করপোরেট কর কমানো হলে ব্যাংকগুলো কি ঋণের সুদের হার কমাবে?

ছবির উৎস, MUNIR UZ ZAMAN
- Author, কাদির কল্লোল
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
বাংলাদেশ সরকার ব্যাংক খাতের করপোরেট করহার ২.৫% কমানোর পরিকল্পনা নিয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, তিনি বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে আগামী অর্থ বছরের বাজেট পেশ করার সময় তামাক এবং মোবাইল ফোন ছাড়া অন্যসব করপোরেট কর কমানোর প্রস্তাব করবেন।
বিশ্লেষকদের অনেকে বলেছেন, ব্যাংকিং খাতে বড় অংকের ঋণ জালিয়াতি এবং দুর্নীতির পরও দ্রুত শাস্তির ব্যবস্থা না করে এই খাতকে নানান সুবিধা দেয়া হচ্ছে। এরপরও গ্রাহকের জন্য ঋণের সুদের হার বেড়েই চলেছে।
সরকার বলছে, ব্যাংক খাতে কিছু সমস্যার কারণে তাদের এখন সাহায্য প্রয়োজন হয়েছে।
ব্যাংক খাতের সংকট কমাতে সরকার এখন এই খাতের করপোরেট কর কমাচ্ছে।
এরআগে গত কয়েকমাসে তাদের বেশ কিছু সুবিধা দেয়া হয়েছে।
বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর যে পরিমাণ নগদ অর্থ অবশ্যিকভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রাখতে হয়, তার হার কমানো হয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত এসেছিল গত এপ্রিলে ঢাকার একটি পাঁচতারা হোটেলে অনুষ্ঠিত এক বৈঠক থেকে।অর্থমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মাকর্তাদের ব্যাংকার্স এসোসিয়েশনের সাথে হোটেলে ঐ বৈঠক নিয়ে তখন অনেক সমালোচনা হয়েছিল।
এরপরে বেসরকারি ব্যাংকের মালিকরা প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করে কিছু সুবিধা নিয়েছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে ব্যাংকগুলো গ্রাহকের ঋণে সুদের হার কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু তা কমেনি।

ছবির উৎস, AFP
আরও পড়ুন:
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডি'র নির্বাহি পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলছিলেন, ব্যাংক খাতে বিশৃংখলা বা বড় অংকের ঋণ জালিয়াতির সাথে জড়িতদের দ্রুত শাস্তির ব্যবস্থা না করে এই খাতে একের পর এক সুবিধা দেয়া হচ্ছে।
"দেখা যাচ্ছে যে, খারাপ ব্যাংকগুলোকে শাস্তি দেয়ার বদলে তাদের বিভিন্ন ধরণের উৎসাহই দেয়া হচ্ছে।ইনসেনটিফ দেয়া হচ্ছে। ব্যক্তি মালিকানার ব্যাংকগুলো সরকারি বিভিন্ন অর্থের ২৫%রাখা হতো। এখন সেটা ২৫% থেকে ৫০% বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এগুলোতো বিভিন্ন ধরণের উৎসাহই। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বার বার বলার পরও সুদের হারের উর্ধ্বগতি তারা কমাতে পারছে না।"
তিনি আরও বলেছেন, "ব্যাংকিং খাতকে চাঙ্গা করার জন্য যে প্রচেষ্টা, সেটাতো চাঙ্গা হচ্ছে না। এর বিনিময়ে সাধারণ জনগণ আসলে কী পাচ্ছে?"

গত কয়েক বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব সোনালী, জনতা এবং বেসিক ব্যাংকের বড় অংকের ঋণ কেলেংকারির ঘটনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে।
বেসরকারি ফারমার্স ব্যাংক তাদের আমানতের চেয়ে অনেক বেশি ঋণ দিয়ে সংকটে পড়েছে। তাদের এই সংকটের প্রভাব পুরো ব্যাংক খাতেই পড়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
তারা বলছেন, এসব ঘটনায় মামলাগুলোর কোনো কোনোটি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে ঠিকই।কিন্তু দ্রুত ব্যবস্থা না নেয়ায় ব্যাংকগুলো গ্রাহক সেবার প্রতি নজর দিচ্ছে না বিশ্লেষকরা মনে করেন।
ব্যবসায়ীদের প্রধান সংগঠন এফবিসিসিআই এর প্রেসিডেন্ট সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলছিলেন, গ্রাহক ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় খেলাপী ঋণ বা খারাপ ঋণ বাড়ছে।
"ব্যাংকিং ল (আইন) একটু রিভিজিট করা দরকার বলে আমি মনে করি।কারণ এখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি বা অর্থ মন্ত্রনালয়ের ইনভল্বমেন্ট, অল টুগেদার আমাদের ইন্টারেস্ট রেট অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাচ্ছে।"
"একজন নতুন যদি উদ্যোক্তা হয়, সে কিন্তু ঋণটা নিয়ে এই ১৩, ১৪ বা ১৫ শতাংশ সুদে তা ফেরত দিতে পারবে না।তখন খারাপ ঋণ বাড়বে।"
তবে বেসরকারি ব্যাংকের মালিকদের সংগঠন ব্যাংকার্স এসোসিয়েশনের একজন নেতা শহিদুল আহসান বলেছেন, সরকার তাদের যেসব সুবিধা দেয়ার প্রস্তাব করেছে,সেগুলো এখনও পুরো বাস্তবায়ন না হওয়ায় গ্রাহক ঋণের সুদের হার বাড়ত থাকছে।
"সরকারি করপোরেশনের যে অর্থ পাওয়ার কথা, সেটা পাওয়া যাচ্ছে না।আর সরকার অর্থ যেভাবে দেয়ার কথা বলা হয়েছিল, সেগুলো এখনও দেয়া হচ্ছে না।ফলে সুদের হার এখনও কমেনি।"
অন্যদিকে, সরকারের কাছ থেকে সুবিধা আদায়ে ব্যাংক মালিকদের বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টিরও অভিযোগ করেছন বিশ্লেষকরা। মালিকরা এবং সরকার তা অস্বীকার করছে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা ড: মশিউর রহমান বলছিলেন, ব্যাংক খাতের কিছু সমস্যার জন্য তাদের কিছুটা সহায়তা দেয়া হচ্ছে।
"ব্যাংকের এই সময় অনেকরকম অসুবিধার মধ্যে গেছে।সেজন্য তাদের কিছুটা রিলিফ দরকার।ব্যাংকের ট্যাক্স যদি কমায়, তাহলে সর্বোতোভাবে গ্রাহক সেবা বাড়বে এবং সুদের হার কমবে। আগে যে ডিপোজিট ব্যাংকগুোকে দিয়েছে, তা থেকে এখন ঋণ দিচ্ছে, সেকারণে সুদের হার বেশি আছে। নতুন ডিপোজিট থেকে ঋণ দেয়া হলে তখন সুদ কমবে।"
মালিকপক্ষ এবং সরকার বলছে, এখন অল্পসময়ের মধ্যে ব্যাংকের ঋণ সুদের হার কমবে। তবে বিশ্লেষকদের তাতে সন্দেহ রয়েছে।








