এই 'মৃত্যু উপত্যকাই' আমার ভারত, যাকে অনেকেই এখন ডাকেন 'লিঞ্চিস্তান' বলে

মালবী গুপ্ত

যদি আমিও কবি নবারুণ ভট্টাচার্য 'র মতো বলতে পারতাম যে, 'এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না'। কিন্তু পারছি কই?

কারণ যেভাবে বহুবিধ হত্যা আমাদের ব্যক্তি জীবন, সমাজ জীবন, রাষ্ট্রীয় জীবনকে নিরন্তর শাসন করছে। যেভাবে একক, কখনো দলগত ভাবে, কখনো বা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মাধ্যমে নিরবধি ঘটে চলেছে হত্যার অনুশীলন। যে অনুশীলনে নবতম সংযোজন হিসেবে উঠে এসেছে - লিঞ্চিং বা গণধোলাই' এ নারকীয় হত্যা, তাতে বরং বলতেই হচ্ছে - 'এই মৃত্যু উপত্যকা' ই আমার দেশ।

যে হত্যা কখনো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার হাত ধরে ঘটছে (শুধু ২০১৭ তেই স্বরাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য বলছে ভারতে ৮২২ দাঙ্গায় ১১১ জন নিহত ২৩৮৪ জন আহত) । কখনো ঘটছে এথনিক ক্লেন্সিং তথা কোনও জনজাতি গোষ্ঠীর বিতাড়নের মধ্যে দিয়ে। কখনো রাজনৈতিক হিংসা-প্রতিহিংসা চরিতার্থে, আবার কখনো ভুয়ো সংঘর্ষের নামে।

যেন কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী, নাগাল্যান্ড - মনিপুর থেকে গুজরাট - উত্তরপ্রদেশ - পাঞ্জাব, দশকের পর দশক ধরে এক অবিরাম হত্যার মিছিল চলেছে। সেই শবযাত্রার মিছিলে হাজার হাজার হিন্দু, মুসলমান, শিখ, দলিত, আর নানা জনজাতি যেমন শামিল হচ্ছে।

তেমনি আবার 'জঙ্গি', 'বিচ্ছিন্নতাবাদী', 'রাষ্ট্রবিরোধী', 'অনুপ্রবেশকারী' ইত্যাদি তকমা যেন রাষ্ট্রযন্ত্রের হাতেই মানুষ নিধনের ছাড়পত্র তুলে দিচ্ছে।

কিন্তু এটাও তো প্রশ্ন যে, একটা সদ্য স্বাধীন দেশে এত দ্রুত কেন বিচ্ছিন্নতাবাদ, কেন এত রাষ্ট্রবিরোধিতা জন্ম নিচ্ছে?

ইন্ডিয়া টুডে পত্রিকার প্রচ্ছদ প্রতিবেদন, ২৪ জুলাই ২০১৮।
ছবির ক্যাপশান, ভারতীয় পত্রিকায় 'লিঞ্চিস্তান' - গণপিটুনিতে হত্যার দেশ।

আসলে আমার মনে হয়, ভারতীয় উপমহাদেশে যে অবিশ্বাস, বিদ্বেষ, ঘৃণা আর দাঙ্গায় ঘৃতাহুতি দিয়ে একদিন দেশভাগ হয়েছিল, যে ১০ - ২০ লক্ষ মানুষের রক্তে ভেজা মাটির ওপর ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীনতার পতাকা উড়িয়েছিল, দু'দেশের সেইসব নিহত মানুষের দীর্ঘশ্বাস যেন আমাদের স্বাধীনতার গলায় আজও ভারী পাথর হয়ে ঝুলছে। (আরও জানতে এখানে ক্লিক করুন )।

তাই সাত দশক পরেও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, জাতিগত ঘৃণার ক্ষত তো শুকোয়ই নি, বরং তা থেকে অবিরাম রক্তক্ষরণ হয়েই চলেছে।

সে কাশ্মীর, পাঞ্জাব, আসামই হোক, কিম্বা গুজরাটই হোক হত্যায়, গণহত্যায় দেশের মাটি কেবলই লালে রঞ্জিত হচ্ছে। যেমন কাশ্মীর মিডিয়া সার্ভিস'র মতে সেই ১৯৯০ থেকে রাজ্যে প্রায় ১ লক্ষ কাশ্মীরি মুসলমান নিহত হয়েছে। ভুয়ো সংঘর্ষে নিহত প্রায় ৬০০০ গণকবর আজও চিহ্নিত হয় নি।

তেমনি আবার ১৯৯০ থেকে সেখানকার লক্ষ লক্ষ কাশ্মীরি হিন্দু পণ্ডিত সহিংসতার ও এথনিক ক্লেন্সিং-এর শিকার হয়েছে। সেই পণ্ডিতদের ৬৯০ কারো মতে ৩০০০ জন নিহত হয়েছে উপত্যকায়। লক্ষাধিক কাশ্মীরি পণ্ডিতকে ছিন্নমূল হয়ে নিজের দেশেই উদ্বাস্তু হতে হয়েছে।

দু'জন শিখ নারী ১৯৮৪ সালের দাঙ্গায় নিহতদের স্মরণে দিল্লিতে নির্মিত 'ওয়াল অফ ট্রুথ'-এ শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন।

ছবির উৎস, The India Today Group

ছবির ক্যাপশান, কঠিন স্মৃতি: দু'জন শিখ নারী ১৯৮৪ সালের দাঙ্গায় নিহতদের স্মরণে নির্মিত 'ওয়াল অফ ট্রুথ'-এ শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন।

আর ১৯৮৪ তে সেই শিখ নিধনের মর্মান্তিক স্মৃতি কি এখনও তত ধূসর হয়েছে? শুধু দিল্লি আর পাঞ্জাবেই ১-৪ নভেম্বর'এর মধ্যে হত্যা করা হয়েছিল সরকারি হিসেবে ২,৮০০ জনকে। বেসরকারি মতে সংখ্যাটি ছিল ৮,০০০। এবং ১৯৮৩'তে আসামের নেলিতে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সরকারি মতে ১,৮১৯, বেসরকারি হিসেবে ৩,০০০ বাঙালি মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছিল। এবং সেদিনের গণহত্যার ৮০ শতাংশই ছিল নারী ও শিশু।

স্বাধীন ভারতে এই শিখ-বিরোধী দাঙ্গা ও নেলি হত্যাকে অনেকেই 'নৃশংসতম গণহত্যা' বলে থাকেন।

এভাবেই ভারতের নানা প্রান্তে দেখছি হত্যার ধারাবাহিকতা অব্যাহত। সে জাতি-দ্বন্দ্বে দীর্ণ উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলিতেই হোক। কিম্বা ভিওয়ান্ডি, মোরাদাবাদ, ভাগলপুর, কাশ্মীর, বোম্বে, গুজরাট, মুজাফ্ফর নগরে একের পর এক দাঙ্গাই হোক। হাজার হাজার মানুষের রক্ত ঝরেই চলেছে।

এই সব জানতে জানতে কেবলই মনে হয় - কি সেই রক্ত পিপাসা, যা আমাদের এমন জঘন্যতম হত্যা কাজে প্রাণিত করছে?

এখন আবার এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে লিঞ্চিং বা গণধোলাই' এ হত্যার হিংসা। খুব তুচ্ছ যা আদৌ কোনো কারণ বলেই গণ্য হতে পারে না, সে সব ক্ষেত্রেও দেখছি ভারতে নিরীহ মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হচ্ছে।

কখনো তা ঘটছে 'গরুপাচার'র সন্দেহে, কখনো গরুর মাংস রাখা বা সঙ্গে বহন করার অভিযোগে। কখনো ছেলে ধরার গল্প রটিয়ে, কখনো বা নিছক চুরির অভিযোগেও গণপিটুনিতে হত্যার আগুনে হাত সেঁকে নিচ্ছে হত্যাকারীরা।

মনে হচ্ছে হত্যা করাটাই যেন মুখ্য উদ্দেশ্য। কারণ কিছু না কিছু অজুহাত হত্যাকারীরা তো জুটিয়েই ফেলছে।

গণপিটুনিতে হত্যা বা 'লিঞ্চিংৰ এর বিরুদ্ধে দিল্লিতে নাগরিক অধিকার মঞ্চ-র সদস্যদের প্রতিবাদ বিক্ষোভ

ছবির উৎস, Hindustan Times

ছবির ক্যাপশান, প্রতিবাদ: গণপিটুনিতে হত্যা বা 'লিঞ্চিংৰ এর বিরুদ্ধে দিল্লিতে ভারতীয় নাগরিকদের সমাবেশ।

এভাবেই তো দাদরিতে মহম্মদ আখলাখ, হরিয়ানার পেহেলুখান, রাজস্থানের মাংস বিক্রেতা আব্দুল কুরেশিকে হত্যা করা হয়। গণধোলাইয়ে খুন করা হয় মধ্যপ্রদেশের সাতনায় রিয়াজ, পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়িতে হাফিজুল শেখ, আনোয়ার হুসেন, রাঁচির আলিমুদ্দিন আনসারিকে। যাদের কেউ গো'খামারের মালিক, কেউ গরুর দুধ ব্যবসায়ী বা মাংস বিক্রেতা।

এমনকী ১৫ বছরের জুনায়েদ খানও রেহাই পায় না গণধোলাইকারীদের হাত থেকে। ঈদের আগে দিল্লি থেকে হরিয়ানায় বাড়ি ফেরার পথে 'বিফ ইটার' বলে ট্রেনেই তাকে পিটিয়ে মারা হয়।

আবার ছেলেধরার গল্প রটিয়ে শুধু জুলাইয়ের প্রথম ৬ দিনেই দেখছি নয়টি গণহিংসায় ৫ জন নির্দোষ মানুষকে হত্যা করা হয়। এই গুজবেরই মর্মান্তিক শিকার হন হায়াদ্রাবাদের আইটি কর্মী মহম্মদ আজম, মহারাষ্ট্রের ধুলে জেলায় যাযাবর গোষ্ঠীর ৫ জন, তেলেঙ্গানায় রূপান্তরকামী নারী এবং আরও কত নিরীহ নাগরিক। এই লেখার সময় বছর পর্যন্ত এই বছর দেশে ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে গণপিটুনিতে।

এবং দেখতে পাচ্ছি ভারতে, যাকে অনেকেই এখন 'লিঞ্চিস্তান' বলে অভিহিত করছেন, গণপিটুনিতে নিহতদের বেশিরভাগই মুসলমান। এই নতুন প্রবণতার ভয়ঙ্কর আত্মপ্রকাশে বিচলিত দেশের সুপ্রিম কোর্টও। এ ব্যাপারে কোর্ট নতুন আইন তৈরির পরামর্শও দিয়েছেন লোকসভাকে।

আসলে, যে দেশে জাতির জনককে একদা অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে অনশনে বসতে হয়েছিল, দিনের পর দিন অনশন করতে হয়েছিল দাঙ্গা বন্ধের আর্জি জানিয়ে, সেই মহাত্মা গান্ধীই যেদিন হত্যাকারীর বুলেটে লুটিয়ে পড়েছিলেন, মনে হয় সেদিনই ভারতের ভাগ্যাকাশে নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল 'এই মৃত্যু উপত্যকা'র অমোঘ অনিবার্যতা।