ইতিহাসের সাক্ষী: ইরাকের সাদ্দাম হোসেন যখন কুয়েত দখল করে নিয়েছিল

ছবির উৎস, Getty Images
১৯৯০ সালের ২ আগস্ট। ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন প্রতিবেশি কুয়েতে হাজার হাজার সৈন্য পাঠিয়ে দেশটি দখল করে নিলেন।
কুয়েতের মানুষ হতভম্ব। চারিদিকে বিভ্রান্তি। কুয়েতের সরকারি রেডিও তখনও চালু। সেখান থেকে বাইরের দুনিয়ার সাহায্য চেয়ে আবেদন জানানো হলো।
সামি আল-আলাউইর বয়স তখন মাত্র বিশ বছর। তার বাবা তাকে ঘুম থেকে ডেকে তুললেন।
"আমার বাবা আমাকে যা বললেন, তা শুনে আমি অবাক। তিনি আমাকে বললেন, সামি, ওঠো, তাড়াতাড়ি প্রস্তুত হও। স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যোগ দাও। সেনা সদর দফতরে যাও, দেখো কীভাবে সাহায্য করতে পারো।"
সামি তাড়াতাড়ি বাইরে এসে তার গাড়িতে উঠলেন। কিন্তু কুয়েত সিটির যে অংশে তিনি থাকেন, সেটা ততক্ষণে ইরাকি বাহিনীর দখলে চলে গেছে।
"পুরোপুরি যুদ্ধসাজে সজ্জিত সৈন্যরা ততক্ষণে রাস্তা দখল করে নিয়েছে। আমি ভেবেছিলাম এরা হয়তো কুয়েতি সেনা। একজন সৈন্য আমার দিকে বন্দুক তাক করলো। তখন আমি গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলাম। সৈন্যটি আমার গালে একটা চড় মারলো।"

ছবির উৎস, Getty Images
"আমাকে সে বলছিল, তুমি কি আমাকে গাড়ি চাপা দিয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা করছো? আমি বললাম, ভাই, আমি মাত্র ঘুম থেকে উঠেছি। কী হচ্ছে দেশে?"
"আসলে ও ছিল একজন ইরাকি সৈন্য। সে বুঝতে পারলো, আমি আসলে নার্ভাস। আমাকে সে বললো, তোমার গাড়িতে উঠে এক্ষুনি এখান থেকে ভাগো। নইলে আমি তোমাকে হত্যা করবো।"
ইরাক এবং কুয়েতের মধ্যে বহু বছর ধরে সীমান্ত নিয়ে বিরোধ চলছিল। দুটি দেশই তেল রফতানির ওপর নির্ভরশীল। ইরাকের অভিযোগ ছিল, কুয়েত অতিরিক্ত তেল উৎপাদন করে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে ধস নামাচ্ছে।
দুদেশের সম্পর্কে আরও সমস্যা তৈরি করে ১৪০০ কোটি ডলারের এক ঋণ। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সময় ইরাক এই অর্থ ধার করেছিল কুয়েতের কাছ থেকে।
কিন্তু বহু বছরের যুদ্ধে বিপর্যস্ত ইরাক এই ঋণ শোধ করতে পারছিল না। সাদ্দাম হোসেন চাইছিলেন, কুয়েত এই ঋণ মওকুফ করুক। কিন্তু কুয়েত তাতে অস্বীকৃতি জানায়। এরপর পরিস্থিতি মারাত্মক দিকে মোড় নিল।
এক রাতের মধ্যেই ইরাকি সৈন্যরা কুয়েতে অভিযান চালিয়ে সরকারকে উৎখাত করলো। ইরাকি সেনাবাহিনীর হাজার হাজার সৈন্য ট্যাংক নিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে রাজধানী কুয়েত সিটিতে পৌঁছে গেল।
