বাংলাদেশ ব্যাংকের চুরি হওয়া অর্থ ফিরে আসবে কবে?

    • Author, সাইয়েদা আক্তার
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরির পর আজ দু'বছর পার হচ্ছে। কিন্তু চুরি যাওয়া মোট আট কোটি ১০ লক্ষ ডলারের মধ্যে সাড়ে ছয় কোটি ডলারেরও বেশি অর্থ এখনও ফেরত আনা সম্ভব হয়নি।

কবে সে অর্থ ফেরত পাওয়া যাবে, সে সম্পর্কেও কোন ধারণা দিতে পারছেন না কর্মকর্তারা।

এদিকে, এই ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিটির রিপোর্ট যেমন প্রকাশ করা হয়নি, তেমনি ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনও কর্মীর বিরুদ্ধেও।

তাহলে কতটা জোরদারভাবে চলছে চুরি যাওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা?

২০১৬ সালের আজকের দিনে অজ্ঞাতপরিচয় হ্যাকাররা ভুয়া ট্রান্সফার ব্যবহার করে নিউ ইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ থেকে সুইফটের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০ কোটি ১০ লক্ষ ডলার অর্থ হাতিয়ে নেয়।

এর মধ্যে দুই কোটি ডলার চলে যায় শ্রীলঙ্কা এবং ৮ কোটি ১০ লক্ষ ডলার চলে যায় ফিলিপিনের জুয়ার আসরে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঐ ঘটনাকে এই মূহুর্তে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ব্যাংক তহবিল চুরির একটি বলে ধরা হয়।

কিন্তু দুই বছর পার হবার পরেও চুরি হওয়া অর্থের সিংহভাগই ফিরিয়ে আনতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।

ফিলিপিন্সের ব্যাংক ও জুয়ার বাজারে চলে যাওয়া আট কোটি দশ লক্ষ ডলার ফেরত আনার জন্য বিষয়টি এখন অনেকটাই স্থবির আছে। বাকি অর্থ ফিরিয়ে আনার জন্য কি করছে কর্তৃপক্ষ?

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসানের কাছেএ প্রশ্ন রাখা হলে তিনি বলেন, "এর মধ্যে আদালতের আদেশের মাধ্যমে ২০১৬ সালের নভেম্বরে ফিলিপিন বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রায় দেড় কোটি ডলার ফেরত দিয়েছে।"

"বাকিটা মোটামুটি ট্রেস করা গেছে কোথায় কতটা আছে। এখন বাংলাদেশের মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিসটেন্স রিকোয়েস্টের মাধ্যমে এটা ফিলিপিন্স ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস এনিয়ে মামলা করছে। এখন সেই মামলার চুড়ান্ত নিস্পত্তি হলে টাকা ফেরত আনার বিষয়টি তরান্বিত হবে।"

"এরপরেও আমরা ফিলিপিন্সের বিভিন্ন সংস্থার সাথে যোগাযোগ রাখছি। আমাদের বিভিন্ন টিম যাচ্ছে সময় সময়।"

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

এ প্রসঙ্গে মি. রাজী হাসান উল্লেখ করেন, ফিলিপিন থেকে ৬০ লক্ষ ডলার ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সিআইডির একটি দল এই মূহুর্তে দেশটিতে রয়েছে।

মিঃ হাসান জানিয়েছেন, অর্থ পুনরুদ্ধারের জন্য মামলা করতে প্রস্তুত আছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, কিন্তু অর্থ পুনরুদ্ধারের জন্য মামলা ছাড়া অন্য ব্যবস্থাও তারা চালিয়ে যেতে চান।

কিন্তু শুরু থেকে রিজার্ভ চুরি, তদন্ত এবং অর্থ ফিরিয়ে আনা নিয়ে রয়েছে নানা রকম প্রশ্ন এবং সন্দেহ।

ঘটনার একমাস পর বিষয়টি ফিলিপিনের একটি পত্রিকার খবরের মাধ্যমে জানতে পেরেছিল বাংলাদেশ। দুই বছরেও অগ্রগতি খুবই কম।

এমন প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে, চুরি যাওয়া অর্থ ফেরাতে কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ যথেষ্ট কিনা? গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলছেন, এ নিয়ে কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে

"সরকারের দিক থেকে যেসব উদ্যোগ বা সিআইডির তরফ থেকে যে ধরণের উদ্যোগ রয়েছে, এগুলোকে 'কর্ম্পাটমেন্টাল' মনে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পাচারের যে ঘটনাগুলো হয়, সেক্ষেত্রে যে ধরণের উদ্যোগ নেয়া হয় তাতে বাংলাদেশের ঘাটতি রয়েছে" - বলেন মি. মোয়াজ্জেম.

"এ ধরণের ক্রস-বর্ডার অর্থনৈতিক অপরাধের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনজীবিদের সহযোগিতা নেয়াটা খুবই জরুরী। এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনা যেভাবে হ্যান্ডল করা হয়, সেই দৃষ্টিভঙ্গী রেখে এগুনো দরকার এখন।"

কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের যে সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যে ত্রুটির কারণে এ ঘটনা ঘটেছিল, সে সমস্যা দূর করার ক্ষেত্রে কতদূর এগোলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক? বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর মিঃ হাসান বলছেন, তারা পর্যাপ্ত উদ্যোগ নিয়েছেন

"যে ব্যবস্থায় চুরি হয়েছে, তা থেকে বেরিয়ে এখন ভিন্ন বিশেষ ব্যবস্থায় আমাদের কার্যক্রম চলছে। রিবিল্ডিং এর জন্য এখন ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক নিউ ইয়র্ক এবং সুইফটের সাথে পরামর্শ করেই আমরা নিরাপত্তা নিশ্চিত করছি।"

"এ ঘটনার পর সুইফটও তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার অনেক কিছু পরিবর্তন করেছে। এখন আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড মেনেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।"

এ ঘটনার প্রেক্ষাপটে সমালোচনার মুখে পদত্যাগ করেছিলেন সে সময়কার গভর্নর আতিউর রহমান। ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিটি ২০১৬ সালের এপ্রিলে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিলেও, আজ পর্যন্ত সে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। ব্যবস্থাও নেয়া হয়নি কোন কর্মীর বিরুদ্ধে।

বাংলাদেশ ব্যাংক এ নিয়ে একটি মামলা করেছিল, কিন্তু মামলাটির তদন্তের দায়িত্বে থাকা সংস্থা সিআইডি এ পর্যন্ত ২০ বার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আদালতের কাছ থেকে সময় চেয়ে নিয়েছে।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন: