জাপানিরা বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হত্যা, নির্যাতন ও ধর্ষণ চালায়। সেসময় আনুমানিক ৩ লক্ষ মানুষের প্রাণহাণি হয়।

সহিংসতার শিকারদের মধ্যে অনেকেই ছিল নারী ও শিশু। আনুমানিক ২০ হাজার নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছিল সেসময়।

চীনের অনেক মানুষের পাশাপাশি মি. সিন্ডবার্গও সেসময় জাপানি বাহিনীর সহিংসতার বর্ণনা লিখে গিয়েছেন।

জাপানি সেনারা চীনের যুদ্ধবন্দীদের নির্বিচারে হত্যা করে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, জাপানি সেনারা চীনের যুদ্ধবন্দীদের নির্বিচারে হত্যা করে

ঐ ঘটনার পর থেকে জাপানি কর্তৃপক্ষ ও ইতিহাসবিদরা হতাহতের সংখ্যা নিয়ে বহুবার দ্বন্দ্বে জড়িয়েছেন।

জাপানিরা যেন বোমা না ফেলে সেজন্য সিমেন্ট ফ্যাক্টরির ছাদে বিশাল একটি ডেনমার্কের পতাকা এঁকেছিলেন সিন্ডবার্গ।

জাপানি সেনারা যেন ফ্যাক্টরিতে আক্রমণ না করে সেই লক্ষ্যে ফ্যাক্টরির আশেপাশের এলাকায় জার্মান সোয়াস্তিকা চিহ্ন এবং ডেনমার্কের পতাকা এঁকে রেখেছিলেন সিন্ডবার্গ ও গান্থার।

সেসময় নাৎসি জার্মানি এবং ডেনমার্কের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন ছিল না জাপানের সেনারা, তাই তাদের পতাকা দেখলে আক্রমণের সম্ভাবনা ছিল না।

সিন্ডবার্গকে নিয়ে বই লিখেছেন পিটার হার্মসেন। তিনি বলেন, "যুদ্ধের আগে তার (সিন্ডবার্গ) বিশেষ কোনো লক্ষ্য করার মত বিষয়ই ছিল না।"

"তার উচ্চতা ছিল ৫ ফুট ৯ ইঞ্চির মত, সেসময় ড্যানিশ পুরুষদের গড় উচ্চতা তেমনটাই হতো। স্কুলেও বেশ গড়পড়তা ছাত্রই ছিলেন তিনি।"

"কিন্তু ১৯৩৭ সালের সেই শীতকালে জাপানি সেনাদের নৃশংসতা দেখে কিছু একটা করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।"

নানজিং মেমোরিয়াল হল: দর্শনার্থীদের জন্য নানজিং হত্যাকান্ডের ভয়াবহতার প্রদর্শনী তুলে ধরা হয়

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, নানজিং মেমোরিয়াল হল: দর্শনার্থীদের জন্য নানজিং হত্যাকান্ডের ভয়াবহতার চিত্র প্রদর্শনীর মাধ্যমে তুলে ধরা হয়

সেসময় সিন্ডবার্গকে নিয়ে কী বলতো মানুষ?

নানকিং হত্যাকান্ডের সময় ঝো ঝোংবিংয়ের বয়স ছিল ১৫। তিনি বলেছেন: "একজন ডেনমার্কের নাগরিক একটি শরণার্থী শিবির পরিচালনা করতো। ঐ ক্যাম্পের সদস্যরা আশেপাশের এলাকা পাহারা দেয়ার কাজ করতো। জাপানিরা সেখানে ঝামেলা করতে আসলেই ডেনিশ লোকটি তাদের সাথে আলোচনা করে তাদের থামাতো।"

হার্মসেনের জবানিতে আরেকজন চীনা প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান জানা যায়। ১৯৩৭ সালে গুয়ো শিমেই নামের ঐ কৃষক নারীর বয়স ছিল ২৫।

"জাপানিরা শরণার্থী শিবিরে আসলেই বিদেশী লোকটি (সিন্ডবার্গ) তাদের সাথে কথা বলতো, কখনো কখনো ডেনমার্কের পতাকাটা বের করে দেখাতো। আর কথা বলার পরই জাপানিরা চলে যেত।"

নানজিং হত্যাকাণ্ডের সময় হওয়া নৃশংসতার বর্ণনা সিন্ডবার্গের এক বন্ধুকে লেখা চিঠিতে পাওয়া যায়: "তুমি ভাবতেও পারবে না আশেপাশে কী পরিমাণ রক্ত ছড়িয়ে রয়েছে। অগাস্ট থেকে যুদ্ধের ভয়াবহতা নিয়ে গবেষণা করার যথেষ্ট সুযোগ হয়েছে আমার। এখানে শুধু রক্ত, রক্ত আর রক্ত।"

২০১১ সালে নানজিং মেমোরিয়াল সফর করেন রাণী মার্গ্রেথে: ফুলগুলোর নামকরণ সিন্ডবার্গের নামে করা হয়েছে

ছবির উৎস, Alamy

ছবির ক্যাপশান, ২০১১ সালে নানজিং মেমোরিয়াল সফর করেন রাণী মার্গ্রেথে: ফুলগুলোর নামকরণ সিন্ডবার্গের নামে করা হয়েছে

দাই ইউয়ানঝাই নামের এক চীনা সাংবাদিক নানজিং হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি বলেন ঐ সিমেন্ট ফ্যাক্টরির পরিস্থিতি মানবেতর ছিল।

শেনঝেন ডেইলিতে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, দাই লিখেছেন, "বিপুল সংখ্যক মানুষ এক জায়গায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে অথবা বসে থাকতো। ছাউনিগুলো একদম লাগানো ছিল, সেগুলোর মধ্যে টয়লেটের জন্যও জায়গা ছিল না।"

সিন্ডবার্গ কে ছিলেন?

সিন্ডবার্গ খুব বেশি পড়াশোনা করতে পারেননি। কমবয়সেই তিনি স্কুল ছেড়ে দেন এবং জাহাজের চাকরি নিয়ে বিদেশ চলে যান।

১৯৩৪ সালে চীনে পৌঁছান তিনি। সেখানে শুরুতে ডেনিশ বন্দুক প্রদর্শন করেন, এরপর ব্রিটিশ সাংবাদিক ফিলিপ পেমব্রোক স্টেফেন্সের গাড়িচালক হিসেবে চাকরি নেন।

১৯৩৭ সালের নভেম্বরে সাংহাইয়ে জাপানিদের আগ্রাসনের সময় খবর সংগ্রহ করার সময় এক জাপানি সৈন্যের গুলিতে নিহত হন স্টেফেন্স।

নানজিংয়ে হওয়া নৃশংসতা লিপিবদ্ধ করেন মি. সিন্ডবার্গ, তার কিছুদিন পরই তিনি চলে যান যুক্তরাষ্ট্রে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইউএস মার্চেন্ট মেরিনের হয়ে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পরে ক্যালিফোর্নিয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং পরবর্তী সময়ে নানজিংয়ের হত্যাকাণ্ড নিয়ে খুব একটা কথা বলেননি।

মাত্র কয়েকমাস ফরাসী ফরেন লিজিয়নে কাজ করেন সিন্ডবার্গ

ছবির উৎস, Mariann Arp Stenvig

ছবির ক্যাপশান, মাত্র কয়েকমাস ফরাসী ফরেন লিজিয়নে কাজ করেন সিন্ডবার্গ

১৯৮৩ সালে মারা যান সিন্ডবার্গ।

নানজিংয়ে তার বীরত্বের সম্মাননা দেয়া হয় বিশেষ একটি হলুদ গোলাপের মাধ্যমে, যেটিকে 'চিরকাল নানজিং - সিন্ডবার্গ গোলাপ' বলা হয়।

নানজিং মেমোরিয়ালে ড্যানিশ ফুল চাষী রোজা এসকেলুন্ড ঐ ফুলটি মেমোরিয়ালে রোপন করেছিলেন।

বিবিসিকে পিটার হার্মসেন বলেন, ''সিন্ডবার্গ 'চীনা শরণার্থীদের জন্য সাহায্যের দরজা খুলে দিয়েছিলেন, কিন্তু রূপক অর্থে বললে তিনি তার আত্মার দরজাও খুলে দিয়েছিলেন মানুষের জন্য।''

ইউএস মার্চেন্ট মেরিনের পোশাকে সিন্ডবার্গ

ছবির উৎস, Mariann Arp Stenvig

ছবির ক্যাপশান, ইউএস মার্চেন্ট মেরিনের পোশাকে সিন্ডবার্গ

"যে কারণে সিন্ডবার্গের গল্পটা সার্বজনীন। চরম পরিস্থিতির সময় মনুষত্বের প্রকাশ আপনি থেকেই কীভাবে আসে তার পরিচয় পাওয়া যায় তার কাজের মাধ্যমে।"

"হঠাৎ আশেপাশে চরম অবিচার দেখলে আমরা কীরকম প্রতিক্রিয়া দেখাবো তা আমরা কেউই জানি না। আমরা অন্যদিকে মুখ ফিরিয় নেবো, না নিজেরা পালাবো, নাকি কোনোরকম ভূমিকা রাখবো?"

"ভাগ্যক্রমে আমাদের অধিকাংশেরই সেরকম কোনো পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হবে না। সিন্ডবার্গের তা করতে হয়েছিল, এবং তিনি সেই পরীক্ষা সফলভাবে পার করেছেন।"