শিশুর ঘুমের সমস্যা যেভাবে কাটিয়ে উঠছেন ইংল্যান্ডের বাবা-মায়েরা

"তারা রাতে যেকোনো সময় ১০ থেকে ৪০ বারের মত জেগে উঠতো এবং আমি একেবারেই বাড়িয়ে বলছি না" বলছিলেন জ্যাকি উলস্টেনহোম। তিনি তার যমজ বাচ্চাদের নিয়ে যখন নির্ঘুম রাত কাটাতেন তখনকার কথা মনে করে বলছিলেন।
একজনের বয়স এখন চার বছর, যার ঘুমের সমস্যা ছিল। সেই সময়ে সন্ধ্যা এবং রাত ছিল তার জন্য রীতিমত ভীতিকর।
"তিন মাস বয়সে যখনে শিশুরা একটু একটু করে স্থির হতে থাকে, আমাদের অবস্থা দিনকে দিন হয়ে পড়ছিল আরো খারাপ, তারা একেবারেই ঘুমাতো না" জ্যাকি বিবিসি টু'র ভিক্টোরিয়া ডার্বিশায়ার প্রোগ্রামকে বলছিলেন।
"একজন আমার সাথে একঘরে, অন্য জন আমার স্বামী জুলিয়ানের সাথে আরেক ঘরে । আমরা দুইজনেই এই দুই বাচ্চাকে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করতাম"।
এটা স্বামী-স্ত্রী দুইজনকেই ঘুম থেকে বঞ্চিত করে তুলতো।
১২ মাস পর জ্যাকি তার নিজের কাজ গ্রাফিক্স ডিজাইনে ফেরত আসতে চাইলো কিন্তু এটা একেবারে পরিষ্কার হয়ে গেল যে সেটা করার আর কোন পথ নেই।
"আমার স্বামীর পক্ষে তার চাকরী ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছিল কারণ অবশ্যই সে অবসাদগ্রস্ত থাকতো"
অধ্যাপক হিদার এলপিক বলছিলেন " যখন ঘুমের প্রসঙ্গ আসে তখন বলা যায় যুক্তরাজ্য একটা গোপন পাবলিক হেলথ ক্রাইসিসের মধ্যবর্তী অবস্থানে আছে"।
"আরো বাচ্চারা আছে যারা ঘুমাতে পারে না এবং আমি মনি করি এটা এমন একটা বিষয় যে বাবা-মায়েরা এই বিষয়টা নিয়ে কথা বলতে চান না"।
"তারা মনে করে মানুষজন হয়ত ভাববে তারা বাচ্চাদের ঠিক মত দেখাশোনা করতে পারে না। তাই তারা কাউকে বলে না এবং কোন সাহায্য চায়না"।
আরো পড়ুন:

অধ্যাপক এলপিক শেফিল্ডে ৪০ টা পরিবারকে একত্রিত করে একটা পাইলট প্রকল্প চালু করতে সাহায্য করেন।
শেফিল্ডের চিলড্রেন হসপিটাল স্লিপ ক্লিনিক, ইংল্যান্ডের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা সংস্থা আর সাথে লোকাল কাউন্সিলের সাথে নিয়ে শুরু করা এই পদ্ধতির উদ্দেশ্য ছিল শিশুদের ঘুমের প্যাটার্ন উন্নতি ঘটানো।
এখন এটা গত এক বছরে শহরটির আটশো শিশুকে সাহায্য করেছে।
জ্যাকির বাচ্চাদের একই চিকিৎসা পদ্ধতি দেয়া হয় যদিও তাদের অবস্থা ছিল আরো খারাপ।
ক্লিনিকে পদ্ধতিটা শুরু হয় দীর্ঘ মেডিকেল হিস্ট্রি বর্ণনার মধ্যে দিয়ে। যেমন শিশুটির জন্ম থেকে নিয়ে তারা ঘুমানোর পরিবেশের খুঁটিনাটি সব বিষয় থাকে।
এই যমজ বাচ্চাদের জন্য এটা বোঝা খুব দরকার ছিল ইস্যুগুলো কোথা থেকে আসছে।
"তারা বারবার অসুস্থ হয়ে যেত এবং হাসপাতালে ভর্তি করতে হতো" জ্যাকি বলছিলেন "তাই তাদের প্রথম কয়েক বছর ছিল খুব কঠিন"।
নার্সরা পরিবারটির জন্য একটা কঠোর রুটিন তৈরি করে দিল যাতে করে ঠিক সেই সময়টাতে মেয়েরা ঘুমাতে যায়।
"ঘুমাতে যাওয়ার আগে আমরা নীচের তলার বাতি কম করে দিতাম। তারপর টিভি, রেডিও এবং সব ধরণের স্ক্রিন বন্ধ করে দিতাম। এরপর আমরা রঙ করা, ছবি আঁকা, খেলা তৈরি করা -যেকোনো কিছু যেটা চোখ এবং হাতের সমন্বয়ে করতে হয় সেসব করতাম" বলছিলেন জ্যাকি।
"তারপর আমরা উপরে যেতাম, গোশল করাতাম এবং সরাসরি বিছানায় যেতাম।"
"আমরা এটা একদম একই রুটিন প্রতিদিন অনুসরণ করতাম। এমনকি আমরা যখন তাদের শুভরাত্রি বলতাম একই শব্দ ব্যবহার করতাম ধারাবাহিকভাবে"।
বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

ভালো সম্পর্ক
ইংল্যান্ডের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবার তথ্য অনুযায়ী এই পদ্ধতি শেফিল্ডে শিশুদের আরো দুই ঘণ্টা ৪০ মিনিট ঘুম বাড়িয়ে দিয়েছে। আর আগে তারা ঘুমাতে যে দুই ঘণ্টা সময় লাগতো এখন সেটা ৩০ মিনিটে নেমে এসেছে।
বাবা-মা এবং যারা বাচ্চাদের যত্ন নিতেন তারা বলছেন তাদের জীবনমানের উন্নতি হয়েছে। এছাড়া তাদের বাচ্চাদের সাথে একটা ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।
শিশুদের ঘুমের সমস্যা থাকতে পারে । যেমন এটেনশন ডিফিসিট হাইপারএকটিভিটি ডিসঅর্ডার।
জেনি লুইস তার ছেলে নোয়া কে নিয়ে এই সমস্যায় পড়েছিলেন।
তিনি বলছিলেন " মধ্যরাতে আমার ছেলে হয় কলিং-বেল বাজাবে যাতে করে আমি জেগে উঠি। এতেও যদি কাজ না হয় তাহলে আমার বিছানার পাশে এসে জোরে চিৎকার করবে"।
জেনি বলছিলেন " সেই সময় আপনি জেগে উঠবেন এবং আমার মনে হয় আমি জানি না এটা কোন সময়? আমি জানি না এটা রাত না দিন এমনকি আমি এটাও মনে করতে পারি না যে আমি কোথায় আছি"।
নোয়ার অল্প বয়সে কিছু স্বাস্থ্যগত সমস্যা ছিল।

নোয়ার এখন বিছানায় যাওয়ার একটা রুটিন আছে। সে এই চিকিৎসার অংশ হিসেবে ঘুম গবেষণার মধ্যে ছিল, ডাক্তাররা তাকে পর্যবেক্ষণ করতো।
তার সমস্যার নাম প্যারাসোমনিয়া। এই অবস্থায় একজন ঘুম বিঘ্ন ঘটে যেটা ঘুমের মধ্যে হাটা, কথাবলা ইত্যাদি করতে পারে।
নোয়ার জন্য এর মানে হল সে যা কিছু করতো সব কিছু করতো ঘুমের মধ্যে।
তারা এখনো চিকিৎসা নিচ্ছেন কিন্তু পরিস্থিতি আগের চেয়ে ভালোর দিকে যাচ্ছে।
এদিকে জ্যাকির বাচ্চাদের ক্লিনিক থেকে বলা হয়েছে তারা একদম ভালো আছে এখন।
তিনি বলছিলেন "সেই সব রাতের কথা এখন আমি আর মনে করতে বা এনিয়ে আর কথা বলতে চাই না"।








