ক্রিকেট বিশ্বকাপ ২০১৯: যেভাবে মাঠে এবং টেলিভিশনে

বিশ্বকাপ ট্রফি

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বিশ্বকাপ ট্রফি

দেড় মাস ধরে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের ১১টি মাঠে ক্রিকেট বিশ্বকাপ ২০১৯। তবে বিশ্বের প্রায় ১০০ কোটি মানুষ বিশ্বকাপ দেখবে টিভিতে, এবং তাদের মাঠে বসে ক্রিকেট দেখতে না পারার দুঃখ ঘোচাতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল বা আইসিসি 'স্টেট-অব-দি-আর্ট' টিভি কভারেজের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

৩০শে মে থেকে ৪৬ দিন ধরে চলা বিশ্বকাপে ম্যাচ হবে মোট ৪৮টি। আইসিসি টিভি সবগুলো ম্যাচই লাইভ প্রচার করবে।

আইসিসি বলছে প্রযুক্তি এবং ক্যামেরা ব্যবহারের দিক থেকে এবারের বিশ্বকাপের কভারেজ হবে অভূতপূর্ব, ''স্টেট-অব-দি-আর্ট''।

প্রতিটি ম্যাচে মাঠে কমপক্ষে ৩২টি ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে যেগুলোর আটটি থাকবে 'আলট্রা-মোশন' 'হক-আই' ক্যামেরা। স্ট্যাম্পের সামনে এবং পেছনে দুদিকেই ক্যামেরা থাকবে। সেইসাথে মাঠের ওপর টাঙানো দড়িতে থাকবে চলমান ''স্পাইডার ক্যামেরা''।

আকাশে থাকবে ড্রোন চালিত ক্যামেরা যা দিয়ে ওপর থেকে পুরো স্টেডিয়াম এবং আশপাশের ছবি দেখবেন দর্শকরা।

বিশ্বকাপে ধারাভাষ্যকারদের কজন

ছবির উৎস, ICC

ছবির ক্যাপশান, বিশ্বকাপে ধারাভাষ্যকারদের কজন

আইসিসি বলছে, এই প্রথমবারের মতো ম্যাচের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোর রি-প্লে এবং সেই সাথে বিশ্লেষণ এমনভাবে এবার টিভি দর্শকরা দেখবেন যে অভিজ্ঞতা আগে তাদের কখনো হয়নি। এই '৩৬০ ডিগ্রি' রিপ্লেতে কয়েকটি ক্যামেরার ফুটেজ যোগ করা হবে।

ধারাভাষ্যকারদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করেছে আইসিসি।

নাসের হুসেইন, ইয়ান বিশপ, কুমার সাঙ্গাকারা, মাইক অ্যাথারটান, সৌরভ গাঙ্গুলি, সঞ্জয় মাঞ্জরেকার,ওয়াসিম আকরাম, রমিজ রাজা এবং মার্ক নিকোলাসের মতো তারকা ধারাভাষ্যকারদের পাশাপাশি থাকবেন : মেলানি জোন্স, আ্যালিসন মিচেল, ব্রেন্ডন ম্যাকালাম, গ্রায়েম স্মিথ, শন পোলক, মাইকেল স্লেটার, মার্ক নিকোলাস, মাইকেল হোল্ডিং, ইশা গুহ, পমি বাঙ্গাওয়া, হর্শ ভোগলে, সাইমন ডল, ইয়ান স্মিথ, আতহার আলি খান, ইয়ান ওয়ার্ড এবং গতবারের বিশ্বকাপ জয়ী অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্ক।

এবারের বিশ্বকাপ কেমন হবে?

ক্রিকেট পন্ডিতরা উচ্ছ্বসিত। তারা বলছেন, এবারের বিশ্বকাপ হতে পারে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে চমকপ্রদ, উপভোগ্য, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ টুর্নামেন্ট।

নাসের হুসেইন: "সবচেয়ে উপভোগ্য বিশ্বকাপ হতে পারে এবার...এই ইতিহাসের একজন সাক্ষী হওয়ার জন্য আমি উন্মুখ।"

ব্রেন্ডন ম্যাকালাম: "... বিশ্বকাপের সাথে এবার যুক্ত হচ্ছি ভিন্ন এক ভূমিকায়। নাটকীয়তায় ভরা একটি বিশ্বকাপের অপেক্ষা করছি।"

কুমার সাঙ্গাকারা: "এবারের বিশ্বকাপ হবে সম্ভবত এযাবতকালের মধ্যে সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ টুর্নামেন্ট। ইংল্যান্ড ফেভারিট, কিন্তু যোগ্য একাধিক চ্যালেঞ্জার রয়েছে।"

মেলানি জোন্স: "১০টি দলেরই যে শক্তি, তাতে নজিরবিহীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার সম্ভাবনা এবার প্রবল। আগাগোড়া বহু অঘটন ঘটতে পারে, আগে পায়নি এমন কোনো দল এবার প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জিততে পারে।"

ওয়াসিম আকরাম: "১৯৯২ বিশ্বকাপের ফরম্যাটে হবে এবারের বিশ্বকাপ। কোয়ালিফাই করার জন্য প্রতিটি দল অনেক সুযোগ পাবে... শক্ত প্রতিযোগিতা হবে এবং অভূতপূর্ব ক্রিকেট দক্ষতা দেখার আশা করছি।"

'হোম অফ ক্রিকেট' লর্ডস।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, 'হোম অফ ক্রিকেট' লর্ডস। ফাইনাল সহ পাঁচটি ম্যাচ হবে এখানে

যে যে ভেনুতে বিশ্বকাপ হবে

৩০ মে থেকে ৪৬দিন ধরে চলা বিশ্বকাপে ৪৮টি ম্যাচ। এই ম্যাচগুলো হবে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের ১১টি স্টেডিয়ামে।

১. এজবাস্টন ক্রিকেট গ্রাউন্ড, বার্মিংহাম, আসন - ২৫,০০০

১৮৮৬ সালে তৈরি ওয়ারিকশায়ার কাউন্টি ক্রিকেট ক্লাবের এই হোম গ্রাউন্ড লর্ডস, ওভাল এবং ওল্ড ট্রাফোর্ডের পর ব্রিটেনের চতুর্থ বৃহত্তম ক্রিকেট স্টেডিয়াম। নিয়মিত টেস্ট ম্যাচ ভেনু এটি। ২০১৩ সালে আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ফাইনাল হয়েছিল এজবাস্টনে। ঐ প্রথম লর্ডসের বাইরে কোথাও আন্তর্জাতিক কোনো টুর্নামেন্টের ফাইনাল ম্যাচ হয়েছিল।

এবারের বিশ্বকাপে এজবাস্টনে একটি সেমিফাইনাল সহ পাঁচটি ম্যাচ হবে। দোসরা জুলাই বাংলাদেশ ও ভারতের ম্যাচটি হবে এজবাস্টনে।

২. ব্রিস্টল ক্রিকেট গ্রাউন্ড, ব্রিস্টল, আসন - ১১০০০

১৮৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ক্রিকেট স্টেডিয়াম ১৩০ বছর ধরে গ্লস্টারশায়ার কাউন্টি ক্রিকেট ক্লাবের হোম-গ্রাউন্ড। এতো পুরনো মাঠ হলেও, এখানে প্রথম আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ম্যাচ হয় ১৯৮৩ সালে (নিউজিল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কার মধ্যে)। তারপর থেকে গড়ে বছরে একটি ওডিআই ম্যাচ হয় এখানে। টেস্ট ম্যাচ এখনও হয়নি। আয়তনের দিক থেকে অনেক বড় মাঠ হলেও আসন সংখ্যা মাত্র ১১০০০।

এই মাঠে তিনটি ম্যাচ হবে। ১১ই জুন বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার ম্যাচ রয়েছে এই মাঠে।

৩. সোফিয়া গার্ডেনস, কার্ডিফ, ওয়েলস, আসন - ১৫,২০০

১৯৬৭ সাল থেকে মাঠটি গ্লামোরগান কাউন্টি ক্রিকেট ক্লাবের হোম গ্রাউন্ড। তবে এখানে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ হয় ১৯৯৯ সালের ২০শে মে (অস্ট্রেলিয়া বনাম নিউজিল্যান্ড)। ২০০১ সাল থেকে নিয়মিত ওডিআই ম্যাচ হচ্ছে। এবারের বিশ্বকাপে চারটি ম্যাচ রয়েছে। ৮ই জুন বাংলাদেশ ও ইংল্যান্ডের ম্যাচটি হবে কার্ডিফের এই মাঠে।

ট্রেন্ট ব্রিজ, নটিংহ্যাম। এই বিশ্বকাপে পাঁচটি ম্যাচ হবে ট্রেন্টব্রিজে। ২০শে জুন বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার লড়াই হবে এখানে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ট্রেন্ট ব্রিজ, নটিংহ্যাম।

৪. রিভারসাইড, চেস্টার লে স্ট্রিট, ডারহাম, আসন - ১৪,০০০

অপেক্ষাকৃত নতুন ক্রিকেট স্টেডিয়াম। ১৯৯৫ তে শুরু হলেও ২০০৩ সালে টেস্ট ভেনুর মর্যাদা পেয়েছে ডারহাম কাউন্টির এই হোম গ্রাউন্ড। তিনটি ম্যাচ হবে এই মাঠে।

৫. হেডিংলি, লিডস, আসন - ১৮,৩৫০

ইয়র্কশায়ার কাউন্টি ক্লাবের এই মাঠে ১৮৯৯ সাল থেকে টেস্ট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই মাঠে প্রথম ওডিআই ম্যাচ হয় ১৯৭৩ সালের ৫ই সেপ্টেম্বর, ইংল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের মধ্যে।

২০১৯ বিশ্বকাপে ৪টি ম্যাচ হবে হেডিংলিতে।

৬. লর্ডস, লন্ডন, আসন- ২৮,৫০০

'হোম অব ক্রিকেট' নামে খ্যাত লন্ডনের এই ক্রিকেট মাঠের পত্তন হয়েছিল ১৮১৪ সালে। মিডলসেক্স কাউন্টি ক্লাবের এই হোম গ্রাউন্ডের মালিকানা এমসিসি'র। ২০০৫ সাল পর্যন্ত আইসিসির সদর দপ্তর ছিল এখানে।

ফাইনাল ম্যাচ সহ পাঁচটি ম্যাচ হবে লর্ডসে। ৫ই জুলাই এই মাঠে পাকিস্তানের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ।

৭. ওভাল, লন্ডন, আসন - ২৫,০০০

ইংল্যান্ডের মাটিতে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে প্রথম টেস্ট ম্যাচটি হয়েছিল ওভালের মাঠে, ১৮৮০ সালে। ১৮৪৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই স্টেডিয়ামে একসময় ফুটবলও খেলা হতো। তবে সারে কাউন্টি ক্লাবের এই হোম গ্রাউন্ডে এখন শুধু ক্রিকেটে খেলা হয়।

এই বিশ্বকাপে মোট পাঁচটি ম্যাচ হবে ওভালের মাঠে। বাংলাদেশের পর পর দুটো ম্যাচ রয়েছে ওভালে। জুনের ২ তারিখে বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচ দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে। ৫ই জুন নিউজিল্যান্ডের সাথে বাংলাদেশের পরের ম্যাচটিও হবে ওভালের মাঠে।

ওভালের মাঠ, লন্ডন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ওভালের মাঠ, লন্ডন

৮. ওল্ড ট্রাফোর্ড, ম্যানচেস্টার, দর্শক - ২৪,৬০০

ওল্ড ট্রাফোর্ড ইংল্যান্ডের আরেকটি বহু পুরনো এবং ঐতিহ্যবাহী ক্রিকেট মাঠ যার বয়স দেড়শ' ছাড়িয়ে গেছে। প্রথমে এটি ছিল ম্যানচেস্টার ক্রিকেট ক্লাবের গ্রাউন্ড, তবে ১৮৬৪ সাল থেকে এটি ল্যাঙ্কাশায়ার কাউন্টি ক্লাবের হোম গ্রাউন্ড। ১৮৮৪ সালে (জুলাই ১০-১২)অ্যাশেজের প্রথম টেস্ট ম্যাচটি হয়েছিল ওল্ড ট্রাফোর্ডে। এ মাঠে প্রথম ওডিআই হয় ১৯৭২ সালের ২৪শে আগস্ট, ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে।

একটি সেমিফাইনাল সহ ছয়টি ম্যাচ হবে এখানে। তার মধ্যে রয়েছে ১৬ই জুন ভারত ও পাকিস্তানের ম্যাচ।

ট্রেন্ট ব্রিজ, নটিংহ্যাম, আসন - ১৭,০০০

১৮৯৯ সাল থেকে ট্রেন্ট ব্রিজে টেস্ট ম্যাচ খেলা হচ্ছে। প্রথম ওডিআই হয়েছিল ১৯৭৪ সালে ৩১শে আগস্ট ইংল্যান্ড ও পাকিস্তানের মধ্যে। প্রচুর রান হয় এই মাঠে। ওডিআই ক্রিকেটে ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ ৪৮১ রানের রেকর্ডটি নটিংহ্যাম কাউন্টি ক্লাবের এই মাঠেই হয়েছে।

এই বিশ্বকাপে পাঁচটি ম্যাচ হবে ট্রেন্টব্রিজে। ২০শে জুন বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার লড়াই হবে এখানে।

ওল্ড ট্রাফোর্ড, ম্যানচেস্টার

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ওল্ড ট্রাফোর্ড, ম্যানচেস্টার

১০. রোজবোল, সাদামটন, আসন - ১৭,০০০

হ্যাম্পশায়ার ক্রিকেট কাউন্টির এই হোম গ্রাউন্ড অন্য মাঠগুলোর তুলনায় নতুন ক্রিকেট মাঠ। ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও এই মাঠে অবশ্য তিন ফরম্যাটের ক্রিকেটই (টেস্ট, ওডিআই, টি-টুয়েন্টি) হচ্ছে। তবে বিশ্বকাপ হচ্ছে এই প্রথম।

এই বিশ্বকাপে রোজবোলের মাঠে পাঁচটি ম্যাচ হবে। এর মধ্যে রয়েছে আফগানিস্তান ও বাংলাদেশের ম্যাচ, ২৪শে জুন।

১১. টনটন, সমারসেট, আসন - ৮,০০০

সমারসেট কাউন্টি ক্রিকেট ক্লাবের হোম গ্রাউন্ডটি ১৮৮২ সালে চালু হলেও এখনও এটি টেস্ট ভেনুর মর্যাদা পাইনি। তবে ১৯৮৩ সাল থেকে এখানে ওডিআই ম্যাচ হচ্ছে।

বাংলাদেশে ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের মধ্যে ১৭ই জুনের ম্যাচটিসহ এবারের বিশ্বকাপের তিনটি ম্যাচ হবে টনটনে।