সংসদ নির্বাচন: খুলনা-২ আসনের তরুণ ভোটারদের অনেকেই উদ্বিগ্ন নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে

- Author, রাকিব হাসনাত
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
প্রচার প্রচারণায় এখন অনেকটাই সরগরম হয়ে উঠেছে খুলনা সদর ও সোনাডাঙ্গা নিয়ে গঠিত খুলনা-২ আসন।
দেশের দক্ষিণাঞ্চলের রাজনীতি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র খুলনার এ আসনটির জন্য এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন সাতজন প্রার্থী, যার মধ্যে রয়েছেন দশ বছর পর সংসদ নির্বাচনে ফিরে আসা বিএনপি জোটের প্রার্থীও।
বিএনপি প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন ২০০৮ সালের নির্বাচন অল্প ভোটে জয়ী হওয়া নজরুল ইসলাম মঞ্জু, যিনি তার দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক।
অন্যদিকে ২০০৮ সালের নির্বাচনে অল্প ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হলেও ২০১৪ সালের বিএনপি বিহীন নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের মিজানুর রহমান।
কিন্তু তার বদলে আওয়ামী লীগ এবার প্রার্থী হিসেবে বেছে নিয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই শেখ সালাউদ্দিন জুয়েলকে, যিনি মূলত ব্যবসায়ী হিসেবেই পরিচিত এবং এবারই প্রথম তিনি নির্বাচন করছেন।
নির্বাচন এবার কেমন হবে?
স্বাধীনতার পর খুলনা-২ আসনে আওয়ামী লীগ মাত্র দু'বার জয় পেয়েছিলো - ১৯৭৩ ও ২০১৪ সালে।
কয়েক দশকের ভোটের প্রবণতা, স্থানীয় রাজনীতি আর বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে টিআইবির খুলনা শাখার সভাপতি আনোয়ারুল কাদির বলছেন এবারের নির্বাচনেও তুমুল লড়াইয়ের আভাস পাচ্ছেন তিনি।
তার মতে, "দু জন প্রার্থীরই ব্যক্তিগত ইমেজ ভালো। এর মধ্যে একজন বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্য। তবে দুজনের ইমেজ অত্যন্ত ক্লিন। তাই দুজনের মধ্যে কাউকে বেছে নেয়াটা ভোটারদের জন্যও একটা চ্যালেঞ্জ হবে"।
খুলনা নাগরিক সমাজের সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব কুদরত ই খোদা বলছেন এবার নির্বাচনে এবার প্রভাবকের ভূমিকা পালন করবেন তরুণ ভোটাররাই।

মানুষের কী প্রত্যাশা নির্বাচন নিয়ে?
খুলনা শিববাড়ী মোড়ে কথা হলো নাট্যকর্মী নীলাঞ্জনা নিলুর সাথে। তিনি বলেন, এক সময় নগরীতে সন্ত্রাস ছিলো কিন্তু গত কয়েক বছরে সেই সমস্যা কেটেছে। তাছাড়া উন্নয়নটাও বেশ দৃশ্যমান বলে মনে করেন তিনি।
আবার আদালত চত্বরে একজন ভোটার বলেন, "এখানে ভোটাররা সবসময় যাকে কাছে পায় তাকেই ভোট দেবে। এখানকার রাজনীতির গতিপ্রকৃতি দেখলেই এটি পরিষ্কার হয়ে যাবে"।
শিববাড়ী মোড়ে ইভিএম দেখতে আসা এক ব্যক্তি বিবিসি বাংলাকে বলেন, "খুলনার যেখানেই যাবেন সরকারি দলের প্রার্থীর পোস্টার দেখবেন। বিরোধী দলের কিছু দেখা যায়না। এটা থেকে তো বোঝা যায় নির্বাচনটাই কেমন হচ্ছে। এমন পরিবেশের নির্বাচন থেকে আপনি আশা করবেন কি করে"।

বিএনপি বলছে জাতীয় ইস্যুই এখানে মুখ্য
২০০৮ সালে সব দলের অংশগ্রহণে সর্বশেষ যে জাতীয় নির্বাচন হয়েছিলো তাতে অংশ নিয়ে এ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মিজানুর রহমানকে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে মাত্র হাজার দেড়েক ভোটের ব্যবধানে হারিয়েছিলেন বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু।
এবারো তিনি বিএনপি জোটের প্রার্থী।
শহরে আদালত এলাকায় প্রচারণা চালানোর সময় বিবিসি বাংলা'র সাথে কথা বলেন তিনি।
মিস্টার ইসলাম বলেন "গত দশ বছরের দু:শাসনের জবাব দেবে মানুষ। হাজার হাজার কোটি টাকা লুট, নির্যাতন, খালেদা জিয়া জেলে, দুর্নীতি- এসব বিষয়ের জবাব দেবে ভোটাররা। এখন আর স্থানীয় ইস্যু বলতে কিছু নেই। ভোটাররা বোঝে সরকার পরিবর্তন না হলে অবস্থার পরিবর্তন হবেনা"।
তিনি দাবি করেন যে জাতীয় ইস্যুতে জনমনে সরকার বিরোধী মনোভাবের কারণে ভোট সুষ্ঠু হলে তিনি এবারো সহজেই নির্বাচিত হবেন।

শেখ জুয়েলের দাবি দল এখন ঐক্যবদ্ধ
আওয়ামী লীগ প্রার্থী শেখ সালাহউদ্দিন জুয়েল এবারই প্রথম নির্বাচন করছেন এবং রাজনীতিতে তার সম্পৃক্ততাও এর আগে দেখা যায়নি।
আসনটি গত পাঁচ বছর সংসদ সদস্য ছিলেন মিজানুর রহমান কিন্তু তিনি এবার দলীয় মনোনয়ন ফরমই তুলেননি।
অন্যদিকে এ আসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে খুলনার মেয়রেরও।
বর্তমানে মেয়র হিসেবে আছেন আওয়ামী লীগের তালুকদার আব্দুল খালেক এবং তিনি শেখ সালাউদ্দিন জুয়েলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।
দলীয় সূত্রগুলো বলছেন মিজানুর রহমানকে সরাতেই শেখ জুয়েলকে রাজনীতিকে সক্রিয় করেছেন আওয়ামী লীগের স্থানীয় একটি অংশ।
আর প্রধানমন্ত্রী পরিবারের হওয়াতে মিস্টার রহমান বা তার অনুসারী নির্বিবাদেই সেটি মেনে নিয়েছেন।
শহরের ময়লাপোতা এলাকায় নিজের বাসায় বসে বিবিসি বাংলাকে শেখ সালাহউদ্দিন জুয়েল বলেন, "বঙ্গবন্ধু পরিবারের আমরা যখন নির্বাচন করি তখন সবাই এক থাকে"।
তিনি বলেন , "মংলা বন্দর সচল হয়েছে, ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে খুলনার। এসব কারণেই মানুষ এবার নৌকায় ভোট দেবে"।

উদ্বেগ আছে নির্বাচন নিয়েই
তরুণ ভোটারদের একজন নূপুর রহমান বলছেন তাদের অনেকেই উদ্বিগ্ন নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে।
"আমরা ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ভালো ভাবে যেনো ভোট দিতে পারি। এখন পর্যন্ত হয়তো সহিংসতা নেই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেমন থাকে তা নিয়ে সবাই উদ্বিগ্ন"।
শিববাড়ী মোড়েই রাস্তার পাশে নিয়মিত বসেন জ্যোতিষী আব্দুল মজিদ।
তিনি বলছেন, "মেয়র নির্বাচনে অনেকে ভোট দিতে পারেনি। সে কারণেই উদ্বেগ আছে এবার কি হয়"।
আর এমন উদ্বেগ সরকারি দলের কর্মী সমর্থক ছাড়া, কম বেশি আর সব শ্রেণী পেশার মানুষের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে যদিও প্রকাশ্যে অনেকেই এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজী হননি।

২০০৮ সালের নির্বাচনে প্রধান দুই দলের ফল
২০০৮ সালের নির্বাচনে এ আসনের ৮০ভাগ ভোটার দিয়েছিলো।
এতে বিএনপির নজরুল ইসলাম মঞ্জু ৯০৯৫০ ভোট এবং আওয়ামী লীগের মিজানুর রহমান মিজান পেয়েছিলেন ৮৯৩৮০ ভোট।
আর ২০১৪ সালের নির্বাচনে মিজানুর রহমান জিতেছিলেন বিপুল ভোটে। সে নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি।
মোট প্রার্থী সাত জন
এই আসনের অপর প্রার্থীরা হলেন:
এইচ এম শাহাদৎ(সিপিবি)
এস এম সোহাগ (বিএনএফ)
এম ইদ্রিস আলী বিল্টু (জাকের পার্টি)
মনিরা বেগম (গণফ্রন্ট)
মো: আ: আউয়াল (ইসলামী আন্দোলন) ।








