'আমার প্রিয় বন্ধু, মোগাদিসুর প্রয়াত মেয়র'

    • Author, অ্যান্ড্রু হার্ডিং
    • Role, বিবিসি নিউজ

কয়েক বছর আগে এক বিকেলে মোগাদিসুর রাস্তায় আমার গাড়ির সামনে রাস্তা আগলে দাঁড়িয়েছিল এক ষন্ডাগন্ডা লোক। হাতে গ্রেনেড, চোখ লাল, অসংলগ্ন আচরণ।

অবস্থা বেগতিক দেখে সাহায্যের জন্য মোবাইলে এক বন্ধুকে রিং করলাম।

আমি নিশ্চিত ছিলাম ইঞ্জিনিয়ার ইয়ারিসো আমার ফোন তুলবেনই। কখনই তিনি আমার কল অগ্রাহ্য করেননি। এবারও করবেন না। এবং আমি জানি যে কোনো উপায়েই এই বিপত্তি থেকে তিনি আমাকে বাঁচাবেন।

ঐ সময়ে ইঞ্জিনিয়ার ইয়ারিসো ছিলেন সোমালিয়ার প্রেসিডেন্টের একজন মুখপাত্র। তবে তার পরে তিনি সরকারে নানা পদ পেয়েছেন - সরকারি উপদেষ্টা, মন্ত্রী এবং সবশেষে মোগাদিসুর মেয়র।

সাহসী, দায়িত্বশীল এবং অত্যন্ত ভদ্র স্বভাবের এই ব্যক্তির গোঁফের নীচে সবসময় যেন হাসি লুকিয়ে থাকতো।

ইঞ্জিনিয়ার ইয়ারিসো ছিল তার ডাকনাম। ইয়ারিসো শব্দের অর্থ - ছোটোখাটো। আর তার সাথে জুড়ে যায় ইঞ্জিনিয়ার কারণ আব্দির রহমান ওমর ওসমান একসময় ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েছিলেন।

কয়েক দশক তিনি লন্ডনে ছিলেন। সোমালিয়ার গৃহযুদ্ধ থেকে পালিয়ে ব্রিটেনে আশ্রয় নেন। লন্ডনের ইলিং এলাকায় কাউন্সিলর পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ইলিং কাউন্সিলে আবাসন কর্মকর্তা হিসাবে অনেকদিন কাজ করেছেন।

কিন্তু ২০০৯ সালে ব্রিটিশ-সোমালি ইঞ্জিনিয়ার ইয়ারিসো একদিন হঠাৎ করে পরিবার পেছনে রেখে একা তার মাতৃভূমিতে ফিরে গেলেন।

কেউই তাকে জোর করে ঠেলে পাঠায়নি। কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। কিন্তু তিনি মনে করেছিলেন দেশে ফেরা তার দায়িত্ব, কর্তব্য।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইঞ্জিনিয়ার ইয়ারিসোর মতো এরকম অনেক প্রবাসী সোমালিয়'র সাথে আমার দেখা হয়েছে যারা নিরাপত্তার হুমকি সত্ত্বেও সংসার- পেশা পেছনে ফেলে মাতৃভূমি পুনর্গঠনের স্বপ্ন নিয়ে দেশে ফিরে গেছেন।

যেমন, তার মাতৃভূমির সংস্কৃতি, খাবার বিশ্ব-পরিসরে পরিচিত করতে সাংবাদিক হোদান নালায়ে কানাডা থেকে ফিরে গিয়েছিলেন সোমালিয়ায়। আমি তাকে চিনতাম। এরকম অসামান্য প্রাণশক্তি এবং উৎসাহ আমি খুব কম মানুষের মধ্যেই দেখেছি।

দু সপ্তাহ আগে দেশের দক্ষিণে এক হোটেলে আল শাবাব জঙ্গি গোষ্ঠীর হামলায় নিহত হন হোদান নালায়ে।

আর সপ্তাহ না ঘুরতেই গত সপ্তাহে আমি পেলাম ভয়াবহ সেই খবর - মোগাদিসুর মেয়রের অফিসে আত্মঘাতী হামলা হয়েছে। নিহত ছয়জন, তবে মেয়র ইঞ্জিনিয়ার ইয়ারিসো আহত হয়েছেন।

উদ্বিগ্ন হয়ে অমি মোগাদিসুতে পুরনো পরিচিত কয়েকজনকে ফোন করলাম। সংবাদ খারাপ - মেয়রের অবস্থা গুরুতর। তার মাথার খুলি ফেটে গেছে। অপারেশনের জন্য তাকে কাতারে পাঠানো হয়েছে।

হামলার পর বিস্তারিত জানতে আমি যাদের ফোন করেছিলাম, তাদের একজন ছিলেন হোদান আলী। হামলার কিছুক্ষণ আগে তিনি মেয়রের অফিস থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন।

তিন সন্তানের মা হোদান একজন কানাডীয়-সোমালি। পেশায় চিকিৎসক। অন্টারিওতে পরিবার ফেলে তিনি দেশে ফিরে মেয়রের উপদেষ্টা হিসাবে কাজ করছেন। মোগাদিসুর দুস্থ মানুষদের কীভাবে সাহায্য করা যায়, তা নিয়ে মেয়রকে পরামর্শ দিতেন।

বিমর্ষ ডা: হোদান আমাকে বললেন, "হামলার পর থেকে কানাডায় আমার পরিবারের লোকজন প্রতিদিন আমাকে ফোন করছে। তাদের একটাই কথা - চলে আসো।"

কিন্তু হোদান যাবেন না।

"যাওয়া সম্ভব নয়। আমরা চলে গেলে জঙ্গিরা শূন্যস্থান পূরণ করবে।"

হামলার পর থেকে ডা: হোদান আলী মুষড়ে পড়েছেন। কাকে বিশ্বাস করবেন আর করবেন না- বুঝে উঠতে পারছেন না কারণ মেয়রের অফিসে তার কাছেই বসে কাজ করতেন এমন একজন অন্ধ নারী কর্মী সেদিন ঐ বোমাটি ফাটিয়েছিলেন।

হোদান বললেন, "অন্টারিওতে মানুষ সবসময় জিজ্ঞেস করে আমি কোথা থেকে এসেছি। আমার বাচ্চাদেরও একই প্রশ্ন শুনতে হয়। এখানে অন্তত আমাকে ঐ প্রশ্ন কেউ করেনা। এটা অনেকটা যেন এই বিশ্বে নিজের একটা জায়গা খুঁজে পাওয়া যেখানে তোমাকে প্রতিনিয়ত তোমার অস্তিত্বের ব্যাখ্যা দিতে হবেনা।"

ইঞ্জিনিয়ার ইয়ারিসোকে নিয়ে কথা হয় ডা: হোদানের সাথে।- কীভাবে এই অসামান্য রাজনীতিক সোমালিয়ার সমাজের বিষাক্ত বিভক্তির ভেতরে থেকেও সাফল্যের সাথে তার কাজ সারতেন।

ডা হোদানের সাথে কথা শেষ করার কিছুক্ষণ পর মোবাইল ফোনে ছোটো একটি টেক্সট বার্তা পেলাম - "তিনি মারা গেছেন।"

আহত ইঞ্জিনিয়ার ইয়ারিসো বৃহস্পতিবার কাতারে মারা গেছেন।

প্রচণ্ড একজন আশাবাদী মানুষ ছিলেন তিনি। সুযোগ পেলেই মোগাদিসু নিয়ে কথা বলছেন। গৃহযুদ্ধের আগে ষাট এবং সত্তরে দশকে কী চমৎকার ছিল তার এ শহর। তিনি বলতেন আফ্রিকান রিভিয়েরার মধ্যমনি ছিল সাগর পাড়ের মোগাদিসু। আশা করতেন, একদিন আবার সেই পুরনো গৌরব, কৌলীন্য ফিরে পাবে তার শহর।

শেষবার ইঞ্জিনিয়ার ইয়ারিসোর সাথে আমার দেখা হয় মোগাদিসুর লিডো বীচের একটি রেস্তোরাঁর বারান্দায়। আমাদের সামনে ছিল এক দঙ্গল প্রবাসী সোমালিয় তরুণ যারা ছুটি কাটোতে এসেছে। উচ্চারণ শুনেই বোঝা যাচ্ছিলো তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাসিন্দা।

আমার মনে আছে গলদা চিংড়ি খেতে খেতে ঐ ছেলেগুলোর দিকে তাকিয়ে গর্বের হাসি হাসছিলেন ইয়ারিসো। হয়তো স্বপ্ন দেখছিলেন এই ছেলেরা ফিরে এসে একদিন দেশের হাল বদলে দেব।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর: