'ব্লাসফেমি' বা ধর্ম অবমাননার বিরুদ্ধে আইন মুসলিম দেশগুলোতেই বেশি কঠোরভাবে চর্চা করা হয়: অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল

লাহোরে বিক্ষোভ

ছবির উৎস, AFP

ছবির ক্যাপশান, 'ব্লাসফেমি' বা ধর্ম অবমাননার দায়ে এক ক্রিস্টান নারীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ সম্প্রতি বাতিল হলে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পরে পাকিস্তানে

'ব্লাসফেমি' বা ধর্ম অবমাননার বিরুদ্ধে আইন রয়েছে পৃথিবীর অনেক দেশেই, যদিও অনেক দেশে কাগজে-কলমে আইন থাকলেও তার বাস্তব প্রয়োগের উদাহরণ বিরল।

কোনো বিশেষ ধর্মের বিষয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করাকে 'ব্লাসফেমি' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে।

কোনো কোনো দেশে 'অ্যাপোস্ট্যাসি'কেও দণ্ডনীয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। 'অ্যাপোস্ট্যাসি'র মাধ্যমে বিশেষ কোনো ধর্মকে অস্বীকার করা বা স্বধর্মত্যাগ বোঝানো হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের 'কমিশন অন ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডম'এর ২০১৭ সালের রিপোর্টে ৭১টি দেশের তালিকা উঠে আসে যেখানে ব্লাসফেমি আইন রয়েছে।

এই আইনের অধীনে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।

যুক্তরাষ্ট্রের 'লাইব্রেরি অব কংগ্রেস' এর মতে ২০১৭ সালে ৭৭টি দেশের আইনে 'ব্লাসফেমি, ধর্ম অবমাননা, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও অনুরূপ আচরণ'কে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

এই প্রতিবেদনে বলা হয় ইসলামিক দেশগুলোতে ব্লাসফেমি আইনের অনুশীলন হওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে।

তবে এই ধরণের আইন ইউরোপ সহ বিশ্বের অনেক জায়গায়ই কার্যকর রয়েছে।

মুসলিম বিশ্বে 'ব্লাসফেমি'

মুসলিম বিশ্বে সবশেষ আলোচিত ব্লাসফেমি'র উদাহরণ পাকিস্তানের খ্রিস্টান নারী আসিয়া বিবি'র ঘটনাটি।

২০১০ সালে মৃত্যুদন্ডের শাস্তি পাওয়া আসিয়া বিবি আট বছর কারাভোগ করার পর গত সপ্তাহে সুপ্রিম কোর্ট তার রায় বাতিল করে।

ব্লাসফেমি আইনে আনা মামলা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, পাকিস্তানে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের বিরুদ্ধে ব্লাসফেমি আইনে আনা মামলা

মুসলিম অধ্যূষিত পাকিস্তানে অনেকবারই খ্রিস্টান এবং অন্যান্য সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে বিতর্কিত ব্লাসফেমি আইন।

মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতে প্রতিশোধস্পৃহা মেটাতে এবং সাম্প্রদায়িক সহিংসতাকে ন্যায়সঙ্গত প্রমাণ করতে এই আইন ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

অ্যামনেস্টি'র মতে, "অভিযুক্তরা তাদের নির্দোষিতা প্রমাণ করতে যখন সংগ্রাম করতে থাকে, তখন ক্ষিপ্ত ও উন্মত্ত জনতা পুলিশ, স্বাক্ষী, আইনজীবি এবং বিচারকদের পর্যন্ত হুমকির মুখে রাখে।"

একটি পাকিস্তানি মানবাধিকার সংস্থা - যারা গত ৩০ বছর ধরে এই ধরণের মামালা নিয়ে কাজ করছে - জানায় পাকিস্তানে ব্লাসফেমি আইনের ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই মুসলিম বা আহমাদি (যাদের পাকিস্তান সরকার অমুসলিম ঘোষণা করেছে)।

পাকিস্তানের মত দেশে ব্লাসফেমি'র শাস্তি বেশ কঠিন।

পাকিস্তান ছাড়া ইরান, সৌদি আরব এবং মৌরিতানিয়া ব্লাসফেমি'র অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড শাস্তি দিয়েছে।

তবে মোট কতগুলো মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়া হয়েছে সেবিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো তথ্য নেই।

বাংলাদেশে কীভাবে দেখা হয় ধর্ম অবমাননাকে?

ব্লাসফেমি আইনের বিপক্ষে প্রচারণা চালায়, এমন একটি মানবাধিকার সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যানিস্ট অ্যান্ড এথিকাল ইউনিয়ন এর সদস্য বব চার্চিল বলেন, "বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ, এমনকি প্রধানমন্ত্রী নিজেও, নাস্তিক বা নিরীশ্বরবাদী ব্লগারদের হত্যাকাণ্ডের ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় জানান যে - কট্টরপন্থী মুসলিমরা যা শুনতে চায় না, তা তাদের (ব্লগারদের) লেখা উচিত নয়।"

তবে ২০১৩ সালে বিবিসি বাংলা'র কাদির কল্লোলকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন বাংলাদেশে ব্লাসফেমি আইনের আদলে কোনো আইন প্রণয়নের পরিকল্পনা নেই সরকারের।

শাপলা চত্বর

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ২০১৩ সালে হেফাজত ইসলাম ব্লাসফেমি আইনের আদলে বাংলাদেশে আইন তৈরির দাবি জানায়

২০১৩'র এপ্রিল মাসে ঢাকায় হেফাজতে ইসলামের একটি সম্মেলনের ১৩ দফা দাবির একটি ছিল ব্লাসফেমি আইনের আদলে ধর্ম অবমাননার বিরুদ্ধে একটি আইন প্রণয়ন।

তবে সেই দাবি নাকচ করে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, দেশে আইনে অভাব নেই। তথ্য প্রযুক্তি আইন, বিশেষ ক্ষমতা আইন এবং ফৌজদারি বিধিতেও বিষয়টাতে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে বলে মন্তব্য করেছিলেন তিনি।

হেফাজতের সম্মেলনের পর বিবিসি'কে দেয়া সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ''ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার মত কোন কথা যদি লেখায় থাকে, অবশ্যই আমাদের তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এটা খুব স্বাভাবিক। আমি একজন মুসলমান। এখন নবী করিম সা: সম্পর্কে কেউ যদি আজেবাজে কথা লেখে, আমরাতো চুপ করে বসে থাকতে পারি না। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।"

"কেউ হয়তো ধর্ম না মানতে পারে, তার মানে এই না যে তারা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে কথা বলবে বা নোংরা কথা লিখবে।''

সেসময় তিনি মন্তব্য করেছিলেন বাংলাদেশে সব ধর্মের সমান অধিকার আছে। কোন ধর্মের মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেবার অধিকার কারও নেই।

বাকস্বাধীনতা ও ধর্ম অবমাননা

ইউরোপের বেশকিছু দেশেও ব্লাসফেমি আইনে মামলা হওয়ার নজির রয়েছে।

  • ডেনমার্ক - কোরান পুরানোর একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করায় ২০১৭ সালে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্লাসফেমি আইনে অভিযোগ আনা হয়।
  • ফিনল্যান্ড - ইসলাম বিষয়ে একটি ব্লগ পোস্টে অবমাননাকর মন্তব্য করায় ২০০৯ সালে এক ব্যক্তিকে জরিমানা করা হয়।
  • জার্মানি - 'কোরান,পবিত্র কোরান' লেখা টয়লেট পেপার বিলি করায় ২০০৬ সালে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়।
  • জার্মানি - গাড়িতে খ্রিস্টান বিরোধী স্টিকার লাগানোর দায়ে ২০১৬ সালে এক ব্যক্তিকে ৫০০ ইউরো জরিমানা করা হয়।
  • আয়ারল্যান্ড - টিভি অনুষ্ঠানে ব্রিটিশ কমেডিয়ান স্টিফেন ফ্রাই'য়ের মন্তব্যের কারণে অভিযোগ আনা হলে তদন্ত চলে তাঁর বিরুদ্ধে।

সম্প্রতি আয়ারল্যান্ডে একটি গণভোটে ব্লাসফেমি'কে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা না করার সিদ্ধান্ত নেয় জনগণ।

আইসল্যান্ড, নরওয়ে আর মাল্টাও সাম্প্রতিক সময়ে ব্লাসফেমি আইন বাতিল করেছে।

আরো পড়ুন: