হোটেলে চুরি আর চেঁচামেচি করে ভারতীয় ট্যুরিস্টরা কি দুনিয়ায় দেশের নাম ডোবাচ্ছেন?

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
- Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি
দেশের গন্ডী ছাড়িয়ে ভারতের পর্যটকরা এখন ছড়িয়ে পড়ছেন আর্জেন্টিনা থেকে আর্মেনিয়া - দুনিয়ার সর্বত্র।
তাদের স্বচ্ছলতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাসপোর্টও এখন দুনিয়াভর চরকি কাটছে, কিন্তু এই পর্যটকরা বিশ্বে ভারতের বদনাম করছেন কি না - তা নিয়েই এখন ভারতের সোশ্যাল মিডিয়ায় তুলকালাম!
আর এই বিতর্কের মূলে আছে দুটো ঘটনা।
প্রথম ঘটনাটিতে ইন্দোনেশিয়ার বালিতে একটি হোটেলের ঘর থেকে শ্যাম্পু-সাবান, তোয়ালে, হেয়ার-ড্রায়ার, এমন কী রুমে সাজানো পেইন্টিং পর্যন্ত স্যুটকেসে ভরে নিয়ে যাওয়ার সময় একটি ভারতীয় পরিবার হোটেল কর্মীদের কাছে ধরা পড়ে যান।
তাদের জিনিসপত্র তল্লাসি আর বিব্রত পরিবারটির চরম লজ্জা আর অস্বস্তির মুহুর্ত গোটাটাই মোবাইল ফোনের ভিডিওতে ধরা পড়েছে।
আর সেই ভিডিওটি গত বাহাত্তর ঘন্টায় ভারতে ঝড়ের বেগে ছড়িয়ে পড়েছে।
আরো পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Swiss Tourism
দ্বিতীয় ঘটনাটিও সুইস আল্পসের শৈল শহর জিস্টাডে আর্ক-অন-সিয়েল নামে একটি হোটেলের।
সেই হোটেলে ভারতীয় অতিথিরা যাতে ব্রেকফাস্ট বুফে থেকে খাবার না সরান এবং হোটেলের করিডর ও ব্যালকনিতে প্রচন্ড চেঁচামেচি না করে অন্য অতিথিদের অসুবিধে না ঘটান, সেই মর্মে হোটেল কর্তৃপক্ষ একটি নোটিশ ঝুলিয়েছিলেন।
সেই নোটিশটি বিশিষ্ট ভারতীয় শিল্পপতি হর্ষ গোয়েঙ্কার চোখে পড়ার পর তিনি সেটির ছবি টুইট করেন এবং লেখেন সেটি দেখে তিনি কতটা ক্রুদ্ধ, অপমানিত বোধ করেছেন এবং কীভাবে তার প্রতিবাদ করতে চেয়েছেন।
"তবে পরক্ষণেই আমার মনে হল ট্যুরিস্ট হিসেবে আমরা সত্যিই তো খুব উগ্র, চিৎকারবাজ ('লাউড'), উদ্ধত ('রুড') এবং অন্যের সংস্কৃতির প্রতিও সংবেদনশীল নই।"
"আমাদের এই ছবিটা সত্যিই পাল্টানো দরকার", টুইট করেন মি গোয়েঙ্কা।
এই নিবন্ধে Xএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত X কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।
End of X post, 1
ভারত যখন বিশ্বে একটি আন্তর্জাতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে, তখন এই পর্যটকরাই যে দুনিয়ায় দেশের 'সেরা রাষ্ট্রদূত' সেটাও মনে করিয়ে দিয়েছেন তিনি।
এই দুটো ঘটনা সামনে আসার পর থেকেই ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টুইটারে ভারতীয় পর্যটকদের পক্ষে-বিপক্ষে চলছে ধুন্ধুমার তর্কবিতর্ক।
কেউ কেউ মেনে নিচ্ছেন, দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে গড়পড়তা ভারতীয় পর্যটকদের আচরণ সত্যিই লজ্জাজনক।
অনেকে আবার বলছেন, মাত্র কয়েকজনের স্বভাবের জন্য ঢালাওভাবে লক্ষ লক্ষ ভারতীয় ট্যুরিস্টকে দায়ী করা মোটেও ঠিক নয়।
বালির হোটেল থেকে জিনিসপত্র চুরির ঘটনাটির ভিডিও শেয়ার করে হেমন্ত নামে জনৈক টুইটার ব্যবহারকারী যেমন লিখেছেন, "ভারতের পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশে গিয়ে যারা সেখানে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছেন সরকারের উচিত তাদের পাসপোর্টই বাতিল করে দেওয়া!"
এই প্রস্তাবে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তাকেও ট্যাগ করেছেন তিনি পোস্টে।
এই নিবন্ধে Xএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত X কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।
End of X post, 2
ওই একই ভিডিও শেয়ার করে ভারতের জনপ্রিয় পলিটিক্যাল স্যাটায়ারিস্ট, 'দেশভক্ত' আকাশ ব্যানার্জি লিখেছেন, "আন্তর্জাতিক শক্তি হয়ে ওঠা মানে শুধু অর্থনীতির বহর বা পরমাণু বোমা নয়।"
"আমাদের মেনে নেওয়া উচিত কোথাও একটা সমস্যা নিশ্চয় আছে।"
হোটেল থেকে তোয়েল বা হেয়ার-ড্রায়ার চুরির প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও একজন লিখেছেন, "যখন একজন বিদেশি হোটেল ম্যানেজার আমাদের মনে করিয়ে দেন এখানে প্রশ্নটা পয়সার নয়, বরং সম্মানের - তখন একজন ভারতীয় হিসেবে আমার লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যায়।"
প্রসঙ্গত, বালির হোটেলের ভিডিওতে যখন তল্লাসির সময় ভারতীয় ওই পরিবারটির স্যুটকেস থেকে একে একে হোটেলের নানা জিনিসপত্র বেরোচ্ছিল, তখন তাদের বারবার বলতে শোনা যায়, "আমরা ওগুলোর দাম মিটিয়ে দেব।"
তার জবাবেই হোটেলের ম্যানেজার বলেছিলেন যে এখানে বিষয়টা তাদের সম্মানের - পয়সার নয়!

ছবির উৎস, Getty Images
ভারতের জনপ্রিয় টেলিভিশন হোস্ট ও অভিনেত্রী মিনি মাথুরও টুইট করেছেন, বিদেশের হোটেল থেকে এই ধরনের 'ক্যাজুয়াল স্টিলিং'-কে যারা কোনও অপরাধ বলেই মনে করেন না তারা দেশের কলঙ্ক।
ভিডিও-র একেবারে শেষ দিকে আরও দেখা যাচ্ছে পরিবারের একজন জ্যেষ্ঠ সদস্য হোটেল কর্মীদের একজনের কাঁধে হাত রেখে অন্য দিকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন - খুব সম্ভবত তাকে 'ম্যানেজ' করার চেষ্টায়।
মিনি মাথুর লিখেছেন, "আর ওই আঙ্কল একজন হোটেল কর্মীর পিঠে হাত রেখে যেভাবে সরিয়ে নিয়ে গেলেন - সেটা তো জাস্ট অসহ্য!"
বালির ঘটনায় ভারতীয় পরিবারটিকে 'ডিফেন্ড' করার মতো কন্ঠস্বর তেমন শোনা যাচ্ছে না।

ছবির উৎস, Getty Images
তবে সুইস আল্পসের হোটেল আর্ক-অন-সিয়েলের বিরুদ্ধে অনেক ভারতীয়ই মুখ খুলেছেন।
দিল্লির কাছে গুরগাঁওয়ের বাসিন্দা দেবযানী সিনহাকে একজন গ্লোবট্রটার পর্যটক বলেই বর্ণনা করা যায়।
সেই দেবযানী বিবিসিকে বলছিলেন, "এখানে শুধু ভারতীয়দের যেভাবে স্টিরিওটাইপিং করা হয়েছে তাতে আমার যেমন ভীষণ খারাপ লেগেছে, তেমনই প্রচন্ড অবাক হয়েছি।"
"কারণ ব্রেকফাস্ট বুফে থেকে একটা আপেল বা দুটো কলা নিয়ে যেতে আমি শুধু ভারতীয়দেরই নয়, বহু ইউরোপীয়ানকেও দেখেছি।"

ছবির উৎস, Getty Images
"অনেকে তো সার্ভিয়েটে মুড়ে মাফিন বা ক্রঁসোও নিয়ে যান, কেউ কিছু বলেও না!"
"আর চেঁচামেচির কথাই যদি ওঠে, হ্যাঁ আমরা ভারতীয়রা একটু জোরে কথা বলি ঠিকই।"
"কিন্তু চিৎকার বা হইচইয়ে চীনা, কোরিয়ান, স্প্যানিশ বা ইতালিয়ান ট্যুরিস্টরাও মোটেই কম যায় না - সুতরাং শুধু ভারতীয়দের দোষ দেওয়াটা মোটেই ঠিক না।"
ভারতে অনেক সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী সুইস আল্পসের ওই হোটেলটি বয়কট করারও ডাক দিয়েছেন।
তুমুল প্রতিবাদের মুখে হোটেল কর্তৃপক্ষ একটি বিবৃতি দিয়ে দু:খ প্রকাশও করেছে।

ছবির উৎস, Getty Images
ভারত থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটককে যারা বিদেশ ভ্রমণে ও লাক্সারি ক্রুজে পাঠান, এমনই একটি নামী ট্র্যাভেল সংস্থার কর্ণধার সুমিত ব্যানার্জি।
মি ব্যানার্জি বিবিসিকে বলছিলেন, "দুচারজন লোকের মিসঅ্যাডভেঞ্চারকে কিন্তু একটা গোটা জাতির ব্যবহার বা জাতীয় আচরণের টেমপ্লেট বলে ধরে নেওয়াটা ঠিক হবে না।"
"আর তা ছাড়া আন্তর্জাতিক হসপিটালিটি ইন্ডাস্ট্রিও যথেষ্ঠ ম্যাচিওরড, যাতে তারা প্রতিটা আলাদা ঘটনাকে তার মেরিটের ভিত্তিতেই ডিল করতে পারে।"
"আমি যেটা বলতে চাইছি তা হল, ভারতের বহির্মুখী (আউটবাউন্ড) ট্র্যাভেল ইন্ডাস্ট্রি কিন্তু এমনি এমনি বিশ্বে সবচেয়ে দ্রুত বিকাশশীল (ফাস্টেস্ট গ্রোয়িং) বাজারের তকমা পায়নি।"

ছবির উৎস, Sumit Banerjee/Facebook
"আর বিদেশের মাটিতে 'ডু'জ আর ডোন্ট'জ', অর্থাৎ কোনটা করণীয় এবং কোনটা করা উচিত নয়, ভারতীয় পর্যটকদের সে ব্যাপারে সেন্সিটাইজ করার জন্য আমাদের নিরন্তর চেষ্টাও অব্যাহত আছে", বলছিলেন সুমিত ব্যানার্জি।
বালি বা সুইস আল্পসে যে ভারতীয় পর্যটকদের জন্য বিদেশে ভারতের বদনাম হয়েছে তারা হয়তো সত্যিই সংখ্যায় খুব বেশি নন।
কিন্তু দেশের সম্মান বজায় রেখে বিদেশে ঘুরে বেড়াতে হলে ভারতীয়দের কিছু কিছু অভ্যাস যে এখুনি পাল্টাতে হবে, সে বিষয়ে কিন্তু অনেকেই একমত দেখা যাচ্ছে।








