গুলশান হামলার পর যেভাবে বদলে গেছে বাংলাদেশ-ভারত নিরাপত্তা সহযোগিতা

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
- Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় হলি আর্টিসান বেকারিতে জঙ্গী হামলার দুবছরের মাথায় এসে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা একটা নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।
তারা বলছেন, এই প্রক্রিয়া যদিও আরও কয়েক বছর আগেই শুরু হয়েছিল, কিন্তু হলি আর্টিসানের ঘটনার পর তা যেন নতুন মোড় নিয়েছে ও অসম্ভব গতি পেয়েছে।
এক দেশের হাতে বন্দী-কে অন্য দেশকে জেরা করতে দেওয়া, কিংবা 'রিয়েল টাইম' গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ও এখন অহরহ ঘটছে প্রায় রুটিনের মতো - যা মাত্র এক দশক আগেও অকল্পনীয় ছিল।
ঢাকার অভিজাত এলাকার একটি ক্যাফেতে সশস্ত্র জঙ্গীরা বহু লোককে জিম্মি করে ফেলেছে, ২০১৬র ১লা জুলাই রাতে ঢাকার গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দিল্লিকে সে খবর জানিয়েছিল মাত্র মিনিটকয়েকের মধ্যেই।

ছবির উৎস, NurPhoto
ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল তারপর সারারাত ফোনের পাশে বসে পরিস্থিতি মনিটর করে গেছেন, কয়েক মিনিট পর পর নিয়েছেন অবস্থার আপডেট।
সেটা শুধু জিম্মিদের মধ্যে ভারতীয় নাগরিকরা ছিলেন বলেই নয়, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভারত-বাংলাদেশের সহযোগিতা একটা ভিন্ন পর্যায়ে ছিল বলেই। পরবর্তী দুবছরে সেই সহযোগিতার গ্রাফ ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
ঢাকায় নিযুক্ত সাবেক ভারতীয় হাই কমিশনার ভিনা সিক্রি বিবিসিকে বলছিলেন, "ওই ঘটনার পর বাংলাদেশ যেভাবে কাউন্টার-টেরিরজম বা ডি-র্যাডিক্যালাইজেশনের মতো কঠিন সব কাজে হাতে দিয়েছে তাতে ভারত কিন্তু সক্রিয় সহযোগিতা করে আসছে। এই ধরনের বড় মাপের কোনও হামলা হলে তারপর এই চেষ্টাটা প্রতিনিয়ত চালিয়েই যেতে হয়, থামলে চলে না।"
"আর ভারত-বাংলাদেশ এক্ষেত্রে যেভাবে হাত মিলিয়ে চলছে, তার অনেকগুলো ইতিবাচক প্রভাব এর মধ্যেই দেখা যাচ্ছে - এই অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি কমাতেও তা প্রবলভাবে সাহায্য করেছে।"

ছবির উৎস, Getty Images
দিল্লির স্ট্র্যাটেজিক থিঙ্কট্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালিসিসের গবেষক ড: স্ম্রুতি পট্টনায়কও বলছিলেন, দুই দেশের বিভিন্ন সংস্থা যেভাবে নিজেদের মধ্যে সমন্বয় রেখে ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করে চলছে, সেটা আসলেই একটা সাঙ্ঘাতিক ব্যাপার।
তার কথায়, "রিয়েল টাইম ইনটেলিজেন্স হল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মানে কে কখন কোথায় যাচ্ছে, কী করছে - এগুলো শেয়ার করাটাই বলে দেয় দুটো দেশের মধ্যে একটা আস্থা বা ভরসা কাজ করছে।
"ভারতের ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (যারা বর্ধমান বিস্ফোরণের তদন্ত করেছিল) এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের অ্যান্টি-টেররিজম ইউনিট যেমন নিজেদের মধ্যে সমন্বয় রেখে কাজ করছে। তথ্য বিনিময় হচ্ছে দুদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ আর বিজিবির মধ্যেও, কারণ জঙ্গীদের সীমান্ত পারাপারও লেগেই আছে", বলছিলেন তিনি।
দুদেশের জঙ্গীরাই যে সীমান্তের অন্য পাড়ে গিয়ে ঘাঁটি গড়ার চেষ্টা করছে - এ খবরও নতুন নয়। কিন্তু যে জিনিসটা নতুন তা হল, সন্দেহভাজন জঙ্গীরা যেখানেই ধরা পড়ুক না কেন, ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দেশের গোয়েন্দারাই এখন তাদের জেরা করার সুযোগ পাচ্ছেন - জানাচ্ছেন স্ম্রুতি পটনায়ক।
"অন্য দেশে বন্দী হওয়া লোকজনের অ্যাকসেস পাওয়াটা আমি বলব বিরাট একটা ব্যাপার। মানে বাংলাদেশে গ্রেফতার হয়েছে অথচ ভারত তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারছে - কিংবা এর উল্টোটা, আমি তো বলব দুদেশের নিরাপত্তা সম্পর্কে একটা মাইলফলক!"
আগে বাংলাদেশের বা ভারতের জঙ্গীবাদের সমস্যা যার যার নিজের ব্যাপার এবং সেই দেশকেই তা মোকাবিলা করতে হবে - এমন একটা দৃষ্টিভঙ্গী থাকলেও বিশেষত হলি আর্টিসানের পর তার আমূল পরিবর্তন হয়েছে বলে পর্যবেক্ষকরা বলছেন।

ছবির উৎস, Getty Images
তবে নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণে হলি আর্টিসানের ঘটনা কতটা দক্ষভাবে সামলানো হয়েছিল, তা নিয়ে এক সময় কম প্রশ্ন ওঠেনি।
পরিস্থিতিতে সার্বক্ষণিক নজর রাখলেও সে রাতে ভারত কোনও প্রো-অ্যাকটিভ পদক্ষেপ নেয়নি, কারণ বাংলাদেশের দিক থেকে সেরকম কোনও অনুরোধ ছিল না।
ভারতের নামী নিরাপত্তা উপদেষ্টা রাহুল বেদীও মনে করেন, দুদেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা যতই থাকুক - আগামী দিনেও ভারতীয় কমান্ডোরা কখনও বাংলাদেশে ঢুকবে বলে তিনি মনে করেন না।
তার যুক্তি হল, "মাত্র কিছুদিন আগেও ভারত মালদ্বীপে পর্যন্ত কমান্ডো পাঠানোর কথা ভেবেও পিছিয়ে আসে। সেই মালদ্বীপের তুলনায় বাংলাদেশ অনেক বেশি সার্বভৌম, অনেক বড় দেশ - তাদের সেনাবাহিনীও অনেক বেশি শক্তিশালী। কাজেই বাংলাদেশে কমান্ডো পাঠানোর সম্ভাবনা ক্ষীণও নয় - আমি বরং বলব একেবারেই নেই।"
অর্থাৎ জঙ্গীবাদের মোকাবিলায় ভারত ও বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলি ইদানীং প্রায় একক ইউনিট হিসেবে কাজ করছে ঠিকই - কিন্তু পারস্পরিক সার্বভৌমত্বের প্রতি মর্যাদা দেওয়ার দিকেও সেখানে সতর্ক খেয়াল রাখতে হচ্ছে।