তখন কুয়েতের মোট জনসংখ্যা মাত্র ২১ লাখ। বেশিরভাগ বিদেশি সাথে সাথেই কুয়েত ছেড়ে চলে গেলেন। আর কুয়েতের নাগরিকদেরও দুই-তৃতীয়াংশ হয় দেশ ছেড়ে পালালেন, বা বিদেশে আটকে পড়লেন।
যারা কুয়েতে রয়ে গেলেন, তারা নানাভাবে ইরাকি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করলেন।

ছবির উৎস, Getty Images
সামি এবং তার বাবা বেসামরিক মানুষ থেকে রাতারাতি হয়ে গেলেন প্রতিরোধ যোদ্ধা। তারা অস্ত্র এবং গোলাবারুদ সংগ্রহ শুরু করলেন, যোগ দিলেন প্রতিরোধ বাহিনীতে।
"আগষ্ট মাসে আমাদের জন্য সবচেয়ে জরুরী ছিল নিজেদের জন্য একটা জায়গা খুঁজে বের করা - যেখান থেকে আমরা আমাদের কাজ চালিয়ে যেতে পারি, আমাদের অস্ত্রশস্ত্র লুকিয়ে রাখতে পারি। ইরাকিরা তখনো আমাদের দেশ ঠিকমত জানে না, চেনে না। অন্তত আমাদের মতো অত ভালোভাবে নয়। কাজেই আমরা যত পারি অস্ত্র সংগ্রহ করলাম, তারপর আত্মগোপনে চলে গেলাম।"
ইরাকিরা কুয়েতে তাদের নিয়ন্ত্রণ যত কঠোর করে আনতে থাকলো, প্রতিরোধ যুদ্ধ তত বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠলো।
অক্টোবর মাসে সামি এবং তার চাচা ধরা পড়লেন। তাদেরকে ইরাকের বসরা নগরীর এক জেলখানায় নিয়ে যাওয়া হলো। পথে তাদের এক জায়গায় থামানো হলো।
আরও পড়ুন:
"আমাদের পিঠমোড়া করে হ্যান্ডকাফ পরানো হলো। তারপর বাস থেকে নামিয়ে লাইন বেঁধে দাঁড় করানো হলো। সৈন্যরা তাদের বন্দুকে গুলি ভরছিল, আমরা তার শব্দ পাচ্ছিলাম। এরপর গুলি চালানোর শব্দ পেলাম। তখন আমার মনে হলো, আমার সামনের জনকে বোধহয় গুলি করা হয়েছে, এরপর হয়তো আমার পালা।"
"আমি অপেক্ষা করছিলাম কখন একটা বুলেট এসে আমাকে আঘাত করবে, তারপর আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়বো। কিন্তু কয়েক মিনিট পরেই শুনলাম ইরাকিরা হাসাহাসি করছে। ওরা আসলে ভান করছিল যে আমাদের ওরা গুলি করে মারছে। কিন্তু এরপর ওরা আমাদের আবার বাসে তুললো।"
১৯৯০ সালে ডিসেম্বরের শেষে সামিকে মুক্তি দেয়া হলো। কিন্তু ছাড়া পেয়েই আবার কুয়েতে ফিরে প্রতিরোধ সংগ্রামে যোগ দিলেন তিনি। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইরাক বিরোধী এক সামরিক জোটে যোগ দিয়েছে। তাদের লক্ষ্য ইরাকের দখল থেকে কুয়েতকে মুক্ত করা।

ছবির উৎস, Getty Images
১৭ জানুয়ারি, ১৯৯১। শুরু হলো 'অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম।'
আন্তর্জাতিক জোট বাহিনী কুয়েতে ঢুকলো ২৪শে ফেব্রুয়ারি। তখন ভোর পাঁচটা, চারিদিকে গোলাগুলি, বিস্ফোরণের শব্দ।
সামির মনে হলো কুয়েত এবার মুক্ত হতে চলেছে, নিজের দেশ এবার তারা ফিরে পাবেন।
"এক একটা বিস্ফোরণের শব্দ শুনে আমরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরছিলাম খুশিতে। আমাদের লক্ষ্য সফল হতে চলেছে।"
কিন্তু না, এরমধ্যেই ঘটে গেল অন্যরকম এক ঘটনা, যা হিসেবের মধ্যে ছিল না।
সামির বাবা হাদি আল-আলাউই একটি প্রতিরোধ সেলের নেতৃত্বে ছিলেন। এর নাম ছিল 'মাসিলা সেল।'
কুয়েত সিটির দক্ষিণে এক বাড়িতে ছিল এই সেলটির ঘাঁটি। আন্তর্জাতিক জোট বাহিনী তখনো কুয়েত সিটিতে পৌঁছেনি। ইরাকি বাহিনী তখন এ্ই জায়গায় এসে বাড়ি বাড়ি তল্লাশি শুরু করলো।
বাড়ির ভেতরে তখন সামি এবং তার বাবা। তাদের সঙ্গে ছিল আরও ১৭ জন তরুণ। ইরাকি সৈন্যরা যখন দরোজায়, তখন তাদের বাধা দিতে এক তরুণ গুলি ছুঁড়লো। ইরাকি সৈন্যরা পাল্টা গুলি ছুঁড়লো।
কিন্তু দুপক্ষের এই গোলাগুলি ব্যাপক লড়াইয়ে রূপ নিল। ইরাকীরা আরও সৈন্য নিয়ে আসলো। ট্যাংক নিয়ে এলো।
"খুবই ভীতিকর অবস্থা। অস্ত্রশস্ত্রের দিক দিয়ে ওরা সুবিধেজনক অবস্থায় ছিল। যখন ওরা ট্যাংক নিয়ে আসলো, পরিস্থিতি বদলে গেল। তখন তখন আমার মনে হলো, এর মোকাবেলা করা আমাদের কাজ নয়।"
সময় যত গড়াতে লাগলো, কুয়েতি প্রতিরোধ বাহিনীর বিপরীতে ইরাকি সেনাদের সংখ্যা বাড়তে থাকলো। সামির বাবা, যিনি প্রতিরোধ বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, তিনি বুঝতে পারলেন, তাদের পরাজয় এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। তাদের সবাই হয়তো ধরা পড়বেন, তাদেরকে হত্যা করা হবে। সামির জন্য একটি ছিল এক বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা।
"আমার বাবা আমার খুব প্রিয় ছিলেন। আমি তাকে শ্রদ্ধা করতাম। কাজেই তিনি যখন বুঝতে পারলেন যে এটাই শেষ, তখন তিনি একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিলেন।"

ছবির উৎস, Getty Images
"আমার বাবা যেন বলছেন, এখানে আমিই সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ এবং সবকিছুর জন্য আমিই দায়ী। কাজেই আমিই আগে মরবো।"
"তিনি বাড়ির ছাদে উঠলেন। একটা গোলা এসে আঘাত করলো। আমি বাবাকে ডাকলাম। বাবা উত্তর দিলেন, আমি ঠিক আছি। এবার দ্বিতীয় একটি গোলা এসে পড়লো। আমি আবার বাবাকে ডাকলাম। কিন্তু এবার তিনি কোন উত্তর দিলেন না। উপরে গিয়ে দেখার সাহসও আমার ছিল না। পুরো বাড়ি তখন অরক্ষিত। আমার মনে হলো বাবা আর নেই।"
"ঠিক ঐ মূহুর্তে আমার অনুভূতি, আমার সাহসিকতা, আমার সবকিছু যেন উবে গেল। আমি তখন একটা জিনিসই চাইছিলাম। আমি ঘর থেকে বেরুতে চাইছিলাম।"
