আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
পেরুতে আলবার্তো ফুজিমোরির শাসনামলে জোরপূর্বক বন্ধ্যা করে দেয়া হয়েছে এমন নারীদের গল্প
পেরুতে আন্দিজ পর্বতমালার গা ঘেঁষে ছোট শহর ইসকুচাকা। সেখানে সারি সারি এক তলা ঘর ঘিরে রয়েছে ইউক্যালিপটাস আর পাইন গাছ।
সেখানে একটি ঘরে জড়ো হয়েছেন একদল নারী। যাদের সবার গল্প কিছুটা একই রকম। মিথ্যা তথ্য দিয়ে তাদের বন্ধ্যা করে দেয়া হয়েছে। হোসেফিনা খিসফে তাদের একজন।
তিনি বলছেন, "একদিন সকালে আমি আমার রান্নাঘরে রান্না করছিলাম। দুজন নার্স আমার দরজায় এলো। ওরা আমাকে বলল, তুমি আমাদের ক্লিনিকে একটু আসবে? তোমার সাথে আমাদের কিছু কথা আছে"
হোসেফিনা বর্ণনা করছিলেন এরপর কি হল, "ওরা আমাকে একটি ঘরে নিয়ে জিজ্ঞেস করলো আমার কটা বাচ্চা। আমি বললাম পাঁচ। ওরা আমাকে বলল, আর কতকাল তুমি শুয়োরের মতো এমন বাচ্চা পয়দা করবে? আমি কাঁদতে আরম্ভ করলাম। কয়েকজন নার্স মিলে জোর করে আমার কাপড় খুলে আমাকে সাদা একটা রোব পরিয়ে দিলো"
হোসেফিনাকে একটি ইনজেকশন দেয়া হয়েছিলো। জ্ঞান ফেরার পরও তিনি বুঝতে পারেন নি আসলে তার সাথে কি অন্যায় ঘটে গেছে।
শুধু এই এলাকাতেই দুই হাজার নারীকে এভাবে কায়দা করে বন্ধ্যা করে দেয়া হয়েছে।
দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট আলবার্তো ফুজিমোরির শাসনামলে ১৯৯০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত প্রায় তিন লাখ নারীকে বন্ধ্যা করা হয়েছে যা স্বেচ্ছায় হওয়ার কথা।
কিন্তু অনেক নারীই অভিযোগ করছেন তারা এ সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। এমন ঘটনা শিকার মূলত গ্রামীণ নারীরা।
তাদের একটি বড় অংশ আদিবাসী। কনসেপসিওন কনটয় গিয়েছিলেন স্থানীয় হাসপাতালে সন্তান প্রসব করতে।
তিনি তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করছিলেন, "আমার ছেলেটা জন্ম হওয়ার পর আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম। আমার জ্ঞান ফিরল পরদিন সকাল সাতটার দিকে। আমি টের পেলাম আমার পেটে একটা অংশ কাটা।"
"আমার স্বামী আমাকে দেখতে এলো। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম ওরা আমার কি করেছে। আমার পেট কাটা কেন? আমার স্বামী ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করতে গেলে ওরা তাকে বলল, তোমার স্ত্রীর ভিটামিন দরকার। এখন তাড়াতাড়ি এই কাগজটায় সই করো"
সেখানকার আদিবাসীরা মূলত কেচুয়া ভাষায় কথা বলেন। স্প্যানিশ ভাষায় লেখা কাগজে লেখা সেটি না বুঝেই সই দিয়েছিলেন কনসেপসিওনের স্বামী।
তিনি জানতেও পারেন নি তিনি আসলে বন্ধ্যা-করনের কাগজে সই করছেন।
পেরুতে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন হাজার হাজার নারীকে এভাবে জোরপূর্বক বন্ধ্যা-করনের জন্য সাবেক প্রেসিডেন্ট আলবার্তো ফুজিমোরির বিচার হবে কিনা।
এপ্রিলে তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেছেন রাষ্ট্র-পক্ষের কৌসুলি।
পেরুতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যমেনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের নির্বাহী পরিচালক মারিনা নাভারো।
তিনি বলছেন, "যেসব নারীকে জোর করে বন্ধ্যা করা হয়েছে, তাদের প্রতি যে অবিচার হয়েছে তার বিচারের প্রথম ধাপ হল আলবার্তো ফুজিমোরির বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের"
কিন্তু হাজার হাজার নারীর ক্ষতিপূরণের কথাও মনে করিয়ে দিলেন তিনি।
এত কিছুর পরেও পেরুতে এমন অনেকেই রয়েছেন যারা মনে করনে না এখানে কোন অন্যায় হয়েছে।
তাদের একজন ফুজিমোরির রাজনৈতিক দলের কংগ্রেসম্যান কার্লোস টুবিনো।
তিনি বলছেন, "ফুজিমোরি যখন ক্ষমতায় ছিলেন তখন সরকার এমন কোন আদেশ জারি করে নি। কাউকে যদি বন্ধ্যা করা হয় তাহলে তা তাদের ইচ্ছেতেই করা হয়েছে। আর কাউকে যদি জোর করে বন্ধ্যা করা হয় তার জন্যে একটি দেশের রাষ্ট্রপতি দায়ী নন"
সাবেক প্রেসিডেন্ট আলবার্তো ফুজিমোরি এখন মৃত্যুপথযাত্রী। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হলে তার বিচার হয়ত হবে না।
কিন্তু অন্তত অভিযোগ যে দায়ের হয়েছে তাতে আশার সঞ্চার হয়েছে হাজার হাজার নারীর মনে।