মেয়েদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক স্থান নিজের ঘর: জাতিসংঘ প্রতিবেদন

জাতিসংঘের এক গবেষণায় দেখা গেছে, সারা বিশ্বে প্রতিদিন গড়ে ১৩৭ জন নারী তাদের পুরুষ সঙ্গী বা পার্টনার অথবা পরিবারের সদস্যদের হাতে খুন হচ্ছেন।
জাতিসংঘের ড্রাগ ও অপরাধ সংক্রান্ত দপ্তর তাদের এক গবেষণায় এই পরিসংখ্যান তুলে ধরেছে।
তারা বলছে, এসব তথ্য থেকে বোঝা যায় "নারীরা যে বাড়িতে থাকেন সেই বাড়িতেই তাদের নিহত হওয়ার ঝুঁকি হয়তো অনেক বেশি।"
গবেষণায় বলা হয়, গত বছর অর্থাৎ ২০১৭ সালে সারা বিশ্বে ৮৭,০০০ নারী নিহত হয়েছেন। তাদের অর্ধেকেরও বেশি মারা গেছেন তাদেরই ঘনিষ্ঠ লোকজনের হাতে।
জাতিসংঘের এই পরিসংখ্যান অনুসারে, প্রায় ৩০,০০০ নারী নিহত হয়েছেন তাদের খুব কাছের সঙ্গী বা পার্টনার এবং বাকি ২০,০০০ মারা গেছেন তাদেরই কোন না কোন একজন আত্মীয়ের হাতে।
আরো পড়তে পারেন:

জাতিসংঘের ড্রাগ ও অপরাধ সংক্রান্ত দপ্তরের সংগৃহীত তথ্যে দেখা যায়, ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ডের হিসেবে পুরুষের খুন হওয়ার হার নারীর তুলনায় চারগুণ বেশি।
তারা বলছেন, সারা বিশ্বে প্রতি ১০টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে আটজনই পুরুষ যারা অন্যের হাতে খুন হচ্ছেন।
তবে এই একই প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ঘনিষ্ঠ কোন পুরুষ সঙ্গী বা পার্টনারের হাতে খুন হওয়া প্রতি দশজন মানুষের মধ্যে আটজনেরও বেশি নারী।
রিপোর্ট বলছে, "ঘনিষ্ঠ পার্টনারের সহিংসতার কারণে প্রচুর সংখ্যক নারীকে প্রাণ হারাতে হচ্ছে।"

৪৭ জন নারী, ২১টি দেশ, একদিন
সরকারি সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য থেকে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে জাতিসংঘ।
২০১৮ সালের ১লা অক্টোবর সারা বিশ্বে যতো নারী অন্য একজনের হাতে নিহত হয়েছেন - সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত সেসব খবরের ওপর বিশ্লেষণ করেছে বিবিসি।

তাতে দেখা গেছে, ২১টি দেশে ৪৭ জন নারী নারী-পুরুষ সংক্রান্ত কারণে নিহত হয়েছেন। এসব হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে এখনও তদন্ত চলছে।
এখানে এরকম কিছু হত্যাকাণ্ডের কথা তুলে ধরা হলো। এসব খবর প্রাথমিকভাবে স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে এবং পরে বিবিসি স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে এসব খবর যাচাই করে দেখেছে।

ছবির উৎস, Family handout
জুডিথ চেসাং, ২২, কেনিয়া
জুডিথ চেসাং এবং তার বোন ন্যান্সি ১লা অক্টোবর সোমবার জমি থেকে তাদের ফসল তুলছিলেন।
তিন সন্তানের মা জুডিথ, সম্প্রতি তিনি তার স্বামী লাবান কামুরেনের কাছ থেকে আলাদা হয়ে গেছেন। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তার বাবা মায়ের গ্রামে কাছে ফিরে যাওয়ার।
দুই বোন যখন জমিতে কাজ করছিলেন, তখনই তিনি সেখানে এসে হাজির হন এবং জুডিথের ওপর হামলা চালিয়ে তাকে হত্যা করেন।
স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, তারপর গ্রামবাসীরা তাকেও হত্যা করেছে।

ছবির উৎস, Manohar Shewale
নেহা শারদ চৌধুরী, ১৮, ভারত
নেহা শারদ চৌধুরী তার ১৮তম জন্মদিনে নিহত হন। সন্দেহ করা হচ্ছে, পরিবারের সম্মান রক্ষার নামে তাকে হত্যা করা হয়েছে। সে তার প্রেমিকের সাথে তার জন্মদিন উদযাপন করছিল। পুলিশ বিবিসিকে জানিয়েছে যে তার পিতামাতা এই সম্পর্ক মেনে নেয়নি।
সেদিন সন্ধ্যায় নেহা তাদের বাড়িতে নিহত হন এবং এই হত্যাকাণ্ডের জন্যে তার পিতামাতা এবং আরো একজন পুরুষ আত্মীয়কে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
এই হত্যাকাণ্ডের এখনও তদন্ত চলছে। অভিযুক্ত তিনজনই এখন কারাগারে এবং বিচারের অপেক্ষায়।
অভিযুক্তদের পরিবারের কাছ থেকে বিবিসি জানতে পেরেছে যে তারা তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করবেন।
পরিবারের ইচ্ছের বাইরে প্রেমে পড়া ও বিয়ে করার কারণে প্রত্যেক বছর কয়েকশো মানুষ নিহত হয়। এসব হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত সংখ্যা কতো সেবিষয়ে সরকারি তথ্য পাওয়া কঠিন। কারণ এধরনের হত্যকাণ্ডের ঘটনা পুলিশের কাছে খুব কমই রিপোর্ট করা হয়ে থাকে।

ছবির উৎস, Private via Amnesty International
জয়নব সেকানভান, ২৪, ইরান
স্বামীকে হত্যা করার কারণে ইরানি কর্তৃপক্ষ জয়নব সেকানভানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে।
কুর্দী অধ্যুষিত অঞ্চলে একটি দরিদ্র ও রক্ষণশীল পরিবারে তার জন্ম হয়েছিল। উন্নত জীবনের সন্ধানে একজনকে বিয়ে করার স্বপ্ন নিয়ে কিশোর বয়সেই তিনি বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, তার স্বামী তাকে নির্যাতন করতো। তাকে তালাকও দিতে চাইতো না। পুলিশের কাছে এব্যাপারে অভিযোগ করা হলেও পুলিশ তাকে গুরুত্ব দেয়নি।
স্বামীকে খুন করার কারণে তাকে গ্রেফতার করা হয়। তখন তার বয়স ছিল ১৭।
তার সমর্থক এবং অ্যামনেস্টি বলছে, স্বামীকে হত্যা করার অভিযোগের বিষয়ে নির্যাতনের মাধ্যমে তার কাছ থেকে স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়েছে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদন বলছে, যেসব নারী তাদের ঘনিষ্ঠ সঙ্গীকে হত্যা করেন তাদেরকে দীর্ঘমেয়াদে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়।

ছবির উৎস, Reproduction / Facebook
সান্দ্রা লুসিয়া হামার মোওরা, ৩৯, ব্রাজিল
সান্দ্রা লুসিয়া হামার মোওরা তার ১৬ বছর বয়সে বিয়ে করেছিলেন আউগোস্ত অ্যাগুয়ের রিবেইরুকে।
তারা পাঁচ মাস ধরে আলাদা ছিলেন। তখন তার স্বামী তাকে হত্যা করে।
স্থানীয় পুলিশ বিবিসির কাছে নিশ্চিত করেছে যে তার ঘাড়ে ছুরি দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল।
পরে তারা তার স্বামীর মোবাইল ফোনে করা একটি ভিডিও উদ্ধার করেছেন যেখানে তাকে হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করতে দেখা যাচ্ছে। সেখানে তিনি বলছেন, তার স্ত্রী সান্দ্রা অন্য একজন পুরুষের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। সান্দ্রা তার সাথে প্রতারণা করেছে।
পরে অবশ্য ওই স্বামী তাদের শোওয়ার ঘরে আত্মহত্যা করেছেন।

ছবির উৎস, PHOTOPQR/LE PROGRES/Photo Jean-Pierre BALFIN
ম্যারি এমিলি ভালাত, ৩৬, ফ্রান্স
ম্যারি এমিলিকে তার স্বামী সেবাস্টিয়ান ভালাত ছুরি মেরে হত্যা করেছে।
বিয়ের চার বছর পর থেকেই তারা আলাদা হয়ে গিয়েছিলেন।
স্বামী পরে পুলিশের কাছে এই হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছেন। তার কয়েকদিন পর স্বামী নিজেও কারাগারের ভেতরে আত্মহত্যা করেছেন।








