বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত ২০ শহরের মধ্যে ১৪টিই ভারতে

ছবির উৎস, PRAKASH SINGH
- Author, অমিতাভ ভট্টশালী
- Role, বিবিসি, কলকাতা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, পৃথিবীর সবথেকে বেশি দূষিত ২০টি শহরের মধ্যে ১৪টিই আছে ভারতে।
এক সাম্প্রতিকতম রিপোর্টে 'হু' জানিয়েছে, সবথেকে দূষিত শহর হলো উত্তর প্রদেশ রাজ্যের কানপুর । সেখানে শূন্যে ভাসমান কণার পরিমাণ নিরাপদ স্তরের থেকে প্রায় ১৭ গুণ বেশি।
পিছিয়ে নেই জাতীয় রাজধানী দিল্লি আর তার লাগোয়া ফরিদাবাদ, বা উত্তর প্রদেশের প্রাচীন শহর বারাণসী।
বিজ্ঞানী ও পরিবেশবাদীরা বলছেন দূষণ নিয়ন্ত্রণের দিকে নজর না দিয়ে উন্নয়ন আর শিল্পায়ন হয়েছে এই ভারতীয় শহরগুলোতে - আর এটাই ব্যাপক বায়ুদূষণের একটা বড় কারণ।
পৃথিবীর ২০টি সবচেয়ে দূষিত শহরের যে তালিকা বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা প্রকাশ করেছে তাতে ভারতের শহরগুলি ছাড়াও কুয়েত, চীন আর মঙ্গোলিয়ার কয়েকটি শহর আছে।
পৃথিবীর চার হাজারেরও বেশী শহরে বায়ুতে ভাসমান ধুলিকণার নিয়মিত পরিমাপ বিশ্লেষণ করে 'হু' এই তালিকা বানিয়েছে।
উত্তর প্রদেশের যে কানপুর শহরকে সবথেকে দূষিত শহর বলা হচ্ছে, সেখানকার একজন আইনজীবি ও পরিবেশবাদী রবি শর্মা জানাচ্ছিলেন, কেন তাদের শহরে বায়ুদূষণের পরিমান এত বেশি।
"আমাদের শহরে গাছগাছালি খুবই কম। যদিও একটি মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী ১৬ % জমি পার্ক বা বৃক্ষায়ণের জন্য রাখা ছিল। কিন্তু সেই সব জমি অন্য কাজে বিলি অথবা বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। আইন বাঁচিয়েই করা হচ্ছে ব্যাপারটা। শহরের আয়তন বৃদ্ধি করে দেখানো হচ্ছে যে নির্দিষ্ট পরিমান জমি সবুজায়নের জন্য রাখা হচ্ছে। কিন্তু সরকারের হিসাবেই শহরের পুরনেো শহরের মাত্র এক শতাংশ জমিতে পার্ক রয়েছে," - বলছিলেন মি. শর্মা।
বিবিসি বাংলায় আরো খবর:

ছবির উৎস, Getty Images
এছাড়াও রাস্তা তৈরী হচ্ছে, অথচ তার পাশে আইন অনুযায়ী গাছ লাগানো হচ্ছে না, উন্মুক্ত মাটি রেখে দেওয়া হচ্ছে - যার ফলে ধুলিকণা অত্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে বলে জানাচ্ছিলেন কানপুরের পরিবেশবাদী রবি শর্মা।
কলকাতার পরিবেশবাদী সুভাষ দত্ত বহু বছর ধরে পরিবেশ দূষণের নানা দিক নিয়ে মামলা করে আসছেন। তিনি বলছিলেন, ভারতে পরিবেশ রক্ষার আইনগুলো শুধুই খাতায় কলমে রয়েছে, সেগুলোর প্রয়োগ হয় না।
মি. দত্তর কাছে জানতে চেয়েছিলাম যে ভারতের থেকেও অনেক উন্নত দেশ রয়েছে, যারা শিল্পস্থাপনের দিক থেকে অনেক এগিয়ে। সেইসব দেশের শহরগুলিতে তো পরিবেশ দূষণের সমস্যাটা এত ভয়ঙ্কর নয়!
এর কারণ ব্যাখ্যা করে মি. দত্তর মন্তব্য, "শিল্প ক্ষেত্রে দুই ভাবে আইন ভাঙ্গা হচ্ছে - তৈরীর সময়ে আর শিল্পকারখানা চালু হয়ে যাওয়ার পরেও। পরিবেশ রক্ষা ব্যবস্থাপণা করতে গেলে যে খরচ হয়, সেটাকে বাড়তি ব্যয় বলে মনে করে শিল্প মহল। তার মানেই শিল্পপতিদের মুনাফা কমে যাবে, তাই তারা পরিবেশ বিধি অমান্য করে চলেছেন।
"আর পরিবেশ আদালতগুলোকেও অকেজো করে দেওয়া হচ্ছে ধীরে ধীরে। এমন দিনও দেখতে হবে হয়তো যখন এইধরণের আন্তর্জাতিক রিপোর্টে সবকটি দূষিত শহর শুধুই ভারত থেকেই স্থান পাবে!"
পরিবেশ দূষণ ক্ষেত্রে ভারতের নামকরা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা সেন্টার ফর সায়েন্স এন্ড এনভায়রনমেন্টের বা সি এস ই-র এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ও বায়ুদূষণ বিশেষজ্ঞ অনুমিতা রায়চৌধুরী বলছিলেন, উন্নত দেশগুলিতে গোড়া থেকেই দূষণ নিয়ন্ত্রণের ওপরে কড়া নজর দিয়েছিল, যেটা ভারতে করা হয় না।

ছবির উৎস, DOMINIQUE FAGET
"শিল্পোন্নত দেশগুলিতেও গোড়ার দিকে বায়ুদূষণের প্রবল সমস্যা ছিল। লন্ডন স্মগ বা পেনসিলভানিয়া স্মগের কথা সকলেই জানি। কিন্তু ওখানে যেটা করেছিল যে, শিল্পোন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গেই পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রনের ওপরেও ব্যাপক জোর দেওয়া হয়েছিল। আমাদেরও উন্নত হতে হবে, কিন্তু একই সঙ্গে পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধি বা আইনগুলোকে কড়া ভাবে প্রয়োগ করতে হবে," বলছিলেন অনুমিতা রায়চৌধুরী।
জাপানের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলছিলেন, "তারা শিল্প বিনিয়োগের ২৫% অর্থ পরিবেশ দূষণরোধে কাজে লাগায়। আমাদের সেই সামর্থ নেই। তাই আমরা প্রথমে দূষণ সৃষ্টি করব, আর তারপরে সেই দূষণ পরিষ্কার করব - এটা আমাদের দেশে অসম্ভব। তাই প্রথম থেকেই পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রনে রাখতেই হবে।"
মিজ. রায়চৌধুরী আরও বলছিলেন যে শহরে বায়ু দূষণ নিয়ে সচেতনতার অভাব রয়েছে। আর সেই জন্যই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট এখণ নাগরিকদের স্বাস্থ্যের ওপরে দূষণের সরাসরি কী প্রভাব পড়বে, সেই হিসাব দিয়েছে।
বলা হচ্ছে সারা পৃথিবীতে প্রতিবছর শুধুমাত্র বায়ুদূষণের কারনেই ৪২ লক্ষ মানুষ মারা যাচ্ছেন।
পরিবেশবাদীদের আশা, যদি নিজের বা কাছের মানুষদের স্বাস্থ্যের ওপরে বায়ুদূষণের এই ভয়াবহ প্রভাব দেখে নাগরিকদের বা আইন রক্ষকদের চেতনা জাগে।








