সংসদ নির্বাচন: কুমিল্লা-৯ আসনে যে বিষয় ভোটারদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ

- Author, সাইয়েদা আক্তার
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
কুমিল্লা-৯ আসনটি লাকসাম এবং মনোহরগঞ্জ এই দুইটি উপজেলা নিয়ে। ভোটারদের বেশির ভাগই গ্রামীণ ভোটার।
লাকসামের খিলা গ্রামে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশের চায়ের দোকানে সকাল আটটা থেকেই জমতে শুরু করেছে ভিড়।
ভেতরের বেঞ্চগুলোতে বসে চায়ে ডুবিয়ে গরম পরোটা খেতে খেতে বিভিন্ন বয়সের কয়েকজন গল্পগুজব করছিলেন। বিষয় নির্বাচন।
ভোটের পরিবেশ নিয়ে চিন্তা
বাড়ির কাছে বলে দোকানে নাস্তা করতে এসেছেন অশীতিপর আব্দুল হামিদ।
কবে থেকে ভোট দেন, সন তারিখ বলতে পারেননি। কিন্তু ফাতেমা জিন্নাহ যে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন, সেইবার প্রথম ভোট দিয়েছিলেন মিঃ হামিদ।
মুহম্মদ আলী জিন্নাহর বোন ফাতিমা জিন্নাহ ১৯৬৫ সালে সামরিক শাসক আইয়ুব খানের বিপক্ষে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন।
মিঃ হামিদ সব সময় ভোট দিতে যান, এবারো যাবার ইচ্ছা আছে, তবে পরিবেশ শান্তিপূর্ণ না হলে তিনি যাবেন না
"ভোট দিতে যামু, তয় গন্ডগোল হইলে যামু না। ভোট দিতে গিয়া মাইর খামু নাকি! অনেক সময় কেন্দ্রে তো যাইতেও দেয় না। কোন উছিলা করি সবাইরে বাইর করি দেয়।"
কারা বের করে দেয় - এমন জিজ্ঞাসার জবাবে তিনি কোন উত্তর দেননি।

আরও পড়তে পারেন:
দোকানে বসা অন্য কয়েকজন আমাকে বলছিলেন, সর্বশেষ স্থানীয় নির্বাচনের সময় এখানকার কয়েকটি কেন্দ্রে এমন ঘটনা ঘটেছে।
যেকারণে নির্বাচনের পরিবেশ কেমন হবে, সেটাই তাদের প্রধান বিবেচ্য।
নতুন ভোটার -- আলাদা ইস্যু
সেখান থেকে লাকসামের নওয়াব ফয়জুন্নেসা সরকারি কলেজে গেলাম। বিশাল মাঠের এক পাশে সিমেন্টের বেঞ্চে বসেছিলেন কয়েকজন শিক্ষার্থী, কেউ ডিগ্রী পরীক্ষা দেবেন, কেউ অনার্সে পড়ছেন।
সবাই এবারই প্রথম ভোট দেবেন।
তাদের মূল দাবী: মেয়েদের নিরাপত্তা, এবং বেকারত্ব দূর করে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে সরকারকে---তাতে যে দলই সরকার গঠন করুক না কেন।
"যে দল উন্নয়ন করবে তাকে ভোট দেব আমরা। এখন আমরা আইসিটিতে অনেক এগিয়ে গেছি, আমাদের স্মার্টফোন আছে, আমরা গুগল, ফেসবুক সব দেখতে পারি-- সেটা যেন থাকে।"
"আমাদের চাহিদা হলো বেকারত্ব দূর করতে হবে। সেজন্য কোটা সংস্কার করা দরকার। আর পুরো বিষয়টাতে সরকারের নজর দেয়া দরকার।"

"রাস্তাঘাটে আলোর ব্যবস্থা নাই ঠিকমত, বিকাল সন্ধ্যার পর মেয়েরা চলাফেরাই করতে পারে না। ইভটিজিং হয়, আগে আরো বেশি হইত—এইটা সরকারকে বন্ধ করতে হবে।"
নির্বাচনের সমীকরণ
দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নদীপথে চট্টগ্রামে পন্য পরিবহনের একটি পুরনো রুট এখানকার ডাকাতিয়া নদী।
যেকারণে ডাকাতিয়া নদী সংলগ্ন কুমিল্লার লাকসাম এবং মনোহরগঞ্জ দুটি উপজেলাই অনেক বছর আগে থেকে ব্যবসায়িক কেন্দ্র বলে পরিচিত।
এর বাইরে এখানকার একটি বড় অংশের মানুষ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কাজ করেন। ফলে অর্থনীতির অবস্থা ভালো।
গত কয়েক দফা সংসদ নির্বাচনে ঘুরে ফিরে এই আসনে আওয়ামী লীগ বা বিএনপি জয়ী হলেও, স্থানীয় মানুষেরা জানিয়েছেন, একসময় এলাকাটিতে জামায়াতের বেশ প্রভাব ছিল, বিশেষ করে মনোহরগঞ্জে।
তবে, ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-৯ আসনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছিল, এবং জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়েছিল মাত্র ৪৫৮ ভোটে।
কিন্তু এরপরের দশ বছরে সেখানকার পরিস্থিতি কতটা পাল্টেছে?

স্থানীয়ভাবে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করে দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি, মজিবুর রহমান দুলাল, সেই কমিটির লাকসাম উপজেলার সভাপতি। তিনি বলছিলেন, এবারের নির্বাচনে যেই প্রার্থীই জিতবেন, ব্যবধান সামান্য হবে না।
"তখনকার মার্জিনটার বড় কারণ ২০০১-২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি জোট সরকার ক্ষমতায় ছিল, যে রেশটা ২০০৮ এর নির্বাচনেও ছিল।"
মজিবুর রহমান দুলাল বলেন, "ফলে অল্প ভোটের ব্যবধানে আওয়ামী লীগ জিতেছিল। এছাড়া, সেসময় দুই জোটেরই অভ্যন্তরীন কিছু যোগসাজশও নির্বাচনে বিএনপি হারার আরেকটি কারণ ছিল।"
"কিন্তু এখন পরিস্থিতি সেরকম না, গত ১০ বছরে এলাকার অনেক উন্নয়ন হয়েছে। আর অভ্যন্তরীন কোন্দলও দুই দলই অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে। ফলে যেই নির্বাচনে জিতবেন ফারাকটা অল্প হবে না বলেই মনে হয়।"
তবে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে এই আসনে জামায়াতের বিশেষ প্রভাব ছিল, যেটি বিশেষ করে গত পাঁচ বছরে কিছুটা কমে এসেছে।
স্থানীয় সাংবাদিক নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলছিলেন, এই প্রভাব কমার পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে স্থানীয় ব্যবসা-বানিজ্য নিয়ে দলটির নেতাদের প্রতি সাধারণ মানুষের বিরুপ প্রতিক্রিয়া।
"জামায়াতের স্থানীয় নেতাদের সুদের বিনিময়ে মহাজনী ব্যবসার প্রতারণার কারণে মানুষ অনেকটাই বিমুখ হয়ে গেছে তাদের ওপর।
তাছাড়া নেতাদের অনেকের নামে মামলা থাকার কারণে তারা এলাকাতেও নেই তেমন একটা। কিন্তু সার্বিকভাবে প্রভাব কমলেও এই আসনের দুই উপজেলাতেই জামায়াতের প্রভাব এখনো আছে।"
নির্বাচনের প্রস্তুতি
লাকসাম উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ইউনুস ভুইয়া জানিয়েছেন, নির্বাচনের জন্য তারা কয়েক মাস আগে থেকেই সাংগঠনিক প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন।
এজন্য দলের পক্ষ থেকে সরকারের করা নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে যেমন তুলে ধরা হচ্ছে, একই সাথে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে 'ছোট খাট' সমস্যা সমাধানের দিকেও মনোযোগ দেয়া হচ্ছে।
কিন্তু স্থানীয় বিএনপির প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে একটু ভিন্নভাবে।
দলটির নেতাকর্মীরা গ্রেপ্তার আতংক ও মামলাসহ সরকারের বিরুদ্ধে নানা ধরণের হয়রানির অভিযোগ করেছেন।
উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুল কালাম জানিয়েছেন, মানুষ সুষ্ঠুভাবে ভোট দিতে পারলে তার দল জয়ী হবে বলে তাদের বিশ্বাস।
এক্ষেত্রে সরকারী দলের নানা দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনাকে তুলে ধরবেন তারা প্রচারণায়।
এছাড়া যেহেতু তাদের নেতাকর্মীরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন, ফলে তাদের প্রতি এলাকার মানুষের সহানুভূতি রয়েছে বলে মিঃ কালাম মনে করেন, যেটি তাদের নির্বাচনে সহায়তা করবে।
নারী ভোটার
মনোহরগঞ্জের ইকবালনগরে একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের বাইরে অপেক্ষা করছিলেন ২০/২২ জন অভিভাবক, সবাই নারী।
কাছে এগিয়ে গিয়ে নিজের পরিচয় দিতেই একে একে সরে গেলেন প্রায় সব কয়জন।
কারণ জানতে চাইলে অপেক্ষমান নারীরা জানালেন, 'মিডিয়া'র সাথে কথা বলেছেন জানলে পরিবারে 'কটু কথা' শুনতে হবে।
যারা রয়ে গিয়েছিলেন, তাদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম নির্বাচন নিয়ে তাদের ভাবনা কী।
তাদের অধিকাংশই জানিয়েছেন, বাড়ির সবাই যে দল সমর্থন করে সেই দলের 'মার্কা'তেই তারা ভোট দেবেন।
দুইটি উপজেলাতেই নারী ভোটারের সংখ্যা পুরুষ ভোটারের প্রায় সমান সমান। তবে, পুরুষ ভোটারের একটি বড় অংশ প্রবাসী হওয়ায় নারীরা বেশি ভোট দেন—এমন ধারণা প্রচলিত আছে।
কিন্তু বেশিরভাগ সময় নারীরা পরিবারের পুরুষ সদস্যদের প্রভাবে ও পরামর্শে ভোট দেন বলে মনে করেন অনেকে।
কুমিল্লা-৯ আসনের প্রার্থী-দল-প্রতীক
১. মোঃ তাজুল ইসলাম—আওয়ামী লীগ—নৌকা
২. এম আনোয়ার উল আজিম---বিএনপি—ধানের শীষ
৩. মোঃ আবু বকর ছিদ্দিক---ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশ---চেয়ার
৪. সেলিম মাহমুদ---ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ---হাতপাখা+
৫. মুহাম্মদ আবদুল আওয়াল---বাংলাদেশ মুসলিম লীগ—হারিকেন
৬. এডভোকেট টিপু সুলতান---জাকের পার্টি---গোলাপ ফুল
৭. এটিএম আলমগীর---স্বতন্ত্র---গাড়ি








