আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
অ্যাপ দিয়ে যেভাবে পরিচালিত হচ্ছে হংকংয়ের নেতৃত্বহীন বিক্ষোভ
টনি (কাল্পনিক নাম) বসে আছেন হংকং'এর একটি দালানের ছোট্ট একটি ঘরে। তার চোখের সামনে আছে একটি ল্যাপটপ, যার মনিটরে তিনি পর্যবেক্ষণ করছেন 'টেলিগ্রাম' এবং অন্যান্য অনলাইন ফোরামগুলো।
বোঝার চেষ্টা করছেন সেখানে চলমান বিক্ষোভ ও আন্দোলনে অংশগ্রহনকারীদের সংখ্যা কেমন।
সংগঠকরা বলছেন যে, টনির মতো স্বেচ্ছাসেবকরা এমন শত শত টেলিগ্রাম গ্রুপ পরিচালনা করছেন। যার মাধ্যমে হংকংয়ে দানা বাঁধা এক বিক্ষোভ পরিণত হয়েছে সরকার বিরোধী আন্দোলনে।
বিতর্কিত এক প্রত্যর্পন আইনের বিরোধিতা করতে সম্প্রতি প্রায় বিশ লাখেরও বেশী মানুষ রাস্তায় নেমেছে বলে তাদের দাবি।
দেশের সার্বভৌমত্বকে খর্ব করতে পারে - এমন আশঙ্কায় প্রস্তাবিত বিলটির প্রতিবাদে হংকং-এ একের পর এক বিক্ষোভের ধারাবাহিকতা দেখেছে সবাই।
রিয়েল-টাইম ভোটিং
প্রস্তাবিত বিলটির প্রতিবাদে অনেকেই নামে বেনামে বিভিন্ন মেসেজিং গ্রুপে যোগ দিচ্ছেন। আর সেই সাথে তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন এনক্রিপ্টেড মেসেজিং চ্যাট গ্রুপ।
কোন কোন গ্রুপে ৭০ হাজারের মতো সক্রিয় সদস্য রয়েছে যা কিনা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় এক শতাংশ।
অনলাইন এসব গ্রুপে কেউ হয়তো বিক্ষোভ সম্পর্কিত সবশেষ তথ্য বা প্রতিবেদন প্রচারের দায়িত্বে থাকেন, কারো কাজ অনলাইন ক্রাউড বাড়িয়ে পুলিশের চোখ ফাঁকি দেয়া আর কেউ বা প্রতিবাদকারীদের বিভিন্ন বিষয়ে সতর্ক করে দেয়।
একইসাথে আইনজীবী বা চিকিৎসকদের ছোট ছোট অনলাইন গ্রুপও রয়েছে, যারা প্রতিবাদকারীদের আইনী পরামর্শ বা প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সহায়তা দিয়ে সাহায্য করে থাকে।
বিক্ষোভকারীরা বলছেন যে, এইসব অনলাইন সমন্বয়করা তথ্য প্রচারের জন্যে সুবিধাজনক ও তাৎক্ষণিক নানা উপায় বের করে থাকে।
পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারনের জন্যে অনেক সময় এসব চ্যাটগ্রুপ রিয়েল-টাইম ভোট এর ব্যবস্থাও করে থাকে।
যেমনটি হয়েছিল ২১শে জুনে হংকং পুলিশের সদরদপ্তর ঘেরাও কর্মসূচী অব্যাহত থাকবে কিনা তা নির্ধারন করতে, যখন অন্তত ৪০০০ প্রতিবাদকারী টেলিগ্রাম গ্রুপে ভোট দেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের সামনে বিক্ষোভ চালিয়ে যাবার পক্ষে সেখানে ৩৯% ভোট পরে- যদিও তারপরের প্রায় ছয় ঘন্টা সে ভবন অবরুদ্ধ ছিল।
এই বিক্ষোভ পরিচালনায় অন্যান্য অ্যাপও ব্যবহার করা হচ্ছে।
এই সপ্তাহে, একটি বেনামী গ্রুপ ক্রাউডফান্ডিং ওয়েব সাইটের মাধ্যমে প্রায় অর্ধ মিলিয়ন ডলারের তহবিল সংগ্রহ করেছে।
তাদের পরিকল্পনা, এই অর্থ দিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তারা বিজ্ঞাপন দেবে, যাতে করে হংকং-এর এই বিতর্কিত বিল নিয়ে যেন জি টুয়েন্টি সামিটে আলোচনা করা হয়।
