ভ্যাট আদায়ে বেচাকেনায় ব্যবহৃত হবে ইএফডি, এনবিআর-এর এই নতুন যন্ত্র কীভাবে কাজ করবে?

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, সানজানা চৌধুরী
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
ভ্যাট আদায়ে স্বচ্ছতা আনতে নতুন অর্থবছর থেকেই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোয় ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) মেশিন চালু করার কথা জানিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআর।
ইএফডি ব্যবহার করলে পণ্য ও সেবা বেচাকেনায় স্বচ্ছতা আসবে এবং ভ্যাট ফাঁকি অনেকাংশে কমে যাবে, বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এতদিন ধরে যথাযথ ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যে সারাদেশের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোয় ইলেকট্রনিক ক্যাশ রেজিস্টার (ইসিআর) মেশিন ব্যবহার হতো।
অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সংবলিত এই ইএফডি মূলত ইসিআর-এর উন্নত সংস্করণ।
২০০৮ সালে ১১টি খাতে ইসিআর ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছিল সরকার। তবে যথাযথ মনিটরিংয়ের অভাবে সেই কার্যক্রম তেমন সফল হয়নি।
আরও পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Getty Images
অভিযোগ রয়েছে যে, হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া আরও কেউই এই যন্ত্র ব্যবহার করেন না। আবার যারা ব্যবহার করেন, তাদের অনেকের বিরুদ্ধে ভ্যাট ফাঁকি দেয়ার অভিযোগও উঠেছে।
ফার্মগেটের বাসিন্দা হাফসাতুন্নেসার সঙ্গে কথা বলে জানা যায় সরকার যেসব প্রতিষ্ঠানে ইসিআর বাধ্যতামূলক করেছে তেমন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কেনাকাটা করলেও তার কোন বিল ইসিআর-এ কাটা হয়নি।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, "আমি শপিং শেষে যখন তাদের কাছে রিসিট চাই, তাদের কোন না কোন বাহানা থাকেই। হয় তাদের অনেক দেরি হয়ে গেছে, মেশিন নষ্ট, না হলে মেশিনে কাগজ নেই। আরও নানা অজুহাত। এখন এটা নিয়ে আর কতো বার্গেনিং করবো?"
প্রায় একই ধরণের অভিজ্ঞতার কথা জানালেন উত্তরার বাসিন্দা ফারজানা ইয়াসমিন। সম্প্রতি তিনি একটি নামি দামী প্রতিষ্ঠান থেকে কেনাকাটা করলেও তাকে কোন রিসিট দেয়া হয়নি।
তিনি অনেকটা আক্ষেপ করেই বলেন, "আমি যে পণ্যগুলো কিনলাম, সেগুলোর কতো দাম ধরা হল, আমি কতো টাকা ভ্যাট আমি জানতে পারলাম না। মানে আমার টাকার হিসাব আমার কাছেই নেই। এখন প্রতিষ্ঠান মালিকরা সচেতন না হলে, আমরাই বা কি করবো?"
ইএফডি মেশিনে কী ধরণের সুবিধা পাওয়া যাবে:
দেশের অর্থনীতির আকার বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পণ্য ও সেবা খাত থেকে বিপুল পরিমাণ ভ্যাট আদায়ের কথা থাকলেও ইসিআর এর মাধ্যমে সে অনুযায়ী ভ্যাট আদায় করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন এনবিআর-এর এক কর্মকর্তা।
তবে ইএফডি মেশিনে, ভ্যাট ফাঁকি, বা ব্যবসায়ীদের হয়রানির তেমন সুযোগ নেই বলে তিনি জানিয়েছেন।
কেননা এই যন্ত্রটি এনবিআর-এর সার্ভারের সরাসরি যুক্ত থাকায় প্রতিটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রতিদিনকার বিক্রয়ের তথ্য সরাসরি এনবিআর-এর সার্ভারে চলে আসবে।
এ কারণে একবার ইএফডিতে একবার ইনপুট দেয়া হলে সেই তথ্য গোপন করার কোন সুযোগ নেই।
ইসিআর মেশিন অফলাইন হওয়ায় অসাধু ব্যবসায়ীদের তথ্য আড়াল করার সুযোগ থাকে।
আবার যেসব ব্যবসায়ী এনবিআর এর স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী ইসিআর ব্যবহার করেন না। তাদের অনেক ফিচার অনুপস্থিত থাকে।
এ কারণে ভ্যাট আদায়ে ইসিআরের তুলনায় ইএফডি মেশিন বেশি কার্যকর বলে মনে করা হচ্ছে।
এছাড়া ভোক্তারাও চাইলে মোবাইল অ্যাপে কিউআর কোডের মাধ্যমে এই ভ্যাটের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানতে পারবেন।

ছবির উৎস, Getty Images
কোন কোন প্রতিষ্ঠানে ইএফডি ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হবে?
ভ্যাট আইনানুযায়ী, বাংলাদেশে যে সব ব্যবসায়ীদের বাৎসরিক লেনদেন ৫০ লাখ টাকার বেশি, অর্থাৎ যারা ভ্যাটের আওতাধীন হবে। তাদের অবশ্যই এই ইএফডি ব্যবহার করতে হবে।
যেসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ইসিআর চালু রয়েছে সেগুলোর সবকটি ইএফডি এর আওতায় আসবে।
বরং এবার পরিসর কিছুটা বাড়ানো হবে বলে জানিয়েছে এনবিআর।
এদিকে, নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর করতে এ যন্ত্রটি ব্যবহারের বিষয়ে ব্যবসায়ীও তাদের সম্মতির কথা জানিয়েছে।
মূলত নীচে উল্লেখিত প্রতিষ্ঠানগুলোয় এই যন্ত্র সরবরাহ করা হবে।
- রেস্তোরাঁ ও ফাস্টফুড
- মিষ্টান্নভাণ্ডার
- আবাসিক হোটেল
- কমিউনিটি সেন্টার
- অভিজাত শপিং সেন্টারের সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান
- পোশাক বিক্রির কেন্দ্র ও বুটিক শপ
- বিউটি পার্লার
- ইলেকট্রনিক সামগ্রীর বিক্রয় কেন্দ্র
- আসবাবপত্রের বিক্রয় কেন্দ্র
- ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ও জেনারেল স্টোর
- সুপার শপ
- বড় ও মাঝারি পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, এবং
- স্বর্ণ ও রূপার প্রতিষ্ঠান।

ছবির উৎস, Getty Images
ইএফডি প্রতিস্থাপন করা হবে কিভাবে:
যেসব ব্যবসা কেন্দ্রে ইসিআর ও পিওএস মেশিন ব্যবহার হচ্ছে সেগুলো তুলে দিয়ে আগামী মাসেই ইএফডি মেশিন প্রতিস্থাপনের কথা জানানো হয়েছিল এনবিআর এর পক্ষ থেকে।
নতুন এই যন্ত্র প্রতিস্থাপনের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে এনবিআর।
এখন পর্যন্ত এনবিআর মাত্র ১০ হাজার প্রতিষ্ঠানে ইএফডি মেশিন দেয়ার কথা জানিয়েছে।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলালউদ্দিন বলেন, "জুলাইয়ের মধ্যে ইএফডি প্রতিস্থাপনের কথা এনবিআর এর পক্ষ থেকে বলা হলেও, এখন পর্যন্ত তারা কোন কাজই শুরু করেনি।"
"একটা শতভাগ অটোমেশন পদ্ধতি চালু করতে গেলে যে সক্ষমতার প্রয়োজন সেটা আমাদের এখনও হয়নি। এ সংক্রান্ত কোন ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করেনি এনবিআর।"
তবে সারা দেশে পর্যায়ক্রমে এক লাখ ইএফডি মেশিন সরবরাহ করার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি। তবে সেটা সময়সাপেক্ষ হবে বলে তারা উল্লেখ করে।

ছবির উৎস, Getty Images
এছাড়া ব্যবসায়ীরা চাইলে সরকারের কাছ থেকে কিস্তির সুবিধা নিয়ে ব্যক্তিগতভাবেও ইএফডি মেশিন কিনতে পারবেন বলে সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানান হয়।
এনবিআর এর এক কর্মকর্তা বলেন, "নতুন এই যন্ত্রগুলো ক্রয় করা থেকে বিতরণ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কয়েকটি কমিটি কাজ করছে। সেই কমিটির কাজের গতির ওপর নির্ভর করবে, এই উদ্যোগ কতো তাড়াতাড়ি সফল হবে।"
যন্ত্রগুলো হাতে এলে ভ্যাট কমিশনারদের নিজ নিজ কমিশনারেটের অধীনে থাকা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গুলোয় ইএফডি মেশিন স্থাপন বা প্রতিস্থাপনে কাজ করবে।
তবে যেসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ইএফডি মেশিন পাবে না তাদের কাছ থেকে কোন পদ্ধতিতে ভ্যাট আদায় করা হবে সেটাও এখনও পরিষ্কার নয়।








