বিক্ষোভ সমাবেশ করে কতটা কী লাভ হয়?

ছবির উৎস, Pixabay/Public Domain
(বিবিসির সামাজিক সম্পর্ক বিষয়ক সংবাদদাতা ভ্যালেরিয়া পিরাসোর প্রতিবেদন)
এই গ্রীষ্মে সারা বিশ্ব জুড়ে হাজার হাজার মানুষ নানা কারণে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন। তাদের ক্ষোভের বিষয়ের মধ্যে রয়েছে ভেনিজুয়েলায় বিদ্যুতের ঘাটতি থেকে শুরু করে ইরাকে দুর্নীতি, এমনকি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইউরোপ সফরও।
''প্রতিবাদ করাটা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটা আমাদের আশা জোগায়,'' বলছেন এ্যালেন রোল্যান্ড, যিনি সেই হাজার হাজার বিক্ষোভকারীর একজন যারা মধ্য জুলাইয়ে লন্ডনের রাস্তায় প্রতিবাদ সমাবেশ করেছিলেন। '' এটা এতো বেশি ইতিবাচক যে,আমি বিশ্বাস করতে পারি, পরিবর্তন আসা সম্ভব।''
আকর্ষণীয় শ্লোগান আর ব্যানার নিয়ে ট্রাম্প বিরোধী ওই সমাবেশ হয়েছে লন্ডন, ব্রাসেলস, হেলসিংকিতে, যা অনেক সংবাদ মাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা ছাড়া, এরকম অনুমতি নিয়ে করা বিক্ষোভ সমাবেশ কি আসলে কিছু অর্জন করতে পারে?
আর যারা ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে পশ্চিমে বিক্ষোভ করে যে, তারা তাকে পছন্দ করছে না, অন্যদিকে দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোয় বা মধ্যপ্রাচ্যে যারা নিজেদের অধিকারের দাবিতে বিক্ষোভ করছে, তাদের মধ্যে কতটা মৌলিক পরিবর্তন রয়েছে?
এখন অনেক মানুষজন সেই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন।
বিবিসি বাংলার আরো খবর:

ছবির উৎস, gdeltproject.org
২০০৩ সালের শীতে প্রায় দশ লাখ মানুষ লন্ডনের রাস্তায় সমাবেশ করেছেন যাতে ব্রিটিশ সরকার ইরাকের যুদ্ধে না জড়ায়।
'যুদ্ধ বন্ধ করো' শিরোনামের এই সমাবেশ ছিল যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে বড়। একই ধরণের সমাবেশ হয়েছে আরো অন্তত ৬০টি দেশে।
''আমাদের সত্যিই এটা মনে হয়েছিল যে, সবাই মিলে আমাদের সেই ক্ষমতা রয়েছে যে, আমার ঘটনাপ্রবাহ বদলে দিতে পারবো'' বলছেন ২৭ বছরের স্প্যানিশ কারমেন গার্সিয়া, যিনি লন্ডনে বসবাস করেন। ''আমি ব্যক্তিগতভাবে অসংখ্য মানুষের ক্ষমতার বিষয়টি অনুভব করেছি।''

ছবির উৎস, Rosey Taylor
কিন্তু জনসাধারণের এই স্বতঃস্ফূর্ত বিরোধিতা সত্ত্বেও, কয়েক সপ্তাহ পড়েই যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্য ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়েছিল।
বিক্ষোভ সমাবেশ নিয়ে যারা প্রশ্ন তোলেন, তাদের কাছে এটি বড় একটি উদাহরণ। ওই সমাবেশ ছিল বিশাল, সংগঠিত কিন্তু বাস্তবে তার কোন ফলাফল অর্জিত হয়নি।
বিক্ষোভ কর্মসূচী নিয়ে একটি বইয়ের যৌথ লেখক নিক সার্নিচেক এবং অ্যালেক্স উইলিয়ামস ওই ঘটনাকে বর্ণনা করেছেন 'জনগণের রাজনীতি' বলে।
তারা বলছেন, '' বিক্ষোভ দেখানো এখন অনেকের কাছে রাজনীতি বিষয়ক বিনোদন অথবা রাজনীতি মাদকের স্বাদ গ্রহণ করার মতো, যাতে আসলে সমাজের কোন পরিবর্তন হয়না।''

ছবির উৎস, Getty Images
কিন্তু সেটি পরিমাপের মাপকাঠি কী?
তবে তাদের মতো সবাই পশ্চিমা গণতন্ত্রের বিক্ষোভ সমাবেশকে এভাবে নাকচ করে দিতে চান না।
ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির রাজনীতি বিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক ওলগা ওনুচ বলছেন, 'রাস্তায় সংগঠিত বিক্ষোভ সমাবেশ এটাই সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মানুষের পরিবর্তন চাওয়ার অধিকার এবং শক্তি আছে।
'' আমি মনে করি না, প্রতিবাদকারীরা আশা করছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প বিমান ঘুরিয়ে ফেরত আসবেন। এটা আসলে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরা যে, যা ঘটছে তা আমাদের পছন্দ না এবং আমরা সশরীরে উপস্থিত হয়ে সেটা তুলে ধরছি।''

