বাংলাদেশ-পাকিস্তান ভিসা জটিলতা: যা বলা হচ্ছে দু'দেশের তরফে

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন
ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন
    • Author, শাহনাজ পারভীন
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশ ও পাকিস্তান একে অপরের দেশের নাগরিকদের ভিসা দেয়া বন্ধ রেখেছে বলে দুই দেশের তরফ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক অনেক দিন ধরেই বেশ শীতল, তবে নাগরিকদের ভিসা না দেয়ার কারণে সম্প্রতি তা যেন নতুন করে আরও তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন বলছেন যে মূল সমস্যাটি পাকিস্তানের দিকে থেকে।

তবে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তারা দায় চাপাচ্ছেন বাংলাদেশের ওপর।

দেশটির পররাষ্ট্র দফতরের একজন কর্মকর্তা বিবিসির উর্দু সার্ভিসকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন যে ইসলামাবাদে বাংলাদেশের দূতাবাস গত সাত দিন যাবত পাকিস্তানের নাগরিকদের ভিসা দেয়া বন্ধ রেখেছে।

এমনকি দূতাবাসের ভিসা বিভাগটিই বন্ধ রাখা হয়েছে।

ওই কর্মকর্তা বিবিসি উর্দুকে জানান, দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক বিবাদ শুরু হয় যখন বাংলাদেশ ঢাকায় পাকিস্তান দূতাবাসে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ পাওয়া সাকলাইন সায়িদাহকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়।

এর জবাবে পাকিস্তান সেদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তাদের ভিসা দিতে অস্বীকৃতি জানায় বলে বিবিসি উর্দুর সংবাদদাতাকে বলেছেন ওই কর্মকর্তা।

ভিসা বিভাগ বন্ধ থাকার কারণ সম্পর্কে যা জানা গেছে, তাহলো পাকিস্তান বাংলাদেশ হাইকমিশনে নিযুক্ত ভিসা কাউন্সিলরকে এখনো ভিসা দেয়নি, ফলে তা বন্ধ রয়েছে।

বিবিসি উর্দুর সংবাদদাতা জানাচ্ছেন, বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে প্রতিদিন গড়ে ১০-১৫টি ভিসা দেয়া হয়।

গত এক সপ্তাহ ধরে ইসলামাবাদে বাংলাদেশী দূতাবাস পাকিস্তানিদের ভিসা দিচ্ছে না বলে স্থানীয় গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, "যে তথ্যটা বের হয়েছে পত্রিকায়, এটা শুডবি উল্টো যে পাকিস্তান আমাদের বাংলাদেশীদের কোন ভিসা দিচ্ছে না।"

কী বলেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী?

পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আমাদের দিক থেকে পাকিস্তানের কোন নাগরিকের ভিসা ডিনাই (প্রত্যাখ্যান) আমরা করি না। যারাই আবেদন করে, তাদেরই আমরা ভিসা দিই। ভেরিফাই করেই দিই। কিন্তু পাকিস্তান আমাদের সাথে অসহযোগিতা করছে।"

কী ধরনের অসহযোগিতা করছে তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, পাকিস্তানে বাংলাদেশের দূতাবাসের কনস্যুলার সেকশনে যাকে নিয়োগ করা হয়েছে, তাকে পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে ভিসা না দেয়ায় তিনি তার স্টেশনে কাজে যেতে পারছেন না।

তিনি বলেন, তার অনুপস্থিতিতে প্রেস উইং কর্মকর্তাকে দিয়ে কনস্যুলারের কাজ করানো হচ্ছিলো। এখন তারও ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর তিনি নতুন করে বেশ কবার ভিসার আবেদন করেছেন।

কিন্তু পাকিস্তানের পক্ষ থেকে কোন উত্তর দেয়া হয়নি বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

মি. মোমেন বলেন, তার পরিবার বাংলাদেশ থেকে তাকে পাকিস্তানে দেখতে যেতে চাইলে তাদেরকেও ভিসা দেয়া হয়নি।

আর বিষয়টি শুধু দুজন কূটনীতিকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, সাধারণভাবেই ভিসার ক্ষেত্রে পাকিস্তান 'অসহযোগিতা' করছে বলে জানান তিনি।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, "পাকিস্তানে বাংলাদেশের ব্যবসার পরিমাণ তারা দিনে দিনে কমিয়ে ফেলছে। আমাদের ব্যবসায়ীদের জন্যেও ভিসা পাওয়া কঠিন হচ্ছে। তাই তাদের ব্যবসাও কমে গেছে"।

বাংলাদেশ এ ব্যাপারে পাল্টা কোন ব্যবস্থা নেবে কি-না, তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, "বাংলাদেশে এখন পাকিস্তানের জবাবের অপেক্ষায় আছে।"

পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতকে কেন গ্রহণ করছে না বাংলাদেশ

ঢাকায় রাষ্ট্রদূত হিসেবে পাকিস্তান সাকলাইন সায়িদাহকে নিয়োগ করেছিল। কিন্তু প্রায় বছর খানেক ধরে বাংলাদেশ তাকে গ্রহণ করছে না বাংলাদেশ। এর পর থেকেই বাংলাদেশে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতের পদটি খালি রয়েছে।

বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন যে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক বিবাদ তুঙ্গে ওঠার এটিই একটি কারণ।

সাকলাইন সায়িদাহকে কেন গ্রহণ করা হয়নি, তা জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী নির্দিষ্ট করে কিছু বলেননি। তবে তিনি মন্তব্য করেন যে কূটনীতিতে এটা অনেক এমনটা ঘটে।

"যে কোনো রাষ্ট্র যাকে পছন্দ করে না তাকে বলেই দিতে পারে যে ওকে চাইনা। এটা তো স্বাভাবিক। সবাইকে যে নিবে নট নেসেসারিলি। এটা রাষ্ট্রের উপর নির্ভর করে। কিন্তু তাই বলে যে গো ধরে থাকবে, এমন ব্যবস্থা কোথাও নাই।"

মি. মোমেন বলেন, বাংলাদেশের বহু কূটনীতিককেই বহু দেশ গ্রহণ করেনি। তার মানে এই নয় যে সেখানে ভিসা বন্ধ হয়ে গেছে।

সাকলাইন সায়িদাহকে প্রত্যাখ্যান করার বিষয়ে তিনি বলেন যে এটি তিনি মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার অনেক আগের ঘটনা।

দুদেশের সম্পর্কে ১৯৭১ সালের যুদ্ধের ক্ষত এখনো বড় কাঁটা হয়ে আছে

ছবির উৎস, AFP

ছবির ক্যাপশান, দুদেশের সম্পর্কে ১৯৭১ সালের যুদ্ধের ক্ষত এখনো বড় কাঁটা হয়ে আছে

মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার ও পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক

বাংলাদেশে যখন মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়, তখন থেকেই পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে।

পাকিস্তানের সংসদে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সামালোচনা হয়। এমনকি পাকিস্তান সংসদে একটি নিন্দা প্রস্তাবও পাশ হয়। বাংলাদেশও পাকিস্তানের এই প্রতিক্রিয়া পছন্দ করেনি। দু'দেশ একে অপরের রাষ্ট্রদূতকেও তলব করে।

২০১০ সালে প্রথম বাংলাদেশ এই ট্রাইব্যুনাল গঠন করে এবং এর প্রথম রায় দেয়া হয় ২০১৩ সালে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী মি. মোমেন বলছেন, "আমাদের ইন্টারনাল বিষয়ে তাদের ইন্টারভেনশন বাংলাদেশ পছন্দ করেনি।"

চার বছর বাংলাদেশে আসতে পারছেন না যে সাংবাদিক

মুনির আহমেদ পাকিস্তানের করাচীতে ডেইলি নিউজ নামের একটি খবরের কাগজের বার্তা সম্পাদক। ১৯৬০-এর দশক থেকে শিক্ষা ও কর্মসূত্রে পাকিস্তানে থাকেন যশোরের এই আদি বাসিন্দা। তিনি এখন পাকিস্তানের নাগরিক।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছেন, "চার বছর আগে সর্বশেষ বাংলাদেশে গিয়েছিলাম। তারপর থেকে অনেক চেষ্টা করেও আর ভিসা পাওয়া যায়নি।"

মি. আহমেদ আরও জানান, বাংলাদেশ থেকে আগে যারা নিয়মিত আসতেন, তারাও এখন আর আসা যাওয়া করছেন না। আবার যারা নিয়মিত বাংলাদেশে যেতেন, তাদেরও যাওয়া বন্ধ।

"এতেই অবস্থা বোঝা যায়," মন্তব্য করেন এই সাংবাদিক।