সংসদ নির্বাচন: সব দল সমান সুযোগ পাচ্ছে কি?

সংসদ

ছবির উৎস, NurPhoto

ছবির ক্যাপশান, ডিসেম্বরের ৩০ তারিখে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
    • Author, আকবর হোসেন
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশে সমারিক শাসক এরশাদের পতনের পর প্রথমবারের মতো কোন দলীয় সরকারের অধীনে সাধারণ নির্বাচনে সবগুলো রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে।

ক্ষমতাসীনদের অধীনে সাধারণ নির্বাচন কতটা অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ হবে সেটি নিয়ে অনেক আগে থেকেই বিতর্ক রয়েছে।

নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে যাদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তারা কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে সেটি নিয়েও নানা সংশয় ছিল।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর তিন সপ্তাহ পার হয়েছে। নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশন তাদের ভূমিকা কতটা পালন করতে পারছে? এটি এখন বড় প্রশ্ন।

প্রায় দুই সপ্তাহ আগে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, নির্বাচনের সময় দায়িত্ব পালন করতে পারেন, এমন ব্যক্তিদের তালিকা পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা।

সে তালিকা ধরে পুলিশ আরো দু'মাস আগে থেকেই গোপনে তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে।

এ খবর প্রকাশিত হবার চারদিন পর আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক সভায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা পুলিশকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করতে নিষেধ করেছেন।

এতো গেল একটি উদাহরণ। বিরোধী দলের অভিযোগ হচ্ছে, তাদের অনেক নেতা-কর্মীরা এলাকায় প্রকাশ্যে থাকতে পারছেন না।

নির্বাচন

ছবির উৎস, MD.TAUHIDUZZAMAN/PID

ছবির ক্যাপশান, জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের সামনে বক্তব্য রাখছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা

আরো পড়তে পারেন:

প্রতিদিনই পুলিশ তাদের নেতা-কর্মীদের আটক করছে বলে বিএনপির অভিযোগ। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা এবং মনোনয়ন প্রত্যাশী শামা ওবায়েদ বলেন, প্রশাসন নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা মোতাবেক চলার কথা থাকলেও তারা আসলে সরকারের কথামতো চলছে।

এবারের নির্বাচনসহ ১৯৯১ সাল থেকে এ পর্যন্ত সাতটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

১৯৯৬ সালের ১৫ ই ফেব্রুয়ারি এবং ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি দুটি বিতর্কিত সাধারণ নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হলেও সেখানে বিরোধী দল অংশ নেয়নি।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে পুলিশ এবং প্রশাসন নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা মোতাবেক কাজ করার কথা। আইন সেটাই বলে।

কিন্তু বাস্তবতা সেরকম নয় বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক। নির্বাচন কমিশন তাদের কর্তৃত্ব কতটা প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাকে তিনি কিভাবে মূল্যায়ন করছেন?

ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন।

ছবির উৎস, বিবিসি বাংলা

ছবির ক্যাপশান, ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন।

মি: হোসেন বলেন, " মনে হচ্ছে নির্বাচনটা যেভাবেই হোক অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হচ্ছে। কিন্তু প্রতিযোগিতামূলক হবে কি না সেটা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।"

তিনি বলেন, ১০ বছর ধরে একটা সরকার ক্ষমতায় আছে। তাদের ইনফ্লুয়েন্স সব জায়গায় রয়ে গেছে।

ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় ডিজিটাল বিলবোর্ডে সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম প্রচার করা হচ্ছে।

একই সাথে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে নানা ধরনের বিজ্ঞাপনও প্রচার করা হচ্ছে।

নির্বাচনের আচরণবিধি অনুযায়ী এগুলো গ্রহণযোগ্য নয় বলে উল্লেখ করেন বিশ্লেষকরা। কিন্তু এসব বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা দৃশ্যমান নয়।

বিভিন্ন জায়গায় পোস্টার ব্যানার সরানোর নির্দেশনা দেয়া হলেও অনেক জায়গায় সেগুলো আগের মতোই রয়ে গেছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক দিলারা চৌধুরী মনে করেন নির্বাচন কমিশন তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না।

তিনি বলেন, "আস্থা অর্জন করার ব্যাপারে তাদের অনেক ঘাটতি আছে। নির্বাচন কমিশন নির্দেশ দিচ্ছে , কিন্ত পুলিশ সেটা শুনছে না।"

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী

ছবির উৎস, বিবিসি বাংলা

ছবির ক্যাপশান, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী

কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী এবং বর্তমান সংসদ সদস্যরা বলছেন, নির্বাচনে নিরপেক্ষ পরিবেশের কোন ঘাটতি তারা দেখছেন না।

১৯৯৬ সাল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত চারটি সাধারণ নির্বাচনে লড়ছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি।

তাঁর নির্বাচনী এলাকা মুন্সিগঞ্জে। তিনি দাবি করছেন, যেসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে মাঠ পর্যায়ে সেগুলোর কোন ভিত্তি নেই।

"প্রশাসনের পক্ষ থেকে সবার জন্য সমান অধিকার। অন্য প্রার্থীদের সাথে আমার কোন তফাত নেই। তফসিল ঘোষণার পর আমি আমার সাথে রাস্তায় কোন পুলিশ দেখিনি," বলছিলেন সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি।

এরই মধ্যে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট-এর দিক থেকে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করা হয়েছে।

ঐক্যফ্রন্ট-এর নেতা ড: কামাল হোসেন এরই মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনের পদত্যাগ দাবি করেছেন।

মামলার বিষয়ে বিএনপির তরফ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার ব্যক্তির তালিকা নির্বাচন কমিশনে দেয়া হয়েছে।

কিন্তু নির্বাচন কমিশন বলছে, এসব ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে দায়ের করা হয়েছিল।

বিএনপি অধিকাংশ আসনে আপাতত একাধিক প্রার্থী মনোনয়ন নিয়েছে। যাদের অনেকের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে।

একজন গ্রেফতার হলে যাতে আরেকজন মাঠে থাকতে পারেন, সেজন্যই এ ব্যবস্থা। এছাড়াও তাদের কিছু প্রার্থী রয়েছে ঋণ খেলাপির তালিকায়।

দলটি বলছে, তাদের মাঠ পর্যায়ের প্রার্থীরা নানামুখী চাপে রয়েছে, যার মধ্যে পুলিশের হয়রানি এবং গ্রেফতার আতঙ্ক সবচেয়ে বড় বিষয়।

নির্বাচন কমিশনের সচিব হেলালউদ্দিন আহমদ দাবি করছেন, সবকিছু কমিশনের নিয়ন্ত্রণেই আছে এবং সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই গ্রেফতার হচ্ছে।

তিনি বলেন, তফসিল ঘোষণার পর ফৌজদারী অপরাধে ওয়ারেন্ট-ভুক্ত কোন আসামি ছাড়া অন্য কাউকে গ্রেফতার করা যাবে না। এটা পুলিশকে নির্দেশনা দেয়া আছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

নির্বাচন কমিশনের সচিব বলেন, কেউ যদি ফৌজদারি অপরাধ করে থাকে, তাহলে তো পুলিশ অবশ্যই তাকে গ্রেফতার করবে।

নির্বাচন কমিশন যাই বলুক না কেন, সম্প্রতি ঊর্ধ্বতন কিছু সরকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলেছে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি।

বেশ কয়েকজন সচিব এবং সরকারি কর্মকর্তার সুনিদ্দিষ্ট নাম উল্লেখ করে বিএনপি অভিযোগ তুলেছে যে নির্বাচনকে কিভাবে প্রভাবিত করা যায় সে কৌশল নির্ধারণ করতে তারা ঢাকার অফিসার্স ক্লাবের একটি কক্ষে গোপন বৈঠক করেছে।

যাদের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ তোলা হয়েছে তাদের কয়েকজন বলেছেন, নির্বাচন প্রভাবিত করার জন্য কোন গোপন বৈঠক তারা করেননি।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক দিলারা চৌধুরী আবারো সেই পুরনো বিতর্কে ফিরে গেলেন।

নির্বাচনের সময় কোন ধরনের সরকার ক্ষমতায় থাকছে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে তিনি মনে করেন।

তিনি মনে করেন, সরকার চাইলে নানা উপায়ে নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে। এবং বর্তমানে সেটাই হচ্ছে বলে তাঁর ধারণা।

তবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে বলছে, নির্বাচন কমিশনের উপর তারা কোন প্রভাব বিস্তার করছে না।

তাছাড়া বিএনপি যেসব অভিযোগ তুলছে সেগুলোকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করছেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী।

নির্বাচন কমিশন বলছে, তাদের উপর সরকারের কোন প্রভাব নেই। সচিব হেলালউদ্দিন আহমদ বলছেন, আইন অনুযায়ী কমিশনের যে ক্ষমতা রয়েছে সে অনুযায়ী তারা সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার চেষ্টা তারা অব্যাহত রেখেছেন।

তিনি বলেন, " আমাদের চেষ্টার কোন ত্রুটি নেই। আমরা সব ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছি।"

আইন অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী হলেও বাস্তবে তারা কতটা ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে, এবারের নির্বাচনে সে পরীক্ষা হয়ে যাবে। এমনটাই বলছেন পর্যবেক্ষকরা।

কারণ ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুন:প্রতিষ্ঠার পর দলীয় সরকারের অধীনে এবারই প্রথম সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।