বাংলাদেশে নিরাপদ সড়ক: কে এই যাত্রী কল্যাণ সমিতির মোজাম্মেল হক চৌধুরী?

ঢাকা শহরের অনেক রাস্তায় বেপরোয়াভাবে চলে গণপরিবহন।

ছবির উৎস, AFP

ছবির ক্যাপশান, ঢাকা শহরের অনেক রাস্তায় বেপরোয়াভাবে চলে গণপরিবহন।

সড়ক অব্যবস্থাপনা ও যাত্রীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরীকে গ্রেফতারের পর স্ত্রী তাকে নির্দোষ দাবি করে অবিলম্বে তাঁর মুক্তি চেয়েছেন।

মি: চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হয়েছে বুধবার একটি চাঁদাবাজির মামলায়।

বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে যারা আন্দোলন করছেন, তাদের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে মোজাম্মেল হক চৌধুরী বেশ সক্রিয় রয়েছেন। তাঁর সংগঠন মাঝেমধ্যেই তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ করে দেখিয়েছে যে বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তার হাল কতটা খারাপ।

সে কারণেই তাঁর গ্রেফতার অনেককে অবাক করেছে। সোমবার ঢাকায় একটি সংবাদ সম্মেলন করে মানবাধিকার কর্মী সুলতানা কামাল তাঁর মুক্তি দাবি করেছেন।

কে এই মোজাম্মেল চৌধুরী?

যাত্রী কল্যাণ সমিতির সদস্য মোহাম্মদ সামসুদ্দিন জানিয়েছে যে মোজামেল হক চৌধুরী প্রথমদিকে অনেকটা একা একাই লড়াইটা শুরু করেন।

তিনি বলেন, শুরুতে বিভিন্ন পত্রিকায় পরিবহন সেক্টর নিয়ে লেখালেখি শুরু করেন মিস্টার চৌধুরী। বারো বছর আগে ঢাকায় প্রথম পা রাখার পর তিনি উপলব্ধি করেন যে এই শহরের যাত্রীদের প্রতিনিয়ত কতোটা দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

মি: সামসুদ্দিন জানান, যাত্রীদের থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের পাশাপাশি এমনকি পথচারীদের ওপরে গাড়ি তুলে দেয়ার দু'একটি ঘটনা ঘটার পর তিনি এর প্রতিবাদ শুরু করেন।

পরে ২০১৪ সালে গঠন করেন যাত্রী কল্যাণ সমিতি এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে এই সংগঠনের নিবন্ধন নেন।

মোজাম্মেল হক চৌধুরীর লক্ষ্য ছিল সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগের কথা সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগে পৌঁছে দেয়া এবং আন্দোলনের মাধ্যমে যাত্রীদের অধিকার আদায় করা, বলছেন মোহাম্মদ সামসুদ্দিন।

সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগের কথা সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগে পৌঁছে দিতে গঠন হয় যাত্রী কল্যাণ সমিতি।

ছবির উৎস, BARCROFT MEDIA

ছবির ক্যাপশান, সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগের কথা সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগে পৌঁছে দিতে গঠন হয় যাত্রী কল্যাণ সমিতি।

শুরুতে তাঁর পরিচিতজনরা এই সংগঠনের সদস্য হলেও পরে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ এতে অংশ নেন।

স্ত্রীর বক্তব্য

বুধবার রাতে নারায়ণগঞ্জের সানারপাড়ার নিজ বাসা থেকে মোজাম্মেল হককে আটক করে মিরপুর মডেল থানার পুলিশ।

তবে তাকে কেন আটক করা হয়েছে পরিবারের কাছে তাৎক্ষণিকভাবে এসব কিছুই জানানো হয়নি, শুধু বলা হয়েছে উপর মহলের নির্দেশ পালন করছেন - বিবিসি বাংলাকে এমনটিই জানান রিজু আক্তার চৌধুরী।

পরদিন গণমাধ্যমের খবরে জানতে পারেন যে তার স্বামীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা দায়ের করা হয়েছে।

প্রথমে চাঁদাবাজির মামলায় রিমান্ডে নেয়ার পরে কাফরুল থানার বিস্ফোরক আইনে দায়ের করা এক মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে রিমান্ডে নেয়ার আবেদন জানিয়েছে পুলিশ।

ঢাকার যাত্রীদের প্রতিদিনই এই ধরনের ঝুঁকির মধ্য দিয়ে বাসে উঠতে হয়।

ছবির উৎস, NURPHOTO

ছবির ক্যাপশান, ঢাকার যাত্রীদের প্রতিদিনই এই ধরনের ঝুঁকির মধ্য দিয়ে বাসে উঠতে হয়।

ঢাকা মহানগর হাকিমের আদালতে করা আবেদনে ১০ দিনের রিমান্ডও চেয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা।

আসামিপক্ষের আইনজীবী জায়েদুর রহমান বলেছেন, আগামী ১৩ই সেপ্টেম্বর তদন্ত কর্মকর্তার উপস্থিতিতে শুনানির জন্য দিন ধার্য করা হয়েছে।

মিসেস চৌধুরী বলছেন, যে ব্যক্তি তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ এনেছে, তিনি বিভিন্ন গণমাধ্যমের কাছে স্বীকার করেছেন যে তিনি অভিযুক্তকে চেনেন না। "এ থেকে এটাই স্পষ্ট যে আমার স্বামীকে চক্রান্তমূলকভাবে ফাঁসানো হয়েছে।"

তিনি আরও বলেন, "আমার স্বামী বিরুদ্ধে বিগত ১৩ বছর ধরে থানায় একটা জিডি পর্যন্ত নেই। গত ফেব্রুয়ারিতে কাফরুল থানার মামলা দায়ের হয়েছে। পুলিশের রেকর্ডে যদি অভিযোগ আনা হয়েই থাকে, তাহলে এতদিন তারা কোথায় ছিল? তাকে কেন গ্রেফতার করেনি?"

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা একটি নিয়মিত ঘটনা- ফাইল ফটো
ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা একটি নিয়মিত ঘটনা- ফাইল ফটো

রিজু আক্তার জানান, ডেইলি লাইফ নামে একটি ইংরেজি পত্রিকার ঢাকা ব্যুরো চিফ হিসেবে কাজ করতেন মোজাম্মেল হক চৌধুরী এবং ওই পত্রিকায় সড়ক অব্যবস্থাপনা, পরিবহন নৈরাজ্য ও যাত্রীদের অধিকার নিয়ে লেখালিখি করতেন। এর পাশাপাশি সড়কে প্রাণহানির ঘটনায় সোচ্চার ছিলেন তিনি।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, "আমার স্বামী সড়কে নিপীড়িত যাত্রীদের অধিকারের কথা বলতেন। তিনি কখনো কোন অন্যায় করেননি, অন্যায়ের সঙ্গে আপোষ করেন নাই, তিনি সত্যের সঙ্গে লড়েছেন। এটাই কি তার অপরাধ?

স্বামী আটকের ঘটনাকে চক্রান্তমূলক হিসেবে দাবি করলেও কে বা কারা এর পেছনে জড়িত থাকতে পারে সে বিষয়ে কোন সন্দেহের কথা বলতে চাননি মিসেস চৌধুরী।

তিনি বলেন, "আমি শুধু এটা জানি যে তাকে ষড়যন্ত্রমূলক-ভাবে ফাঁসানো হয়েছে। তাঁর ভাবমূর্তি নষ্ট করা হয়েছে। কারা ফাঁসিয়েছে সেটা বের করার জন্য আমরা বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেছি। যারা জড়িত তাদের শাস্তি দাবি করেছি।"

আরও পড়তে পারেন: