নারী-থেকে-পুরুষ কবিরাগ পোদ্দার কলকাতার দুর্গাপুজায় প্রথম রূপান্তরী পুরোহিত

পুজা করছেন কবিরাগ পোদ্দার।
ছবির ক্যাপশান, পুজা করছেন কবিরাগ পোদ্দার।
    • Author, অমিতাভ ভট্টশালী
    • Role, বিবিসি বাংলা, কলকাতা

দক্ষিণ কলকাতার একটি বাড়ির পুজায় দুর্গাপুজার এক সন্ধ্যায় আরতি করছিলেন পুরোহিত।

এক হাতে নাগাড়ে ঘণ্টা বাজিয়ে চলেছেন, অন্য হাতে একে একে উঠে আসছে ধূপ-কাঠি, প্রদীপ, জলশঙ্খ, চামর - এসব।

একদিকে বাজছে ঢাক, ঘরের ভেতরে কেউ উলুধ্বনি দিচ্ছেন, কেউ বাজাচ্ছেন শাঁখ।

পুরোহিতের পরনে ধুতি, গায়ে উত্তরীয় - যেরকমটা সব পুজার পুরোহিতরাই পড়ে থাকেন। তার নাম কবিরাগ পোদ্দার।

আরতি শুরু করার কিছুক্ষণ আগে তিনি বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "আমি ছোট থেকে কোনোদিন মেয়েদের পোশাক পড়ি নি। জন্মেছিলাম যদিও নারী হিসাবেই। কেতকী নাম ছিল আমার। তবে সেটা মূলত খাতায়-কলমেই।"

"ইউনিভার্সিটিতেও আমাকে কেউ কেতকী নামে চিনত না। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ডাক নাম ছিল কিষাই - অর্থাৎ, কৃষ্ণ প্লাস রাই। ভাগবতেই তো লেখা আছে, গোবিন্দের বাম অংশ থেকে রাধারানীর উৎপত্তি - তাই কৃষ্ণ আর রাই তো একই - আমার মতোই। আর এখানেও কী আশ্চর্য, আমি প্রথমবার দুর্গাপুজা করছি যে বিগ্রহে, তিনিও অর্ধনারীশ্বর।"

কবিরাগ একজন রূপান্তরী-পুরুষ - যিনি নারী থেকে পুরুষ হয়ে উঠেছেন। তিনিই প্রথম রূপান্তরী পুরোহিতও বটে।

রঞ্জিতা সিনহার বাড়িতে অর্ধনারীশ্বরের পুজো হচ্ছে - অর্দ্ধেক শিব, অর্দ্ধেক দুর্গার মুখাবয়ব।
ছবির ক্যাপশান, রঞ্জিতা সিনহার বাড়িতে অর্ধনারীশ্বরের পুজো হচ্ছে - অর্দ্ধেক শিব, অর্দ্ধেক দুর্গার মুখাবয়ব।

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বেশ কিছুদিন আগেই সে দেশের সমকামী আর রূপান্তরকামী নারী-পুরুষসহ তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। যদিও সমাজ কতটা তা মন থেকে মেনে নিয়েছে, তা বলা কঠিন। আর ধর্মীয় অনুষ্ঠানে তো তাঁরা বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই এখনও ব্রাত্যই।

সেই সমাজ-চলতি ধর্মীয় রীতিনীতিকে একরকম চ্যালেঞ্জই করে বসেছেন কবিরাগ।

হিন্দুধর্মে, যেখানে ব্রাহ্মণদেরই পুজা করার অধিকার সমাজ স্বীকৃত, সেই ছক ভেঙ্গে দিয়ে নারী থেকে পুরুষে রূপান্তরিত হওয়া কবিরাগ দুর্গাপুজা করছেন।

তিনি নিজে বৈষ্ণব পরিবারের সন্তান, আবার আরাধনা করছেন শক্তির। এই পুজার নিয়মকানুন সবই তাঁকে নানা শাস্ত্র ঘেঁটে থেকে গবেষণা করে বার করতে হয়েছে। দুটি বিষয়ে এম এ পাশ করে এখন তৃতীয় এমএ করার প্রস্তুতির সঙ্গেই কবিরাগ চালিয়েছেন দুর্গাপুজা নিয়ে এই গবেষণা।

"কনসেপ্টগুলো মাথায় ছিলই, কিন্তু কিছুটা তো পড়াশোনা করতে হয়েইছে। এক্ষেত্রে আমার গুরুকুলের কাছ থেকে যেমন সাহায্য পেয়েছি, তেমনই ব্রহ্মসংহিতার থেকে অনেক সাহায্য পেয়েছি। ওটাই আমাদের বৈষ্ণবদের আকর গ্রন্থ - সব পুজা-অর্চনার নিয়ম ব্রহ্মসংহিতাতেই লিপিবদ্ধ করে গেছেন জীব গোস্বামী।"

"আমার গুরুকুলের কাছে যখন দুর্গাপুজা করার অনুমতি চেয়েছিলাম, তাঁরা একটাই কথা বলেছিলেন, আমি নিজে প্রস্তুত কী না এই গুরুদায়িত্ব পালন করতে!"

আরতি করছেন পুরোহিত কবিরাগ পোদ্দার।
ছবির ক্যাপশান, আরতি করছেন পুরোহিত কবিরাগ পোদ্দার।

আরো পড়তে পারেন:

ওই পুজাটা যে বাড়িতে হচ্ছে, সেই বাড়ির মেয়ে অনুরাধা সরকার। আরেক রূপান্তরী নারী। আরতির সময়ে শাঁখ বাজানো থেকে শুরু করে পুজার অন্যান্য উপচার এগিয়ে দিয়ে কবিরাগকে সাহায্য করছিলেন তিনি।

"এতদিন দেখে এসেছি ব্রাহ্মণরাই পুজা করেন। কিন্তু এমন অনেক রূপান্তরকামী নারী বা পুরুষ আছেন, যারা ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও পুজার আনন্দ থেকে দূরেই থাকতেন। নিজেরা পুজা করা তো দূরের কথা। এই পুজা দেখিয়ে দিল যে ব্রাহ্মণ ছাড়াও মায়ের বোধন হয় - নিয়ম নিষ্ঠার সঙ্গেই পুজা করা যায়। মনের ভক্তিটাই যথেষ্ট পুজার জন্য।"

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ট্র্যান্সজেন্ডার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের সদস্য ও রূপান্তরকামীদের অন্যতম সক্রিয় সংগঠক রঞ্জিতা সিনহার বাড়িতেই এই দুর্গাপুজাটা হয়।

তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিলাম, আইন স্বীকৃতি দিলেও সমাজ বা ধর্মীয় নেতারা কী এই ছক-ভাঙ্গা দুর্গাপুজা মেনে নেবে?

পশ্চিমবঙ্গ ট্র্যান্সজেন্ডার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের সদস্য রঞ্জিতা সিনহা।
ছবির ক্যাপশান, পশ্চিমবঙ্গ ট্র্যান্সজেন্ডার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের সদস্য রঞ্জিতা সিনহা।

"সমাজ কতটা মেনে নেবে, সেটা জানি না। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তো সবসময়েই নারীদের ওপরে শোষণ চালিয়েছে, এখন হয়ত ফর্মটা পাল্টেছে। সতীদাহের বদলে এখন অ্যাসিড ছোঁড়া হয়। নারীরাই যেখানে অত্যাচারের শিকার, সেখানে নারীসুলভ পুরুষ বা পুরুষ-সুলভ নারীদের তো কোনও অস্তিত্বই নেই সমাজের হায়ারার্কিতে।"

"অথচ, একটা সময় ছিল, যখন আমাদের মতো এই তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের কিন্তু অস্তিত্ব সমাজ-স্বীকৃতই ছিল। পুরাণেই কিন্তু হর-পার্বতী বা বৃহন্নলা অথবা অর্ধনারীশ্বর - এদের ব্যাপারে লেখা আছে। আমরা এই পুজাতে সেই প্রাচীন সমাজ-স্বীকৃত ভাবনাগুলোই ফিরিয়ে আনতে চেয়েছি," বলছিলেন রঞ্জিতা সিনহা।

পুজার পুরোহিত কবিরাগ বলছিলেন, দুর্গাপুজা করতে গিয়ে যেমন বারে বারেই ছক ভাঙ্গতে হয়েছে তাঁকে, তেমনই তিনি নিজের জীবনেও ছক ভেঙ্গেছেন, বারে বারেই।

"বাবার খুব ঘনিষ্ঠ ছিলাম - কিছুদিন আগে পর্যন্তও। কিন্তু যখন বাবাকে বলেছিলাম আমার নতুন আইডেন্টিটির কথা, তখন বাবা বলেছিল, এই যে এত পড়াশোনা করালো, সে সবই বৃথা যাবে, কারণ আমি এই নতুন আইডেন্টিটি নিয়ে জীবনে কিছুই করতে পারব না।"

"বাবা তারপর থেকে আর কথা বলে না আমার সঙ্গে - গত আট মাস। মা আমার সঙ্গে কথা বলে, তবে অন্য ব্যাপারটায় নীরব থাকে, যদিও বুঝি মায়ের সমর্থন আছে কোথাও। দাদা, বৌদিরাও নীরবেই সমর্থন করে। কিন্তু আমি চাই নি আমার আইডেন্টিটি স্যাক্রিফাইস করতে। তাই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছি আমি," বলছিলেন কবিরাগ।

কেতকী থেকে বছর-খানেক আগে কবিরাগ হয়ে গিয়ে এবছর প্রথম দুর্গাপুজার পুরোহিতের আসনে বসার এই একটানা লড়াইতে তিনি শুধু সঙ্গে পেয়েছেন সহযোদ্ধা রূপান্তরকামীদের।