ছবির উৎস, VALERIA PERASSO
অনেকে ট্রাম্প বিরোধী এসব বিক্ষোভকে ১৯৬৩ সালের ভিয়েতনাম যুদ্ধ বিরোধী বিক্ষোভের সঙ্গে তুলনা করেন।
''নৈতিক অবস্থান তৈরির জন্য সেসব বিক্ষোভ সমাবেশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল'' বলছেন এল এ কাউফম্যান, যিনি এ ধরণের বিক্ষোভ নিয়ে কয়েকটি বই লিখেছেন। '' সেটি মানুষজনকে তাদের নিজেদের নিয়মিত জীবনের বাইরে অনেক বড় কিছুর অংশ হওয়ার অনুভূতি তৈরি করে দেয়।''

ছবির উৎস, Ted Soqui / Getty Images
হার্ভাড এবং স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, পশ্চিমা দেশগুলোর এরকম প্রতিবাদ সমাবেশে রাতারাতি নীতিগত পরিবর্তন হয়তো হয় না, কিন্তু সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব তৈরি করে। কারণ তারা মানুষজনকে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় করে তোলে।
লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্সের অধ্যাপক ডেভিড গ্রেবের বলছেন, ''দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব রয়েছে। আমাদের মধ্যে দ্রুত ফলাফল পাওয়ার একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। যদি কোন বিক্ষোভের পরদিনই আইনের পরিবর্তন না ঘটে, আমরা মনে করি যে সেটি ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু অবশ্যই তা নয়।'
আবার বিশাল কোন সমাবেশ হলেই যে সেটা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছে, তা নাও হতে পারে।
যেমন ব্রিটেনে ব্রেক্সিট বিরোধী সমাবেশটি বিশাল হয়েছিল, কিন্তু সেটি যুক্তরাজ্যকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়া বন্ধ করতে পারেনি।

ছবির উৎস, EPA
ভৌগলিক সীমারেখা
যদিও এই গ্রীষ্মে ইউরোপে অনেক বিক্ষোভ হয়েছে ,যা ছিল শান্তিপূর্ণ। কিন্তু বিশ্বের অন্যান্য স্থানে যেসব প্রতিবাদ সমাবেশের ঘটনা ঘটেছে, তার চেহারা সেরকম ছিল না।
নিকারাগুয়ায় প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল ওর্টেগার বিরুদ্ধে মাসব্যাপী বিক্ষোভে মারা গেছে তিনশোজনের বেশি মানুষ।
গাজায় ইসরায়েল সীমান্তে বিক্ষোভের সময় নিহত হয়েছে অন্তত ১৩০জন। বিদ্যুৎ ঘাটতি আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করতে গিয়ে ইরাকে বেশ কয়েকজন নিহত হয়েছেন।
বিদ্যুৎ ঘাটতির প্রতিবাদে ভেনিজুয়েলায় আর পেনশন পদ্ধতির সংস্কারের প্রতিবাদে রাশিয়াতেও বিক্ষোভ হয়েছে।

ছবির উৎস, Inti Ocon / Getty Images
ওনুচ বলছেন, এ ধরণের বিক্ষোভ আসলে অনেক আলাদা।
''সেখানে অনেক সময় মৌলিক অধিকারের প্রশ্ন জড়িত থাকে। সেখানে আবশ্যকতা, হতাশা আর জীবনের প্রশ্ন জড়িত থাকে, যা আসলে পশ্চিমা দেশগুলোর ক্ষেত্রে দেখা যায় না।''

ছবির উৎস, Getty Images
সামাজিক মাধ্যমে বিক্ষোভ
সামাজিক মাধ্যম আর মোবাইল ফোনের কারণে সারা বিশ্ব জুড়েই এখন প্রতিবাদ বিক্ষোভের ধরণে বড় পরিবর্তন এসেছে।
ডিজিটাল যুগের বিক্ষোভ হয়তো একটি টুইট বা ফেসবুকের একটি পোস্ট দিয়েই ঘটে যাচ্ছে।
সেখানে অনেক সমাবেশে কোন নেতা থাকে না, বিভিন্ন ধরণের মানুষ ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্যে তাদের বিভিন্ন মত তুলে ধরেন।

ছবির উৎস, NurPhoto / Getty Images
রাস্তাঘাটের বিক্ষোভে অনেক সময় সহায়ক ভূমিকা পালন করে সামাজিক মাধ্যম।
অধ্যাপক ওনুচ বলছেন, '' বিক্ষোভে অংশ নিয়ে আপনার হয়তো ভালো লাগবে, কারণ আপনার মতে হতে পারে যে,আপনি সামাজিক দায়িত্ব পালন করছেন।''
যেমন বিবিসি সংবাদদাতা দেখতে পেয়েছেন, লন্ডনে ট্রাম্প বিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেয়া লোকজন নানা কারণে সেই সমাবেশে অংশ নিয়েছেন।
কিন্তু এটা পরিষ্কার যে, তারা সবাই যৌথভাবে কিছু করার ক্ষমতা অনুভব করেছেন।
অধ্যাপক এলএ কাউফম্যান বলছেন, বড় কোন যাত্রা এভাবেই শুরু হয়। কারণ কোন কিছুর পরিবর্তন আনার লড়াই বেশ লম্বা আর শক্ত লড়াই।








