পুরনো ঢাকা থেকে সরছে না প্লাস্টিক কারখানা - কতটা ঝূঁকি তৈরি করতে পারে?

পুরনো ঢাকা এলাকায় অনেক প্লাস্টিক কারখানা ও গোডাউন রয়েছে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, পুরনো ঢাকা এলাকায় অনেক প্লাস্টিক কারখানা ও গোডাউন রয়েছে।
    • Author, সায়েদুল ইসলাম
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশের ঢাকার পুরনো এলাকা থেকে সব ধরণের কারখানা সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত থেকে খানিকটা সরে এসেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন।

এখন পুরনো ঢাকায় প্লাস্টিক তৈরির কারখানা ও গুদাম আপাতত রাখতে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সিটি কর্পোরেশন, যদিও এজন্য তাদের কিছু শর্ত পালন করতে হবে।

এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে - কারখানা ও গোডাউনে এক বালতি করে পানি ও বালু এবং অগ্নি নির্বাপণ গ্যাসের সিলিন্ডার রাখতে হবে।

রবিবার পুরনো ঢাকা এলাকায় একটি মতবিনিময় সভায় ব্যবসায়ীরা এই সিদ্ধান্তে সম্মত হলে তাদের কারখানা রাখার অনুমতির বিষয়টি জানান ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাঈদ হোসেন খোকন।

তবে দাহ্য পদার্থ রয়েছে, এমন সব কারখানা ও গোডাউনের বিরুদ্ধে অভিযান চলবে বলে তিনি জানান।

চকবাজারের অগ্নিকাণ্ডে ৭৮জন নিহত হওয়ার পর ওই এলাকা থেকে সব ধরণের কারখানা ও রাসায়নিক গোডাউন সরিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কর্তৃপক্ষ।

বসতির মধ্যে প্লাস্টিক কারখানা ও গোডাউন - কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?

ব্যবসায়ীরা দাবি করেন, প্লাস্টিক জাতীয় পদার্থ অতি দাহ্য পদার্থ নয়, যা থেকে বিস্ফোরণ ঘটা বা আগুন ছড়িয়ে যেতে পারে।

মেয়র সাঈদ খোকন বলছেন, ''পুরনো ঢাকায় কারখানা সরানোর অভিযান শুরুর পর প্লাস্টিক ব্যবসায়ীরা বলছিলেন যে, প্লাস্টিক দানা দাহ্য পদার্থ বা বিস্ফোরক জাতীয় নয়। তখন আমরা বিস্ফোরক পরিদপ্তরের মতামত নিয়েছে।"

"তারা বলেছে, এসব কারখানা বিস্ফোরক বা দাহ্য জাতীয় নয়। তাই আমরা আপাতত তাদের পুরনো ঢাকা এলাকায় থাকার অনুমতি দিয়েছি। তবে তাদের অগ্নি সতর্কতার সব ব্যবস্থা অবলম্বন করতে হবে।''

আরো পড়ুন:

এ বছর ৩রা জানুয়ারি ২০১৯ তারিখে ইসলামবাগে একটি প্লাস্টিক কারখানায় ভয়াবহ আগুন লাগে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, এ বছর ৩রা জানুয়ারি ২০১৯ তারিখে ইসলামবাগে একটি প্লাস্টিক কারখানায় ভয়াবহ আগুন লাগে।

তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. এম নুরুল আমিন বলছেন, আগুনের ক্ষেত্রে প্লাস্টিক পণ্যের ঝুঁকি কম করে দেখার কোন সুযোগ নেই।

''প্লাস্টিক নিজেই একটি দাহ্য পদার্থ। তাই যখন আগুন ধরে, সেখানে প্লাস্টিক থাকলে সেটি আরো বেগবান হয়। যেকোনো জনবসতি এলাকায় গোডাউন থাকাটাই ঝুঁকিপূর্ণ, সেখানে দাহ্য পদার্থ থাকলে তা আরো বেশি ঝুঁকির তৈরি করে। সেখানে যদি অন্যান্য রাসায়নিক থাকে, তাহলে আগুন আরো বিপদজনক হতে পারে।''