বিক্ষোভকারীরা বলছেন, নেতৃত্বহীন এই বিক্ষোভটিকে প্রযুক্তির শক্তি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
গোপন পরিচয়
হংকং ব্যাপ্টিস্ট ইউনিভার্সিটির অধ্যপক এডমান্ড চেং বলেন, "কর্তৃপক্ষের প্রতি তীব্র অবিশ্বাসের বহি:প্রকাশ এই অনলাইন বিক্ষোভ। আমব্রেলা মুভমেন্টের বহু নেতাই গ্রেপ্তার হয়েছিলেন এবং কারা বরণ করেছেন"; ২০১৪ সালের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কথা উল্লেখ করে তিনি এ কথা বলেন।
এ বছরের এপ্রিল মাসে সেই আন্দোলনের ৯ জন নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ যে তারা জনসাধারনকে উস্কানি দেবার চেষ্টা করেছেন।
"আপনি যদি কোনো বিক্ষোভকে সংগঠিত করতে চান তবে বহু ধরনের অভিযোগের সম্মুখীন আপনাকে হতেই হবে", বলছিলেন টনি।
হংকংয়ের এই বিক্ষোভকারীদের অধিকাংশই অনলাইন নজরদারি এড়াতে বিভিন্ন পন্থা ব্যবহার করে থাকেন।
২৫ বছর বয়সী এক বিক্ষোভকারী, যার নাম জনি, সে বলছিল, "আমরা যখন কোনো আন্দোলনের মধ্যে থাকি তখন নগদ টাকায় চলি, কোনো এটিএম ব্যবহার করি না।"
জনি যখন কোনো প্রতিবাদে যোগ দেয় তখন একটি পুরোনো মডেলের মোবাইল ফোন এবং নতুন সিম কার্ড ব্যবহার করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকটি অনলাইন গ্রুপ-এর অ্যাডমিনিস্ট্রেটররা বলেন যে, কিছু মানুষ তাদের অনলাইন ফুটপ্রিন্ট লুকাতে একাধিক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে থাকে।
বিবিসি'কে তারা বলেন, "আমাদের কারো কারো কাছে থাকে তিন থেকে চারটি ফোন, একটি আইপ্যাড, ডেস্কটপ ও নোটবুক। একজন ব্যক্তি পাঁচ থেকে ছয়টি অনলাইন অ্যাকাউন্ট নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।"
আরও পড়তে পারেন:
যেভাবে সুরক্ষা নিশ্চিত করছেন বিক্ষোভকারীরা
টনির বিশ্বাস, অনলাইন ভোটিং এর মাধ্যমে নেয়া সিদ্ধান্তের ফলে কোন একজন ব্যক্তি বিশেষকে অভিযুক্ত করা সম্ভব নয়।
তার দাবি যে এসব অনলাইন চ্যাট গ্রুপের অ্যাডমিনিস্ট্রেটররা কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত নন এবং অনলাইনে পোস্ট করা কারো মতামতের ওপর তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।
"সরকার নিশ্চয়ই আন্দোলনে অংশ নেয়া প্রতিটি ব্যক্তিকে গ্রেফতার করতে চায় না। আর এটা সম্ভবও নয়" বলছিলেন টনি।
তবে আইন প্রয়োগকারীরা ভিন্ন উপায় অনুসরন করতে পারে বলেও তার আশঙ্কা রয়েছে।
"প্রভাবশালীদের বেছে বেছে গ্রেপ্তার করে অন্যদের জন্যে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করতে পারে সরকার", টনির মত।
যেমন ১২ই জুন টেলিগ্রাম গ্রুপ এর একজন অ্যাডমিনিস্ট্রেটরকে গ্রেপ্তার করা হয় আইন-প্রণয়ন কমপ্লেক্সের চারপাশের সড়ক অবরোধের ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকার অভিযোগে।
গ্রেপ্তার হওয়া এমন কজন আন্দোলনকারীদের আইনজীবী বন্ড এনজি বলেন যে, এতে করে কর্তৃপক্ষ বোঝাতে চায় - যদিও আপনি ইন্টারনেটে লুকিয়ে থেকেই কাজ করছেন, তা স্বত্ত্বেও তারা আপনার বাড়িতে এসেই আপনাকে গ্রেফতার করতে পারে।