"আমি জীবিত অবস্থায় এখান থেকে বেরুতে চাই। আমি জামাল আর তালালকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসলাম। আমরা পাশের বাড়িতে গিয়ে ঢুকলাম।"
ইরাকী বাহিনী এই বাড়িতেও ঢুকবে, এটা জেনে সামি এবং তার এক বন্ধু একটা ছোট কুঠুরিতে গিয়ে লুকিয়ে থাকলেন।
"সেখানে আমরা কিছু কম্বল এবং শাল পেলাম। বেশ ঠান্ডা ছিল তখন। আমরা সেগুলো গায়ে জড়ালাম। আমি এবং জামাল সন্ধ্যা ছটা পর্যন্ত সেখানেই ছিলাম। এরপর আমরা শুনলাম ইরাকীরা সেখানে আসছে। একজন ইরাকী সেনা বললো, আমি এখানে একটা ঘর দেখতে পাচ্ছি। এটা দেখা দরকার"

ছবির উৎস, Getty Images
"এই সৈন্যটি এসে তার লাইটার জ্বালালো। আমাদের সেলটা ছিল দুই মিটার বাই দুই মিটার। ভেতরে কি আছে, সেটা তার না দেখতে পাওয়ার কথা নয়। আমার মনে হলো, সে নিশ্চয়ই আমাকে দেখতে পাচ্ছে। আমি কোরানের একটা আয়াত পড়তে শুরু করলাম মনে মনে।"
ইরাকি সেনাটি কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে তার সাথের অফিসারকে বললো, "মনে হয় এখানে কিছু নেই!"
"আমার মনে হচ্ছিল, লোকটা হয়তো ভালো লোক ছিল। আমাদের অনুকম্পা করছে।"
"কিন্তু একটু পরেই এই সৈন্য তার তার অফিসারকে বললো, এই বাড়িটাকে একটা গ্রেনেড ছুঁড়ে শত্রুমুক্ত করা দরকার। কিন্তু ঠিক তখন বাইরে থেকে একটা অফিসারের ডাক শোনা গেল। তখন ভেতরের অফিসারটা বললো, বাদ দাও, বাদ দাও।"
২৪ শে ফেব্রুয়ারি কুয়েত সিটির উপকন্ঠে সেই লড়াই চলেছিল দশ ঘন্টা ধরে।
সামির বাবা এবং ঐ প্রতিরোধ সেলের আরও দুজন লড়াইয়ে নিহত হয়। যে নয়জন ইরাকি সেনাদের হাতে ধরা পড়ে, তাদের মৃতদেহ কাছাকাছি ফেলে রাখা হয়।
সামি এবং অপর সাতজন বেঁচে যান।
"মঙ্গলবার সকালে আমাদের দেশ মুক্ত এবং স্বাধীন হলো। মানুষ খুশিতে উল্লাস করছিল। কুয়েত তার স্বাধীনতা ফিরে পেয়েছে।"
"কিন্তু যে মূহুর্তের জন্য আমি এতদিন অপেক্ষা করেছি, যখন সেই মূহুর্ত এলো, আমি সেটা উদযাপন করতে পারলাম না। আমি হাসপাতালগুলোর মর্গে মর্গে ঘুরছিলাম। আমার বন্ধুদের খুঁজছিলাম।"
"এখনো আমার নাকে ট্যাংকের, বারুদের গন্ধ পাই। আমি সেই ঘরটার গন্ধ পাই। যখন আমি একা থাকি, এই পুরো ঘটনার স্মৃতি ফিরে ফিরে আসে। এটা যেন একটা উল্কির মতো আঁকা হয়ে আছে আমার মনে।"
শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধে ইরাক পরাস্ত হয়েছিল। কুয়েত মুক্ত হয়েছিল ইরাকী দখলদারিত্ব থেকে।
তবে কুয়েত যতদিন ইরাকের দখলে ছিল, তখন এক হাজারের মতো কুয়েতি নাগরিক লড়াইয়ে নিহত হয়। ৬০০ জনের মতো গুম হয়। ইরাকেরও হাজার হাজার সৈন্য এই যুদ্ধে নিহত হয়।