তিনি বলছেন, প্লাস্টিক তৈরিতে হাইড্রোজেন সায়ানাইড ব্যবহৃত হয়, যেটি একটি বিষাক্ত রাসায়নিক। আগুনের সংস্পর্শে এলে সেটি আশেপাশের বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর তো বটেই, মৃত্যুর কারণও হতে পারে।''

যেভাবে চকবাজারে আগুন ছড়িয়ে পড়েছে, সেরকম ক্ষেত্রে এক বালতি পানি আর এক বালতি বালু আসলে তেমন কোন কাজে আসবে না বলেই তিনি মনে করেন।

আপাতত থাকার অনুমতি

মেয়র সাঈদ হোসেন খোকন বলছেন, পুরনো ঢাকা এলাকায় প্লাস্টিক কারখানাগুলোকে আপাতত থাকার দেয়া হয়েছে, যেহেতু বিস্ফোরক পরিদপ্তর এগুলো তত বিপদজনক নয় বলে বলেছে।

তবে যত দ্রুত সম্ভব তাদের কারখানা অন্য কোথাও সরিয়ে নিতে হবে।

এজন্য কোন সময়সীমা নির্ধারিত না হলেও সিটি কর্পোরেশন কাজ করছে বলে তিনি জানান।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে পলিথিনের মতো প্লাস্টিক এখনো উৎপাদিত হচ্ছে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে পলিথিনের মতো প্লাস্টিক এখনো উৎপাদিত হচ্ছে।

কেরানীগঞ্জের একটি বিশেষ এলাকায় সব ধরণের কারখানা, গোডাউন সরিয়ে নেয়া হবে বলে তিনি জানান।

প্লাস্টিক কারখানার ঝুঁকি নিয়ে বিশেষজ্ঞরা যে মতামত দিয়েছেন, সে প্রসঙ্গে মেয়র সাঈদ হোসেন খোকন বলছেন, ''আমরা তো বিস্ফোরক পরিদপ্তরের মতামত নিয়েই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সরকারি একটি সংস্থা যে মতামত দিয়েছে, সেটা তো আমলে নেয়ার যোগ্য বলেই আমরা মনে করি।''

নগর কর্তৃপক্ষ হিসাবে এই সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্ব ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের, বলছেন মি. খোকন।

পবার উদ্বেগ

পুরনো ঢাকায় প্লাস্টিক কারখানা ও গোডাউন থাকতে দেয়ার সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন বা পবা।

পবা'র মহাসচিব মো. আবদুস সোবহান বলছেন, ''পুরনো ঢাকা তো কোন শিল্প এলাকা না, এটা পুরোপুরি একটা আবাসিক এলাকা। সেখানে কোন ধরণের কারখানা থাকারই সুযোগ নেই।"

"পরিবেশ আইনে বলা আছে, আবাসিক এলাকায় কোন কারখানা থাকবে না। আর প্লাস্টিক কারখানার ক্ষেত্রেও তো দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।''

পুরনো ঢাকার চকবাজারে ভয়াবহ আগুনে মারা গেছে অন্তত ৭৮জন
ছবির ক্যাপশান, পুরনো ঢাকার চকবাজারে ভয়াবহ আগুনে মারা গেছে অন্তত ৭৮জন।

তিনি বলছেন, "মেয়র সাহেবের উচিত ব্যবসায়ীদের স্বার্থ দেখার আগে জনগণের স্বার্থ দেখা। আর এসব প্লাস্টিকের কারখানায় পলিথিন তৈরি হয়, সেগুলো তো পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর, দেশে নিষিদ্ধ একটি পণ্য।''

''আমরা মনে করি, পরিবেশ অধিদপ্তরের উচিত এই বিষয়ে শক্ত পদক্ষেপ নেয়া যাতে পুরনো ঢাকা বা কোন আবাসিক এলাকাতেই কোন ধরণের কারখানা আর না থাকে''। তিনি বলছেন।

অধ্যাপক ড. এম নুরুল আমিন বলছেন, স্বাস্থ্য ঝুঁকির বিবেচনায় পুরনো ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সব ধরণের কারখানাই ঝুঁকিপূর্ণ। তাই এসব এমন এলাকায় সরিয়ে নিতে হবে, যেখান থেকে লোকালয়ের দূরত্ব আছে।

পাশাপাশি কারখানাগুলো অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার ওপর তিনি পরামর্শ দেন।