বাংলাদেশের সাথে ম্যাচটি কীভাবে দেখছেন ভারতীয়রা?

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
- Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি
বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পারফরমেন্সের নিরিখে তাদেরকে ভারত যে ইদানীং যথেষ্ট সমীহের চোখে দেখতে শুরু করেছে তাতে কোনও সংশয় নেই।
তবে ভারতের বহু ক্রিকেট-পন্ডিত বাংলাদেশের প্রশংসায় মুখর হলেও এই ম্যাচকে অনেক ভারতীয় সমর্থকই ঠিক এক যুগ আগে ২০০৭ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের কাছে অপ্রত্যাশিত হারের বদলা নেওয়ার আর একটি সুযোগ হিসেবেই দেখছেন।
সোশ্যাল মিডিয়াতে দুদেশের সমর্থকদের তিক্ত বাদানুবাদ এবং আইসিসি ও ভারতীয় বোর্ডের কথিত ষড়যন্ত্র ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশীদের বহুদিনের প্রতিবাদও এই ম্যাচের আবহে একটা আলাদা মাত্রা যোগ করেছে।
এজবাস্টনে মঙ্গলবারের এই ম্যাচকে ঘিরে ভারতীয়দের দৃষ্টিভঙ্গীটা ঠিক কেমন, সরেজমিনে তারই খোঁজখবর নিচ্ছিলাম দিল্লিতে।

ছবির উৎস, Getty Images
গত বছরখানেকের মধ্যে বাংলাদেশের কাছে দু-দুটো টুর্নামেন্টের ফাইনালে প্রায় হারতে হারতে জিতেছে ভারত - একটা শ্রীলঙ্কায় নিদাহাস ট্রফি, অন্যটা আমিরাতে এশিয়া কাপ।
আর বিশ্বকাপে ভারত-বাংলাদেশ মুখোমুখি হওয়া মানেই টানটান উত্তেজনা, অঘটনের আশঙ্কা এবং নানা ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব, ম্যাচের পরও যার রেশ থিতোয় না।
দিল্লিতে ক্রিকেট অনুরাগী সম্রুদ্ধা বলছিলেন, "বিশ্বকাপে দুদেশের যে তিনবার দেখা হয়েছে তাতে ভারত দুবার আর বাংলাদেশ একবার জিতেছে।"
"আমার কেন জানি না মনে হচ্ছে কাল এই স্কোরলাইনটা টাই করার চমৎকার সুযোগ বাংলাদেশের সামনে।"

ছবির উৎস, বিবিসি বাংলা
চলতি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের খেলার উচ্ছ্বসিত তারিফ করেছেন ভি ভি এস লক্ষ্মণ, হর্ষ ভোগলে, সঞ্জয় মঞ্জরেকরের মতো ভারতের সাবেক ক্রিকেটার ও ভাষ্যকাররা।
দুর্দান্ত অলরাউন্ড পারফরমেন্সের জন্য সাকিব আল-হাসানকে প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছেন জাতীয় দলের সাবেক তারকা মনোজ তিওয়ারি।
বরোদার ক্রীড়া সাংবাদিক শামিনা শেখ কিন্তু মনে করছেন, "এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ বড় বড় স্কোর করতে পেরেছে শুকনো পিচের সুবিধে পেয়েছে বলেই।"
তার ধারণা, "ভারতের মতো বৃষ্টিভেজা পিচে খেলতে হলে তাদেরও দুর্বলতা ফাঁস হয়ে যেত।"

ছবির উৎস, মনোজ তিওয়ারি/টুইটার
তবে সার্বিকভাবে ভারত এখন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে অনেক গুরুত্ব দিতে বাধ্য হচ্ছে বলেই উপলব্ধি দিল্লিতে নিযুক্ত ঢাকার ক্রিকেট-উৎসাহী রাষ্ট্রদূত সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলির।
তিনি বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "ক্রিকেট মাঠে যদি বলেন, তাহলে আমি অবশ্যই বলব ভারতের দৃষ্টিভঙ্গীতে অবশ্যই অনেক ফারাক এসেছে। তারা এখন আমাদের অনেক বেশি সমীহ করে খেলে।"
"আগে হয়তো বাংলাদেশকে তাদের কিছুটা হালকাভাবে নেওয়ার অবকাশ ছিল, কিন্তু এখন আর সেটা নেওয়ার কোনও সুযোগ নেই।"
"তা ছাড়া গত বেশ কয়েক বছর হল বাংলাদেশ বিশ্বকাপেও বেশ ভালো খেলছে।"
"আমরা প্রথম ব্রেকথ্রু পেয়েছিলাম ২০০৭-র বিশ্বকাপে, যখন ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে আমরা ভারতকে হারাই।"

ছবির উৎস, Getty Images
"তারপর থেকে প্রতিবারই আমরা অনেকগুলো বড় দলকে বিশ্বকাপে হারিয়েছি।"
"এগুলোকে কেউ কেউ হয়তো অঘটন বলে বর্ণনা করবেন, কিন্তু আমাদের কাছে এটা বাংলাদেশ দলের ধারাবাহিক উন্নতিরই প্রতিফলন", বলছিলেন হাই কমিশনার আলি।
এটা ঠিকই যে বড় দলগুলোকে বাংলাদেশের হারানো অঘটন থেকে প্রায় রুটিনে পরিণত হয়েছে।
তবে ভারতের বিরুদ্ধে কোনও হার কিন্তু বাংলাদেশ সহজে মানতে পারে না বলেই বিশ্বাস উইজডেন ইন্ডিয়ার সাবেক সম্পাদক সাম্য দাশগুপ্তর।
বেশ কিছুকাল আগেই বিবিসিকে তিনি বলেছিলেন, "বাংলাদেশে গেলে সব সময় অসম্ভব ভালবাসা পাই।"

ছবির উৎস, Getty Images
"কিন্তু এটাও ঠিক তাদের মধ্যে একটা ভিক্টিমহুড কাজ করে - অর্থাৎ আমরা 'বঞ্চিত বা নির্যাতিত' এটা দেখানোর চেষ্টাও থাকে।"
"ঢাকায় ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ হলে ষাট থেকে সত্তরভাগ লোক যে পাকিস্তানকে সমর্থন করেন তাতেও কোনও ভুল নেই।"
"এর কারণ আমি সঠিক জানি না - হতে পারে ধর্মীয়, হতে পারে বাংলাদেশে অনেকে মনে করেন একাত্তরের পর ভারত সেভাবে তাদের আর সাহায্য করেনি - কিংবা হতে পারে ভারতের বড় ভাইসুলভ খবরদারিকে তারা পছন্দ করেন না।"
"গত বিশ্বকাপের কথাই যদি ধরি, রোহিত শর্মাকে আউট দিলেই সেই ম্যাচে ভারত হেরে যেত তা মোটেই নয় - বাংলাদেশই হয়তো ঠিক যে ওটা নো-বল ডাকা উচিত হয়নি ... কিন্তু সব মিলিয়ে ব্যাপারটা বেশ জটিল আকার নিয়েছে তাতে সন্দেহ নেই।"
আরো পড়ুন:

ছবির উৎস, Getty Images
ভারত-বাংলাদেশ ক্রিকেটের ক্ষেত্রে এই কথাগুলো আজও সমান প্রাসঙ্গিক বলেই দাবি মি দাশগুপ্তর।
অন্যদিকে হাই কমিশনার এস এম আলির ধারণা, এই ক্রিকেট দ্বন্দ্বের তিক্ত ছায়াই সোশ্যাল মিডিয়াতে পড়ছে।
তার কথায়, "সব ধরনের মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়াতেই নানা ধরনের খবর রটে, আর বাংলাদেশেও অবশ্যই তার একটা প্রতিফলন ঘটে।"
"কাজেই যতবারই আইসিসি-র কোনও ভূমিকা বিতর্কিত বলে মানুষের মনে হবে কিংবা কোনও খেলা পাতানো বলে দর্শকের মনে হবে তারা সোশ্যাল মিডিয়াতে সেটা পোস্ট করবেনই। আমি-আপনি সেটা আটকাতে পারব না।"

ছবির উৎস, Getty Images
"কিন্তু আজকের যুগে সোশ্যাল মিডিয়া অত্যন্ত শক্তিশালী একটি মাধ্যম, সেটাকে উপেক্ষা করাও কঠিন।"
"তবে আপনি সেগুলোকে সিরিয়াসলি নেবেন কি নেবেন না, তা বলা মুশকিল!"
তবে দুদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে এই ক্রিকেট-বৈরিতার কোনও ছাপ পড়বে না বলেই বিশ্বাস রাষ্ট্রদূত এস এম আলির, যেমনটা পড়েছে ভারত ও পাকিস্তানের ক্ষেত্রে।
কূটনৈতিক তিক্ততার ছাপ না-থাক, ভারত-বাংলাদেশ ক্রিকেট যুদ্ধে কিন্তু বিশুদ্ধ খেলোয়াড়ি রেষারেষির কোনও কমতি নেই।

ছবির উৎস, Getty Images
শামিনা শেখের যেমন বলতে দ্বিধা নেই, "বিশ্বকাপে ভারতীয়রা যে কোনও ভাবে বাংলাদেশ ম্যাচটা জিততে চায় বারো বছর আগের এক লজ্জাজনক হারের বদলা নিতেই।"
"পাশাপাশি এই ম্যাচে নক-আউট পর্বের আগে ভারতের ব্যাটিং প্র্যাকটিসটাও সেরে রাখা জরুরি।"
ফলে সমীহ-মেশানো চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে আর পুরনো হিসেব বরাবর করার লক্ষ্য নিয়েই মঙ্গলবার বার্মিংহামে বাংলাদেশের সঙ্গে টক্কর নিতে নামছে ভারত।
আর তার 'কার্টেন-রেইজার' এর মধ্যেই ফেসবুক বা টুইটারে শুরু হয়ে গেছে।








