পাবনায় কুমির উদ্ধারে শুরু হয়েছে তৎপরতা

পাবনায় পদ্মা নদীর একটি শাখায় ঘুরে বেড়াচ্ছে কুমিরটি

ছবির উৎস, AHMED HUMAYUN KABIR TAPU

ছবির ক্যাপশান, পাবনায় পদ্মা নদীর একটি শাখায় ঘুরে বেড়াচ্ছে কুমিরটি

অবশেষে বাংলাদেশের পাবনার পদ্মা নদীর চরে আটকে পড়া কুমিরটি উদ্ধারে উদ্যোগ নিয়েছেন দেশের দুই জন কুমির বিশেষজ্ঞ।

তারা হলেন বাংলাদেশের প্রথম কুমিরের খামার রেপটাইলস ফার্ম লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুশতাক আহমেদ এবং আকিজ ওয়াইল্ড লাইফ লিমিটেড নামে আরেকটি কুমিরের ফার্মের ইনচার্জ আদনান আজাদ।

কুমিরটি উদ্ধারে এরইমধ্যে তারা পাবনা সদর উপজেলার দোগাছি ইউনিয়নের চর কোমরপুরে পৌঁছে গেছেন।

তাদের সঙ্গে আছেন বনবিভাগ ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা- আইইউসিএন এর কয়েকজন প্রতিনিধি।

উদ্ধার কাজ বেশ জটিল:

তবে এই উদ্ধার করা বেশ কঠিন হবে বলে মনে করছেন মুশতাক আহমেদ।

কেননা কুমিরটি আটকা পড়েছে পদ্মা নদীর মধ্যে একটি চরের মাঝখানে বড় জলাধারের মতো জায়গায়। যা প্রায় দেড় হাজার ফুট লম্বা এবং ৩০০ ফুট চওড়া। গভীরতাও ২৪ থেকে ৩০ ফুটের মতো।

বিবিসি বাংলাকে মুশতাক আহমেদ বলেন, "পরিস্থিতিটা আসলে খুবই ডিফিকাল্ট। এতো ওয়াইল্ড সিচ্যুয়েশনে এতোটা গভীর পানি থেকে কুমিরটিকে উদ্ধার করা আসলেও কঠিন। তারমধ্যে আবহাওয়াও অনুকূলে নেই। যদি সূর্যের কিরণ থাকতো তাহলে কুমিরটা হয়তো ভেসে উঠত।"

আরও পড়তে পারেন:

পাবনায় কুমির উদ্ধারে শুরু হয়েছে তৎপরতা

ছবির উৎস, মুশতাক আহমেদ

ছবির ক্যাপশান, পাবনায় কুমির উদ্ধারে শুরু হয়েছে তৎপরতা

প্রায় কয়েক সপ্তাহ আগে চরের তীর ঘেঁষা পদ্মা নদীতে দেখা যায় মাঝারি আকারের ওই কুমির।

যা দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন স্থানীয় গ্রামবাসী ও জেলেরা। এরপর থেকেই ভয়ে আর কেউ ওখানে মাছ ধরতে যাচ্ছেন না।

এ অবস্থায় কুমিরটি উদ্ধারে বিশালাকার একটি জাল ফেলার কথা জানিয়েছেন মুশতাক আহমেদ। যেন পানি ছেকে কুমিরটিকে তীরের একপাশে নিয়ে আসা যায়।

এ ব্যাপারে মুশতাক আহমেদ বলেন, "কুমিরটা যদি ভেসে থাকতো তাহলে আমার জন্য সেটা ধরা কোন বিষয়ই ছিল না। কুমিরটা এতো গভীর পানিতে থাকার কারণে আমরা আইইউসিএনকে এতো বড় জাল বানাতে বলেছি। আমি পুরো এলাকা ঘুরে কুমিরটির তীরে ওঠার কোন চিহ্ন পাইনি।"

কুমিরটি সরিয়ে নেয়ার প্রয়োজন ছিল না:

মুশতাক আহমেদ মনে করেন যে কুমিরটিকে এখান থেকে সরিয়ে নেয়ার কোন প্রয়োজন ছিলনা।

কারণ চরটি থেকে লোকালয়ের দূরত্ব প্রায় তিন থেকে চার কিলোমিটার দূরে, তাই কুমিরটি কারও জন্য হুমকির কারণ হতো না। তাছাড়া এই জাতের খুব একটা হিংস্র নয়।

তাছাড়া এই পরিবেশটি সরিসৃপ প্রাণীটির প্রাকৃতিক বিচরণের জন্য যথেষ্ট উপযোগী বলে তিনি জানান।

কুমিরটি উদ্ধারে দুই কুমির বিশেষজ্ঞ অভিযানে নেমেছেন।

ছবির উৎস, জেনিফার আজমেরি

ছবির ক্যাপশান, কুমিরটি উদ্ধারে দুই কুমির বিশেষজ্ঞ অভিযানে নেমেছেন। (বাঁয়ে মুশতাক আহমেদ, ডানে আদনান আজাদ)

কুমিরটি এলো কিভাবে?

মুশতাক আহমেদের ধারণা যে কুমিরটি পদ্মা নদী থেকে ভেসে এসে এখানে আটকা পড়েছে। এবং প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে বিচরণ করছে।

বর্ষার সময় চরটি পানির নীচে থাকলেও বর্তমানে শুষ্ক মৌসুমের কারণে চর জেগে ওঠায় কুমিরটি এখন আর নদীতে যাওয়ার পথ পাচ্ছেনা।

তবে বর্ষা এলে এই চরটি পদ্মার সঙ্গে সংযুক্ত হলে কুমিরটি আপনা আপনি ভেসে যেতো বলে জানান তিনি।

প্রাণীটি ঝুঁকির মুখে রয়েছে:

কুমিরটি কারও জন্য ক্ষতির কারণ না হলেও স্থানীয় প্রশাসন কোন ঝুঁকি নিতে চাইছেন না।

কারণ যখনই এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে যে এখানে কুমির আছে, তারপর থেকে চরটিতে অসংখ্য মানুষ ভিড় করছে বলে তিনি জানান।

এমনকি প্রতিকূল আবহাওয়া এবং রাস্তাঘাটের বেহাল দশার মধ্যেও উৎসুক জনতার কোন কমতি নেই।

তবে এতো মানুষ থাকায় পুলিশের সহায়তা চাইতে বাধ্য হন তারা। কারণ তাদের আশঙ্কা কুমিরটি উদ্ধারের সাথে সাথে ঢিল পাটকেল ছুড়ে কুমিরটিকে আহত না হলে মেরে ফেলা হতে পারে।

কুমির দেখতে আসা উৎসাহী জনতা।

ছবির উৎস, মুশতাক আহমেদ

ছবির ক্যাপশান, কুমির দেখতে আসা উৎসাহী জনতা।

এটি কোন প্রজাতির কুমির?

কুমিরটির ছবি আর ভিডিও দেখে মুশতাক আহমেদ ধারণা করছেন যে এটি প্রাপ্তবয়স্ক ফ্রেশ ওয়াটার ক্রকোডাইল বা স্বচ্ছ পানির কুমির এবং এর দৈর্ঘ্য পাঁচ থেকে ছয় ফুটের মতো।

বাংলাদেশের নদীতে ঘড়িয়াল থাকলেও এই ধরণের কুমির বেশ বিরল। যেটা কিনা গত পঞ্চাশ বছরেও দেখা যায়নি।

১৯৫৯ সাল থেকে বাংলাদেশের নদীতে মিঠা পানির কুমির বিলুপ্ত বলে মনে করা হয়।

তবে ২০১৫ সালে মাগুরায় একটি মিঠাপানির কুমির পাওয়া গিয়েছিল। গ্রামবাসীদের ধরা সেই কুমিরটিকে সুন্দরবনের করমজল এলাকায় কুমির প্রজনন কেন্দ্রে নিয়ে রাখা হয়।

প্রকৃতিতে এরপর এই দ্বিতীয় কুমিরটির সন্ধান মিললো।

কুমিরটি ভারত থেকে ভেসে এসেছে বলে ধারণা করছেন পরিবেশ বিজ্ঞানীরা।

কুমিরটি উদ্ধারের পর কি করা হবে?

এর আগে বনবিভাগের কয়েকজন প্রতিনিধি ঘটনাস্থল থেকে কুমিরটিকে উদ্ধারে গেলেও তারা ব্যর্থ হন।

কেননা বনবিভাগের আলাদা করে কোন প্রাণী বিশেষজ্ঞ নেই। তাই তারা -আইইউসিএন এর কাছে সহায়তা চায়।

কুমিরটি উদ্ধারে জাল ফেলা হচ্ছে।

ছবির উৎস, মুশতাক আহমেদ

ছবির ক্যাপশান, কুমিরটি উদ্ধারে জাল ফেলা হচ্ছে।

তারপর আইইউসিএন ওই দুই কুমির বিশেষজ্ঞের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদেরকে উদ্ধারকাজ পরিচালনার দায়ভার দেয়।

উদ্ধারের পর এই কুমিরটিকে বনবিভাগের কাছে হস্তান্তরের কথা জানান মুশতাক আহমেদ।

পরে কুমিরটির নিয়মানুযায়ী চোখ ঢেকে, এবং মুখ ও পা বেঁধে আর্দ্র অবস্থায় গাড়ি করে নিয়ে কোন একটি চিড়িয়াখানায় পাঠিয়ে দেয়ার কথা রয়েছে।