ভারতের বিমান থেকে চালানো হামলার জায়গা নিয়ে বিভ্রান্তি কীসের?

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
- Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি
পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে বালাকোট একটি ছোট পাহাড়ি শহরের নাম।
২০০৫ সালের অক্টোবরে বিধ্বংসী এক ভূমিকম্পে গোটা শহরটা প্রায় মাটির সঙ্গে মিশে গিয়েছিল।
কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণরেখা থেকে এই বালাকোট প্রায় সত্তর-আশি কিলোমিটার দূরে। ভারত থেকে আকাশপথে গেলে পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীর পেরিয়ে তারপর এই বালাকোটে ঢুকতে হবে।
আবার পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের ভেতরেও বালাকোট নামে খুব ছোট একটি একটি গ্রাম আছে।
বালাকোট নামে এই গ্রামটি আবার কাশ্মীরে নিয়ন্ত্রণরেখার খুব কাছেই, ভারতের দিক থেকে মাত্র অল্প কয়েক মাইল দূরে।
মঙ্গলবার সকালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মেজর জেনারেল আসিফ গফুর টুইট করে জানিয়েছিলেন, তাদের যুদ্ধবিমান ভারতীয় জেটগুলোকে তাড়া করার পর 'বালাকোটের কাছে' তারা নিজেদের পেলোড ফেলে পালিয়ে গেছে।

ছবির উৎস, মেজর জেনারেল আসিফ গফুর/টুইটার
কিন্তু এই বালাকোট ঠিক কোথায়, তা তিনি নির্দিষ্ট করে কিছু বলেননি।
ফলে ভারতীয় বিমান পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের ভেতরেই ছিল - না কি সেটা টপকে খাইবার পাখতুনখোয়াতেও ঢুকে পড়েছিল তা নিয়ে একটা বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
একটু বেলার দিকে দিল্লিতে ভারতীয় বিমান বাহিনীর সূত্রে বিবিসিকে জানানো হয়, খাইবার পাখতুনখোয়ার বালাকোটে জইশ-ই-মহম্মদের একটি জঙ্গী ঘাঁটিই ছিল তাদের আক্রমণের নিশানা।
ইসলামাবাদ থেকে বিবিসি-র সংবাদদাতা ইলিয়াস খানও জানাচ্ছেন, যে বালাকোটের কাছে হামলা চালানো হয়েছিল সেটি খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশেই।
ইলিয়াস খান বলছেন, "এই বালাকোট শহরটা খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে মানশেরা জেলার একটা সাবডিভিশন। একেবারে পার্বত্য এলাকা, ভূমিকম্পের পর শহরটাকে আবার ধীরে ধীরে গড়ে তোলা হয়েছে।"

ছবির উৎস, Getty Images
"আর এটাও আমরা জানি ওই পাহাড়ি এলাকার আশেপাশে জইশ-ই-মহম্মদের অনেক প্রশিক্ষণ শিবির আছে।"
"যে পাহাড়টাকে ঘিরে তাদের শিবিরগুলো, সেটার নাম জাব্বা টপ।"
তিনি আরও জানাচ্ছেন, বালাকোট ও মানশেরার স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তারাও নাম প্রকাশ না-করার শর্তে স্বীকার করেছেন, এলাকার বহু লোকজন স্থানীয় সময় রাত তিনটে থেকে চারটের মধ্যে প্রবল বিস্ফোরণের আওয়াজ পয়েছেন।
ঠিক কী ঘটছে, তা জানতে তারা অনেকে না কি স্থানীয় থানায়-পুলিশে ফোনও করেছিলেন।
এমন কী, সে সময় অন্তত একটি মিসাইল বা ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে বলেও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানাচ্ছেন।
আরো পড়ুন:

ছবির উৎস, Getty Images
বিবিসি উর্দুর সংবাদদাতা জুবেইর খানও জানাচ্ছেন, জাব্বি, গঢ়ি হবিবুল্লাহ আর বালাকোট - এই তিনটে শহর থেকেই বাসিন্দারা ভোররাতে খুব জোরে বিস্ফোরণের শব্দ পেয়েছেন।
আর এই তিনটে শহরই মানশেরা জেলায়।
বালাকোটের পুলিশ কর্মকর্তারা আরও বলছেন, ঠিক কী ঘটছে সেটা বুঝতে তারা যখন জাব্বা টপের দিকে এগোচ্ছিলেন, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা তাদের সেদিকে যেতেই দেননি।
ততক্ষণে পুরো জাব্বা টপ পাহাড় ও তার আশেপাশের এলাকা ঘিরে ফেলা হয়েছিল।
বালাকোটে জইশের শিবির নিয়ে যা জানা যাচ্ছে
এদিকে দিল্লিতেও ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব বিজয় গোখলে তার সাংবাদিক সম্মেলনে দাবি করেন, বালাকোটে জইশ-ই-মহম্মদের সবচেয়ে বড় যে জঙ্গী প্রশিক্ষণ শিবির আছে সেটিকেই এদিন সকালে ভারতীয় সেনা ধ্বংস করেছে।
তিনিও বলেন, ওই প্রশিক্ষণ শিবিরটি ছিল একটি পাহাড়ের ওপর। আশেপাশে কোনও বেসামরিক মানুষজন ছিল না বলেও তিনি দাবি করেন।

ছবির উৎস, Getty Images
ভারতীয় সূত্রগুলি আরও বলছে, বালাকোটে জইশের ওই শিবিরটি পরিচালনা করতেন মওলানা ইউসুফ আজহার, যিনি 'ওস্তাদ ঘাউড়ি' নামেও পরিচিত।
পারিবারিক সম্পর্কে তিনি আবার জইশ-ই-মহম্মদের প্রতিষ্ঠাতা মওলানা মাসুদ আজহারের শ্যালক।
১৯৯৯ সালে কাঠমান্ডু থেকে ছিনতাই হওয়া ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের একটি বিমানের যাত্রীদের বিনিময়ে এই মাসুদ আজহারকে কান্দাহারে ভারত মুক্তি দিয়েছিল।
পাকিস্তানের ভাওয়ালপুরে অবস্থিত জইশের সদর দফতর থেকেই তিনি মূলত ওই সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকেন।

ছবির উৎস, Getty Images
বালাকোটে জইশের বৃহত্তম শিবিরটির ভার ছিল অবশ্য মওলানা ইউসুফ আজহারের হাতেই।
ভারতের সূত্রগুলো বলছে, এই শিবিরে আত্মঘাতী জঙ্গী হামলার জন্য 'ফিদায়েঁ'-দের তালিম দেওয়া হচ্ছিল।
খুব শিগগিরি ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বড় মাপের আত্মঘাতী হামলার প্রস্তুতি চলছে-এমন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই বালাকোটের ওই শিবিরে আগাম সতর্কতামূলক হামলা (প্রিএম্পটিভ অ্যাটাক) চালানো হয়েছে বলে ভারত দাবি করেছে।
ওই হামলায় ঠিক কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা এখনও একেবারেই স্পষ্ট নয় - কিন্তু এরই মধ্যে খবরের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়াতে অবস্থিত বালাকোট।








