বাংলাদেশে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির ব্যাপারে কেন এই সতর্কতা?

ছবির উৎস, Getty Images
বাংলাদেশে উচ্চ মাধ্যমিক বা এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হওয়ার আগে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি না হওয়ার ব্যাপারে শিক্ষার্থীদেরকে সতর্ক করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ইউজিসি ২২টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম উল্লেখ করে বলছে, এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি সরকার বন্ধ করে দিয়েছে, কয়েকটির মালিকানা নিয়ে মামলা চলছে, কয়েকটির ক্যাম্পাস অনুমোদিত নয় এবং কোন প্রতিষ্ঠান এমন কোর্স পরিচালনা করছে যেসবের অনুমোদন নেই, কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ড নিয়ে আদালতে মামলা চলছে।
এছাড়াও বাংলাদেশে বিদেশি কোন উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার ব্যাপারেও সতর্ক করেছে তারা। ইউজিসি বলছে, দেশটিতে এখনও কোনো বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা, ক্যাম্পাস বা স্টাডি সেন্টার পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়নি।
ইউজিসি বলছে, "কেউ এরকম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হলে তার দায়-দায়িত্ব শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা ইউজিসি নেবে না।"
মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে তারা মানা করেন নি কিন্তু অতীতের কিছু খারাপ অভিজ্ঞতার কারণে তারা শিক্ষার্থীদেরকে সতর্ক করে দিয়েছেন।
মি. মান্নান বলেন, "সরকার দারুল ইহসান নামের একটি বিশ্ববিদ্যালয় ২০০৬ সালে বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু তারা আদালতের একটি স্থগিতাদেশ নিয়ে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যায়। এই ১০ বছরে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যেসব সার্টিফিকেট দেওয়া হয়েছিল সেগুলোকে সুপ্রিম কোর্ট বৈধতা দেয়নি। আমরা দেখেছি ওই এক দশকে তারা পৌনে দুই লাখের মতো সার্টিফিকেট বিক্রি করেছে। ফলে বহু অর্থ খরচ করে সন্তানকে সেখানে পড়িয়ে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা প্রতারিত হয়েছেন।"
আরো পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, UGC
মঞ্জুরি কমিশনের এধরনের সতর্কতা জারিকে সমালোচনা করেছে অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত ভিসি লায়লা পারভীন বানু বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "অনেক বিষয়ে মঞ্জুরি কমিশনের সাথে আমরা একমত হতে পারি না। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইলেও তারা সাড়া দেয় না। তখন তাদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আমাদের আদালতের আশ্রয় নিতে হয়।"
"যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন নেই তাদের বেলাতে এই সতর্কতা প্রযোজ্য হতে পারে। কিন্তু কোর্স কিম্বা ক্যাম্পাসের মতো বিষয়ে কমিশনের সাথে যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধ চলছে সেগুলোর জন্যে এটা প্রযোজ্য নয়," বলেন মিজ বানু।
ইউজিসির চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান বলেছেন, "২২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে এমন প্রতিষ্ঠানও আছে যেখানে মেডিকেল ফ্যাকাল্টি খোলা হয়েছে যা আইনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। কিন্তু এসব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি দেওয়া হচ্ছে। বিদেশি শিক্ষার্থীরা সেখানে পড়াশোনাও করছে। কিন্তু তারা তাদের দেশে ফিরে গিয়ে ডাক্তারি করতে পারে না। কারণ এসব সার্টিফিকেটের কোন স্বীকৃতি নেই।"
তিনি বলেন, অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে যতো শিক্ষার্থী ভর্তি করানোর কথা তারচেয়েও বেশি ছাত্রছাত্রীকে নেওয়া হচ্ছে। এরকম একটি ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের কনভোকেশন বাতিল করে দিয়েছিলেন।
"কারণ বিশ্ববিদ্যালয়টিতে যতো সংখ্যক শিক্ষার্থীর কনভোকেশন করার কথা ছিল দেখা গেছে তারচেয়েও বেশি সংখ্যক ছাত্রছাত্রীকে তারা সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন," বলেন তিনি।
তাহলে যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন নেই সেগুলো কিভাবে চালু আছে এই প্রশ্নের উত্তরে মি. মান্নান বলেন, আদালতের মাধ্যমে তারা তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
"আমরা যখনই ব্যবস্থা নেই, সঙ্গে সঙ্গে তারা আদালতে চলে যায়। সেখান থেকে একটি স্থগিতাদেশ নিয়ে তারা তাদের কাজকর্ম চালু রাখে। দারুল ইহসান একটি বড় উদাহরণ। এভাবে তারা ১০ বছর ধরে কার্যক্রম চালু রেখেছে।"
কিন্তু গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত ভিসি লায়লা পারভীন বানু বলেছেন, "দুটো পক্ষের মধ্যে বিরোধ থাকলে সেটা তো আদালত ও আইনের মাধ্যমেই সমাধান করতে হবে।"
বাংলাদেশ বর্তমানে ১০১টি অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। তার মধ্যে চালু আছে ৯১টি।
শিক্ষার্থীদের অনেকেই বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয় ঠিক মতো চলছে কিনা সেটা দেখার দায়িত্ব মঞ্জুরি কমিশনের। কিন্তু তারা সেটা করতে ব্যর্থ হয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সতর্ক করার মাধ্যমে উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপাতে চেষ্টা করছে।

ছবির উৎস, Getty Images
"এটা বলার সুযোগ নেই। কারণ কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে তারা আদালতের আশ্রয় নেয়। এবং সেটা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে।"
মি. মান্নান বলেন, "অনুমোদন ছাড়াই একটি বিশ্ববিদ্যালয় ছয় থেকে সাতটি কোর্স চালু রেখেছিল। আমরা যখন ওদেরকে সেসব বন্ধ করতে বললাম তারা আদালতে চলে গেল। আদালত তখন ছ'মাসের স্থগিতাদেশ দিল। পরে এই সময় আরো বাড়তেই লাগলো। আমরাও কোর্টে হাজিরা দিচ্ছি। কিন্তু কখনোই এর শুনানি হয় না।"
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন প্রত্যেক বছরেই এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলের আগে শিক্ষার্থীদেরকে এভাবে সতর্ক করে দেয়। কিন্তু তাতে যে খুব একটা কাজ হচ্ছে সেটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। কারণ সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে কখনো শিক্ষার্থীর অভাব হয়নি।








