বিপ্লবী না স্বৈরশাসক, নিকারাগুয়ার প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল ওর্তেগা আসলে কে?

মিঃ ওর্তেগা এবং তার স্ত্রী, যাকে ভাইস প্রেসিডেন্ট নিয়োগ করা হয়েছে, তাদের পদত্যাগের দাবীতে বিক্ষোভ চলছে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মিঃ ওর্তেগা এবং তার স্ত্রী, যাকে ভাইস প্রেসিডেন্ট নিয়োগ করা হয়েছে, তাদের পদত্যাগের দাবীতে বিক্ষোভ চলছে
    • Author, ইভা অনটিভেরোস
    • Role, বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস

নিকারাগুয়ায় স্বৈরশাসনের অবসান ঘটানো সান্দিনিস্তা বিপ্লবের আজ ৩৯ বছর পূর্তি হচ্ছে। কিন্তু সেই বিপ্লবের অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র ড্যানিয়েল ওর্তেগা নিজেই এখন স্বৈরশাসক হিসেবে নিন্দিত।

বার্ষিকী উদযাপনকে মাটি করে দিয়েছে প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল ওর্তেগা সরকারের বিরুদ্ধে নিষ্পেষণ আর নিপীড়নের অভিযোগ এক সময়ের অত্যন্ত সম্মানিত বিপ্লবী মিঃ ওর্তেগা এখন নিন্দিত।

নিকারাগুয়ার রাস্তায় গত মে মাস থেকে এ পর্যন্ত সরকার বিরোধী বিক্ষোভে অন্তত ৩০০ মানুষ মারা গেছে। এছাড়া পুলিশি নিপীড়নে আহত হয়েছেন বহু মানুষ।

৭২ বছর বয়সী এখন আর দেশটিতে কিংবদন্তীতুল্য মুক্তিযোদ্ধা নন। তার বদলে সত্তরের দশকে যে নিষ্ঠুর সোমোজা সাম্রাজ্যের শাসন থেকে সান্দিনিস্তা গেরিলারা দেশকে মুক্ত করেছিল, সেই স্বৈরশাসকদের সাথে তাকে তুলনা করা হচ্ছে। মিঃ ওর্তেগা সেসময় ছিলেন একজন সান্দিনিস্তা গেরিলা।

কিন্তু গত তিনমাস ধরে দেশটিতে চলছে সহিংসতা। সারাদেশে হাজার হাজার মানুষ মিঃ ওর্তেগা এবং তার স্ত্রী, যাকে ভাইস প্রেসিডেন্ট নিয়োগ দেয়া হয়েছে, তাদের পদত্যাগের দাবীতে বিক্ষোভ করছেন। আগাম নির্বাচনেরও দাবী জানাচ্ছেন তারা।

সরকার বিরোধী বিক্ষোভ

A young Daniel Ortega

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, তরুণ বয়েসে দানিয়েল ওর্তেগা

সেন্ট্রাল অ্যামেরিকার দেশগুলোর মধ্যে নিকারাগুয়া সবচেয়ে দরিদ্র দেশ, আর পশ্চিমে গোলার্ধের দেশগুলোর মধ্যে দারিদ্রের হিসেবে হাইতির পরই নিকারাগুয়ার অবস্থান।

এপ্রিলে দেশটির সরকার কর বাড়িয়ে অবসর ভাতা কমানোর উদ্যোগ নিলে প্রতিবাদে ফেটে পড়ে পুরো দেশ। ছাত্ররা বিক্ষোভ শুরু করলে আদিবাসী আন্দোলন কর্মীরা তাতে যোগ দেয়। এরপর বেকার এবং প্রবীণ নাগরিকেরাও যুক্ত হন বিক্ষোভে।

কিন্তু বিক্ষোভে সাড়া না দিয়ে দমনের নির্দেশ দেন মিঃ ওর্তেগা। পুলিশ এবং প্যারা মিলিটারি বাহিনী মোতায়েন করা হয় এবং বিক্ষোভ সহিংস হয়ে ওঠে।

নির্মমভাবে বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা চালানো হয়। এদিকে, ছাত্ররা তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদী ক্যাম্প স্থাপন করে।

প্ল্যাকার্ডে লেখা, "ওরা ছাত্র অপরাধী নয়"

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, প্ল্যাকার্ডে লেখা, "ওরা ছাত্র অপরাধী নয়"

নাস্তায় বুলেট

সহিংস বিক্ষোভের মাত্রা দেশটির নাগরিকদের আতঙ্কিত ও বিমূঢ় করে তোলে। সরকারী ভাষ্য অনুযায়ী এতে কেউ নিহত হয়নি বলে দাবী করা হচ্ছে। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শী, সাংবাদিক ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, ভিন্ন ভিন্ন ঘটনায় এ পর্যন্ত অন্তত ৩০০ মানুষ নিহত হয়েছেন।

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বিক্ষোভ দমনে সরকার অতিরিক্ত শক্তির ব্যবহার করছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, সরকারী বাহিনীর নিপীড়ন শোচনীয় অবস্থায় পৌঁছেছে।

সর্বশেষ ঘটনায় মানাগুয়ার বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের অবরোধ করে গুলি চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। দেশটির একজন সাংবাদিক টুইট করেছেন, "সকালের নাস্তায় তারা এক ঝাঁক বুলেট ছুড়ে দিলো।"

এদিকে, সংঘাত বন্ধে সরকার এবং সরকারবিরোধীদের মধ্যে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছিলেন দেশটির রোমান ক্যাথলিক বিশপেরা।

এখন তাদের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ওর্তেগা অভিযোগ করছেন, তাকে উৎখাতের পরিকল্পনায় সমর্থন দিচ্ছেন নিকারাগুয়ার বিশপেরা।

পুলিশি হামলায় নিহত একজনের লাশ নিয়ে বিক্ষোভ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, পুলিশি হামলায় নিহত একজনের লাশ নিয়ে বিক্ষোভ

তরুণ ওর্তেগার বেড়ে ওঠা

ওর্তেগা বড় হয়েছেন তার বিদ্রোহী বাবার গল্প শুনে, যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন।

পঞ্চাশের দশকে মিঃ ওর্তেগা নিজেই মার্কিন সমর্থিত সোমোজা সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়াই এ যুক্ত হন। পরে তিনি সন্ত্রাসের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে সাত বছর জেল খাটেন। ১৯৭৪ সালে জেল থেকে বেরিয়ে তিনি সান্দিনিস্তা ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্টে যোগ দেন।

১৯৭৯ সালে সোমোজা সাম্রাজ্যের পতন হয়। সান্দিনিস্তা আন্দোলনে জনপ্রিয় নেতা হয়ে ওঠেন মিঃ ওর্তেগা।

নিকারাগুয়ার জাতীয় সংস্কার কর্মসূচীর সমন্বয়ক নির্বাচিত করা হয় তাকে। নতুন এক নিকারাগুয়া তৈরির সংকল্প নিয়ে শিক্ষা, সামাজিক সংস্কার এবং ভূমি সংস্কারের কাজ শুরু হয়।

এর পাশাপাশি ক্যাস্ট্রোর প্রো-সোভিয়েত কিউবার ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠা এবং এল-সালভাদরের বামপন্থী গেরিলাদের অস্ত্র দেবার অভিযোগ ওঠে তাদের বিরুদ্ধে। কিন্তু ১৯৯০ এর দিকেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মুখ থুবড়ে পড়ায় জনপ্রিয়তা হারাতে থাকেন ওর্তেগা।

সান্দিনিস্তা বিদ্রোহী

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সান্দিনিস্তা বিদ্রোহীদের প্রথম জনসমক্ষে যেদিন দেখা গিয়েছিল

প্রায় বারো বছর ক্ষমতায় থাকার পর মিঃ ওতের্গা জানিয়ে দেন, তিনি পদত্যাগ করবেন না বা আগাম নির্বাচনও দেবেন না।

তার বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি এবং সরকারী অর্থের অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু দক্ষিণ অ্যামেরিকার অন্য কম্যুনিস্ট দেশ যেমন কিউবা বা ভেনেজুয়েলার চেয়ে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে বেশ অগ্রসর ছিল নিকারাগুয়া, যে কারণে অভিযোগ সত্ত্বেও মিঃ ওর্তেগার বিরুদ্ধে আগে বড় বিক্ষোভ হয়নি।

কিন্তু এবার এত মানুষ হতাহতের পর জনগণ আর তাকে কতটা সমর্থন দেবে তা নিয়ে সংশয়ে আছেন খোদ তার দলের নেতারাই।