বাংলাদেশে কী কারণে গণপিটুনিতে হতাহতের ঘটনাগুলো ঘটছে

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, সানজানা চৌধুরী
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
বাংলাদেশের ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে গতকাল তিনজন নিহত আর অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন। হতাহতদের মধ্যে চারজনই নারী। আজকেও নওগাঁয় ছেলেধরা সন্দেহে ছয়জনকে গণপিটুনি দেয় উত্তেজিত জনতা।
তাদেরকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
গত কয়েকদিনে দেশটিতে ছেলেধরা সন্দেহে এমন বেশ কয়েকটি গণপিটুনির খবর সংবাদের শিরোনামে উঠে আসে।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, যারা নিহত হয়েছেন, তাদের কেউ কেউ ওই এলাকায় অনেক দিন ধরে বসবাস করতেন।
কয়েকজন মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন। কিন্তু অভিভাবকদের সন্দেহ হওয়ায়, তাদেরও বেধড়ক পেটানো হয় বলে জানিয়েছে স্থানীয় পুলিশ।
এমনকি গতকাল এক নারী তার বাচ্চার ভর্তির তথ্য জানতে স্কুলে এসে ছেলেধরা সন্দেহে জনতার পিটুনিতে নিহত হন।
কিন্তু হঠাৎ করে দেশব্যাপী এই গণপিটুনির ঘটনা কেন ঘটছে। মানুষের এতো অসন্তোষের কারণ কি?

ছবির উৎস, Getty Images
মব সাইকোলজি
মনোরোগবিদ মেহতাব খানম এই গণপিটুনির মানসিক প্রবণতাকে "মব সাইকোলজি" হিসেবে উল্লেখ করেন।
তার মতে, যখন একটি সমাজে নির্দিষ্ট কোন বিষয় নিয়ে আতঙ্ক বা নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয় তখন তারা এক ধরণের মানসিক অবসাদে ভোগে।
সেই থেকেই মানুষের মধ্যে এ ধরণের সহিংসতা দেখা দেয়।
মিজ খানম বলেন, "মানুষ ইদানীং ছেলেধরার অনেক খবর পড়ছে, দেখছে। তো এই বিষয়টা তার মধ্যে একধরণের নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে। এ ব্যাপারে যখন সে কোন সহায়তা পাচ্ছেনা তখন তার মধ্যে মানসিক অবসাদ তৈরি হয়। তখন মানুষ পেটাতে দেখলে সে তার ওই বেসিক ধারণা থেকে ক্রোধ বা রাগ ঝাড়তে নিজেও সহিংস হয়ে ওঠে।"
মব সাইকোলজির বৈশিষ্ট্য হল, যারা গণপিটুনি দেয়, তাদের উচিত অনুচিত বোঝার মতো বিবেক কাজ করেনা। কেউ সত্যতা যাচাই-এর চেষ্টা করেনা।
তারা জানতেও চায়না কি কারণে মারামারি হচ্ছে। তারা তাৎক্ষণিক সেখানে অংশ নিয়ে তাদের ক্রোধের বহি:প্রকাশ ঘটায়।
আরও পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Getty Images
বিচারহীনতা
অপরাধ বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এই গণপিটুনির পরিস্থিতিকে তিনটি উপাদানে ব্যাখ্যা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের শিক্ষক খন্দকার ফারহানা রহমান।
সেগুলো হল: পুলিশ, আদালত এবং কারাগার।
ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেমের এই তিনটি উপাদান সমাজে অনুপস্থিতিকে এমন সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মিজ রহমান বলেন, "বাংলাদেশে কয়েক বছর আগেও ডাকাত সন্দেহে অনেক মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলার ঘটনা ঘটেছে। কারণ দেশের বিচার ব্যবস্থার ওপরে মানুষের আস্থা নেই। তারা মনে করে এই লোকটাকে ছেড়ে দিলে পরে তাকে আর আইনের আওতায় এসে সাজা দেয়া সম্ভব হবেনা। এজন্য তারা আইন হাতে তুলে নিচ্ছে।"
"দেখা গেছে যে পুলিশ অপরাধীদের আটক করলেও আদালত তাদের খালাস দিয়ে দিচ্ছে বা জামিন মঞ্জুর করছে। আবার আদালত তাদের দোষী সাব্যস্ত করতে পারলেও পুলিশ তাদের আদালতের সামনে আনতে পারছেনা।"
এর পেছনে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য, মানসিক অস্থিরতা এবং মাদকাসক্তিসহ নানা কারণ জড়িত বলে তিনি উল্লেখ করেন।
"যখন কোন দেশ ট্রান্সফর্মেশনের দিকে যায়, অর্থাৎ বিশ্বায়ন, নগরায়ন, শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত উন্নয়নের দিকে ধাবিত হয়, তখন এই পরিবর্তনের সাথে নৈতিক মূল্যবোধগুলোর দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য এবং বিচ্ছিন্নতা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। এখন আর পারিবারিক বন্ধন আগের মতো নেই।"
"এজন্য তার যে মোটিভেশন দরকার সেটা কোথাও সে পাচ্ছেনা। বিকল্প না থাকায় পরিস্থিতি সমাজের প্রতিটি শ্রেণীর মানুষ হতাশায় ভুগছে, অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। যার কারণে ঘটছে একের পর এক সহিংসতার ঘটনা।"
বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

সহনশীলতার সংস্কৃতি নেই
চট্টগ্রাম বিশ্ব সমাজ বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. ফরিদ উদ্দিন আহমেদের মতে, পরিবেশ, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
বিবিসি বাংলাকে তিনি জানান, "আমরা এখন খুব অস্থির সময়ের মধ্যে বাস করছি। বেকারত্ব, সুস্থ বিনোদনের অভাব, সহনশীলতার অভাব মানুষকে অস্থির করে তুলছে। আর এ কারণেই গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এই অসহনশীলতা মানুষকে নানা অবক্ষয়ের দিকে ধাবিত করে। তখনই মানুষ অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে।"
এক্ষেত্রে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজন বলে মনে করেন মিস্টার আহমেদ।
তার মতে, শুধুমাত্র আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করলেই পরিস্থিতি বদলাবেনা। এজন্য প্রয়োজন সামাজিক অগ্রগতির জায়গাগুলো সুসংগঠিত করা।
যেন সমাজের প্রতিটি স্তরে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্মান ও সহনশীলতার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত করা যায়।

ছবির উৎস, Getty Images
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপর হওয়া প্রয়োজন
বর্তমানে ছেলেধরার যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং এর জেরে একের পর এক গণপিটুনির ঘটনাকে উদ্বেগজনক বলে আখ্যা দিয়েছেন সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ নুরুল হুদা,
"এটা সত্যি যে ছেলেধরা বিষয়টি মানুষের মধ্যে একটি আতঙ্কের সৃষ্টি করে। ছেলে মেয়ে হারিয়ে গেলে একটি পরিবারের ওপর দিয়ে কি ঝড় বয়ে যায় সেটা শুধু ভুক্তভোগীরাই বোঝে। সে কারণেই হয়তো লোকজনের বেপরোয়া হয়ে পড়েছে। এখন এটা গুজব নাকি সত্যি সেটা যাচাই করবে আদালত।"
"তাই বলে আইন তো নিজের হাতে নেয়া যাবে না। আতঙ্ক তৈরি হলে আইনের দ্বারস্থ হতে পারে। কিন্তু শুধুমাত্র সন্দেহের বশবর্তী হয়ে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিজেদের হাতে তুলে নেয়া কোন সময় সমর্থনযোগ্য হবেনা।"
এমন অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও তৎপর হয়ে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
এজন্য গোয়েন্দা ইউনিটের আরও সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
"পুলিশ বাহিনীর কাজ হবে, এ ধরণের ঘটনা প্রতিরোধে, এলাকা ভিত্তিতে তৎপর হয়ে কাজ করা, খোঁজখবর রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া।"
"এজন্য ক্রিমিনাল ইন্টেলিজেন্সকে আরও কঠোর হতে হবে। কোথায় এ ধরণের ঘটনা হতে পারে বা হচ্ছে, কোথায় এ ধরণের অপরাধ প্রবণতা আছে, সেটাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।"

ছবির উৎস, Getty Images
কিছুদিন আগে ভারতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজবের কারণে বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
এরপর সরকারি বেসরকারিভাবে অনেক উদ্যোগ নেয়া হয়। সেইসঙ্গে সামাজিক মাধ্যমগুলো গুজব ঠেকাতে নানা ব্যবস্থা নেয়।
এ ব্যাপারে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের ওপরেও জোর দেন তিনি।
"উন্মত্ত জনতা যখন পিটিয়ে কাউকে মেরে ফেলে তখন সেই ঘটনার সাক্ষী হিসেবে কিন্তু কাউকে পাওয়া যায়না। ফলে এক্ষেত্রে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হাতে নেয়াটাই জরুরি। আর সামাজিক সচেতনতা বিস্তার তারই একটা অংশ। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়ার একটা অংশ হিসেবে এই বিষয়টিও আসবে।"
যেহেতু বাংলাদেশেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যাপক বিস্তার রয়েছে, সেক্ষেত্রে এগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতিটা মানুষের আরও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
"হঠাৎ একটা পোস্ট দেখেই উত্তেজনা ছড়িয়ে দেয়া অযৌক্তিক। এসব তথ্য দেয়ার আগে, সেটার সত্যতা যাচাই বাছাই করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভাল খারাপ দুটাই আছে। তাই এটাকে হুট করে বন্ধ করে দেয়াও সম্ভব না। এক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সচেতনতায় কাজ করতে পারে।"








