নারী-পুরুষ বৈষম্য: বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার নিচ থেকে তৃতীয়, বলছে বিশ্বব্যাংক

ঘরের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয় অনেক নারীকে

ছবির উৎস, ছবির কপিরাইটBARCROFT MEDIA

ছবির ক্যাপশান, ঘরের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয় অনেক নারীকে
    • Author, ফারহানা পারভীন
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

সকালের নাস্তার পর্ব সেরে দুপুরের খাবার রাঁধা নিয়ে ব্যস্ত হালিমা (এখানে তার ছদ্ম নাম ব্যবহার করা হচ্ছে)। সারা দিনই তার কেটে যায় এই রান্না আর গৃহস্থালি কাজ নিয়ে।

ঘরের কাজ করা অসম্মানের কিছু না, কিন্তু হালিমার ইচ্ছা ছিল অন্য।

তার ইচ্ছা ছিল লেখাপড়া শেষ করে কাজ করা, উপার্জন করা।

তিনি বলছিলেন - "আমার ইচ্ছা ছিল আমি পড়াশোনা কমপ্লিট করবো তারপর চাকরি করবো। কিন্তু আমার পরিবারের চাপে আমাকে বিয়ে করতে হয়।"

"বিয়ের পর দেখছি, চাকরি করার স্বাধীনতা তো নেইই বরং সন্তান নেয়ার জন্য স্বামী এবং শ্বশুর বাড়ীর লোকের কাছ থেকে এক ধরণের চাপের মধ্যে থাকি।"

হালিমা আরো বলছিলেন - "সন্তান নেয়ার বিষয়টি একটা মেয়ের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। কখন সে মানসিক এবং শারীরিকভাবে প্রস্তুত সেটা সেই মেয়েই বলতে পারে। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে সেটা হয়নি। শুধু আমার ক্ষেত্রে না, আমি দেখি আমার মত আরো মেয়েদের একই অবস্থা।"

হালিমার মত এমন অনেক মেয়ে আছে - যাদের হয়ত পড়াশোনা শেষ করে নিজের একটা কিছু করার তীব্র ইচ্ছা আছে। কিন্তু অনেকেরই পরিবারের চাপে নিজের সেই আকাঙ্খাকে শেষ করে দিতে হয়। উপরন্তু যোগ হয় পরিবারে, অন্যদের নতুন নতুন চাহিদা মেনে নেওয়ার জন্য নিজের সাথে নিজের যুদ্ধ।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন:

বিশ্বব্যাংক বলছে মাত্র ছয়টি দেশে নারী পুরুষের সমতা আছে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বিশ্বব্যাংক বলছে মাত্র ছয়টি দেশে নারী পুরুষের সমতা আছে

বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে নারী বৈষম্যের মাপকাঠিতে বাংলাদেশের সার্বিক স্কোর এসেছে ৪৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ, যা খুবই নিচের দিকে।

এতে আটটি সুচকে দেখানো হয়েছে বাংলাদেশের মেয়েদের পরিস্থিতি। সেখানে যেমন রয়েছে সম্পত্তির অধিকার, বিয়ে করা, বা সন্তান নেয়ার মত বিষয়, তেমন রয়েছে যে কোন প্রতিষ্ঠানে চাকরি লাভের সুযোগের মত দিকগুলো।

পড়াশোনা শেষ করে একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন সিনথিয়া ইসলাম - চাকরির আশায়। কিন্তু কেন তিনি চাকরি পাননি - সেটা বর্ণনা করছিলেন।

তিনি বলছিলেন, "আমি পড়াশোনা শেষ করে একটি কল সেন্টারে ট্রেনিং নেই। সেন্টারের নামটা আমি বলতে চাচ্ছি না। তারা বলেছিল ট্রেনিং শেষ হওয়ার পর বিভিন্ন স্থানে তারা চাকরির জন্য আমাদের সিভি পাঠাবে।"

"যেটা দেখা গেল, আমাদের মেয়েদের কাছে চাকরির অফার আসতো। আমরা ইন্টারভিউ দিতাম। তারা বলতো নাইট শিফট করতে হবে। সেটাতেও রাজি ছিলাম।"

তিনি বলছিলেন, নাইট শিফট করতেও তাদের কোন অসুবিধা ছিল না। "কিন্তু দেখা গেল - আমাদের ব্যাচের অধিকাংশ ছেলের চাকরি হলো, কিন্তু মেয়েদের হলো না।"

"ট্রেনিং এর সময় আমরা মেয়েরা বেশি ছিলাম এবং আমাদের পারফরমেন্স ভালো ছিল। যেসব ছেলেরা চাকরি পেয়েছে তাদের কাছ থেকে জেনেছি, চাকরিদাতারা মেয়েদের নিতে ভরসা পায় না। এটা তো অবশ্যই একটা বড় জেন্ডার ডিসক্রিমিনেশন।"

অনেক নারী প্রশিক্ষণ নেয়ার পর কাজ পান না

ছবির উৎস, NURPHOTO

ছবির ক্যাপশান, অনেক নারী প্রশিক্ষণ নেয়ার পর কাজ পান না

পশ্চিম রাজাবাজারে কর্মজীবী নারীদের নিয়ে গড়া একটা প্রতিষ্ঠানে। ভবনের চারতলায় অফিসের একটি রুমে নানা পেশার কর্মজীবী মেয়েদের প্রশিক্ষণ চলছে।

প্রতিষ্ঠানটির প্রধান রোকেয়া রফিক, যিনি একজন সমাজকর্মী এবং চাকরীদাতা। তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম কেন মেয়েদের সার্বিক ভাবে এই বৈষম্যের শিকার হতে হচ্ছে।

তিনি বলছিলেন, "আমি চাকরিদাতা হিসেবে আমার সহকর্মীদের কাছ থেকে শুনেছি, ..'আরে এই মেয়েটাকে নিলে তো কিছুদিন পর বিয়ে করবে, তারপর বাচ্চা...নানা রকমের ঝামেলা। তার চেয়ে একটা ছেলেকে নিয়োগ দেয়া ভালো' - এই ধরণের কথা। নারীর সেই পরিবেশ নেই কাজ করার, তারপরে তার কাজকে স্বীকৃতি দিতে চান না তার নিজের প্রতিষ্ঠান বেশির ভাগ ক্ষেত্রে। তার সফলতা আনার জন্য, কর্মক্ষম করার জন্য যে সুযোগ সৃষ্টি বা চেষ্টা নেয়া দরকার সেটা নেয়া হয় না।"

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রায় তিন বছর হল কাজ করছেন একজন নারী। তার অফিসে কথা বলার পরিবেশ না থাকায়, আমরা একটা রেস্টুরেন্টে বসে কথা বললাম।

মেয়েটির চোখে মুখে ইতিমধ্যে হতাশার ছাপ স্পষ্ট। কারণ তার অফিসে বেতন এবং পদোন্নতির ক্ষেত্রে তিনি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন বলে মনে করছেন।

মেয়েটি বলছিলেন, "আমি আড়াই বছর সাংবাদিকতা করে যখন নতুন একটা প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করলাম আমার বেতন তখন সাড়ে ১৩ হাজার টাকা, কিন্তু একটা ছেলে যার পড়াশোনা শেষ হয়নি, একেবারেই অনভিজ্ঞ, সে একই সময়ে ঢুকলো, তার বেতন হলো ১৬ হাজার টাকা"

তিনি এর পিছনে দুটি কারণ রয়েছে বলে মনে করেন।

যেসব দেশে নারী পুরুষের সমান অর্থনৈতিক অধিকার আছে (সূত্র: বিশ্ব ব্যাংক)
ছবির ক্যাপশান, যেসব দেশে নারী পুরুষের সমান অর্থনৈতিক অধিকার আছে (সূত্র: বিশ্ব ব্যাংক)

"এখানে আমার মনে হয়েছে আমি মেয়ে বলে আমাকে কম বেতন দেয়া হয়েছে। নতুবা ঐ ছেলেটা লবিং আছে যেটা আমার নেই। আমি যখন চ্যালেঞ্জিং কাজ করতে চাই এবং কর্মকর্তাদের বলি তখন তারা বলে এটা তুমি পারবে না, তারা ছেলে কলিগদের দিয়ে করায়, বছর শেষে পদোন্নত্তি তারা পেয়ে যায়"।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী
ছবির ক্যাপশান, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী

'নারী, ব্যবসা ও আইন ২০১৯ শীর্ষক' এই প্রতিবেদনটি তৈরির জন্য বিশ্বব্যাংক গত ১০ ধরে বিশ্বের ১৮৭ টি দেশে পর্যবেক্ষণ চালিয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশে ২০১২ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত একই স্কোর - ৪৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ অর্থাৎ অবস্থার উন্নতি হয়নি।

এদিকে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার অন্তত ১০ বছর ধরে নারীদের উন্নয়নের বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। তাহলে কেন এই পরিস্থিতি?

শিশু ও নারী এই মন্ত্রণালয়টি এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর আ্ওতায় রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সাবেক তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী বলছিলেন, নারীদের সার্বিক অবস্থানে আগের চেয়ে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। তবে পুরুষের সমান হতে পারেনি।

মি. চৌধুরী বলছিলেন, "যেহেতু আমরা মুসলমান অধ্যুষিত রাষ্ট্র। এবং সমাজ ব্যবস্থা এক সময় পুরুষশাসিত ছিল। সেখানে স্বাভাবিক ভাবে নারীদের পশ্চাৎপদ করে রেখে দেয়া হয়েছিল আমাদের সামাজিক অবস্থানের কারণে।"

"সেখান থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নারীদের টেনে নিয়ে এসেছেন। আপনি দেখেন ৩৩% বেসরকারি চাকরি নারীদের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একেবারে তৃণমূল পর্যায়ে নারীদের অর্থনৈতিক দিক দিয়ে স্বাবলম্বী করার কাজ করা হচ্ছে" - বলেন মি. চৌধুরী।

কিন্তু তারপরেও সার্বিক যে স্কোর সেটা ৫০ হতে পারতো, সেটা কেন হয় নি? প্রশ্ন করলাম তাকে।

ইকবাল সোবহান চৌধুরী বললেন, এই স্কোর তারা কিভাবে করেছেন সেটা তাদের বিষয়। কিন্তু বাস্তবভিত্তিক যদি আমরা দেখি তাহলে এই স্কোর আরো অনেক বেশি হওয়া উচিত ছিল। নারীকে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন না নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের আজকে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে।

প্রশ্ন করলাম, আপনারা কি মনে করেন বাংলাদেশের নারীরা সার্বিক দিক থেকে উন্নতি করেছে? পুরুষের সমান বা কাছাকাছি কি হতে পেরেছে?

"অতীতের তুলনায় আমি বলবো তারা অনেক অগ্রসর হয়েছে। তবে বৈষম্য আছে, পুরুষের সমান হতে পারেনি" বললেন মি. চৌধুরী।

যদিও বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের যে অবস্থান এসেছে - বাংলাদেশের সরকার বলছেন সেটাকে বাস্তবতার নিরিখে করলে আরো ভালো অবস্থান হতো বাংলাদেশের।

কিন্তু সেটার চেয়ে বড় কথা হলো, আসলেই নারীদের সার্বিক পরিস্থিতি কতটা পালটেছে। আর সেই বৈষম্যের চিত্র কিছুটা হলেও উঠে এসেছে এই নিয়ে বিভিন্ন জনের কথায়।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন: