বাংলাদেশে রেলে কাটা পড়ে কেন এত মানুষ মারা যায়?

ছবির উৎস, BBC Bangla
- Author, মীর সাব্বির
- Role, বিবিসি বাংলা
বাংলাদেশে রেল পুলিশের হিসেবে ২০১৬ সালে প্রায় এক হাজার মানুষ রেললাইনে কাটা পড়ে মারা যাওয়ার তথ্য তাদের কাছে রয়েছে। যদিও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আসল সংখ্যা এর চেয়ে বেশি।
অথচ প্রতিবছর এই বিপুলসংখ্যক মৃত্যুর পরও রেললাইনগুলো ব্যবহার হচ্ছে হাঁটার পথ হিসেবে, অথচ এটি যে আইনত: নিষিদ্ধ সেই খবরও অনেকেই রাখেন না।
কোন রেল ক্রসিংয়ের কাছে রেললাইনে হঠাৎ চোখ পড়লে এটি রেললাইন না রাস্তা বোঝা মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়।
ঢাকার কারওয়ান বাজার রেল ক্রসিংয়ে যেমনটা দেখা গেল রাস্তার দুপাশে কয়েক'শ মানুষ রেলাইন ধরে হাটছে। ট্রেন আসার ঘণ্টা পড়ে গেছে, তবুও অনেকের সরার লক্ষণ নেই। ট্রেন কয়েক সেকেন্ডের দুরত্বে আসার পর এক এক করে নেমে পাশে দাড়াতে শুরু করলেন কেউ কেউ।
"এখান দিয়ে গেলে সহজ হয়, অন্যদিক দিয়ে গেলে ঘুরে যাই্তে হয়"।
"অন্যদিক দিয়ে ময়লা এখান দিয়ে একটু পরিষ্কার আছে এজন্য যাচ্ছি"।
ট্রেন যাবার পর রেললাইন ধরে হাটার সহজ কারণ ব্যখ্যা করলেন কয়েকজন। তাদের মধ্যে একজন বছরখানেক আগে চোখের সামনে একজনকে ট্রেনে কাটা পড়ে তিন টুকরো হয়ে যেতে দেখেছেন । সেই দৃশ্যও তাকে দমাতে পারেনি। ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন সেই রেললাইন ধরেই।
এই রেল ক্রসিংয়ে ২০ বছর ধরে গেটম্যানের দায়িত্বে থাকা মোহাম্মদ বাহার বললেন, অনেকে রেললাইন ধরে হাটা নিরাপদ মনে করেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় যখন দুই দিক থেকেই ট্রেন আসে তখন তারা বুঝতে না পেরে একদিকে সরে দাঁড়ান এবং ট্রেনের নীচে পড়েন। এছাড়া অনেকেই রেললাইনে দাঁড়িয়ে মোবাইল ফোনে কথা বলেন বা হেডফোন লাগিয়ে রাখেন কানে।

ছবির উৎস, BBC Bangla
এমনকি এই কারওয়ান বাজারসহ বাংলাদেশের অনেক রেললাইনে বাজারও বসে।
বছরে রেলে কাটা পড়ে যে মৃত্যু হয় তার বড় একটি অংশ হয় ঢাকা জেলাতেই । রেল পুলিশের হিসেবেই বছরে গড়ে সেটি ৩০০-র কম নয়।
"এটা খুবই অস্বাভাবিক। এবিষয়টি নিয়ে আমাদের রেল কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এতটা নির্লিপ্ত কেন সেটাই আমার কাছে খটকা লাগে"- বলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন।
১৮৯০ সালের রেল আইনে রেললাইনের দুই পাশে ১০ ফুটের মধ্য দিয়ে মানুষের চলাচল নিষিদ্ধ। এমনকি এর মধ্যে গরু-ছাগল ঢুকে পড়লে সেটিকেও নিলামে বিক্রি করে দেয়ার ক্ষমতা রয়েছে রেল কর্তৃপক্ষের। রেলে কাটা পড়ে কেউ আহত হলে উল্টো ঐ ব্যক্তির বিরুদ্ধেই মামলা করতে পারে রেলওয়ে। এতসব কঠোর নিয়ম থাকার পরও প্রতিবছর হাজারের বেশি মানুষের এভাবে মৃত্যু কেন?
"আমরা খুব বিপদজনক একটি ধারণা তৈরি করে দিয়েছি যে রেললাইন এবং মানুষের জীবন সহাবস্থান করতে পারে। যেই যান থামতেই লাগে এক কিলোমিটার তার সাথে পথচারীএবং দোকানপাট সহাবস্থান করতে পারে না"।
"রেললাইনে প্রতিবছর এত মৃত্যুর দায় রেল কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এড়াতে পারে না" - বলেন অধ্যাপক হোসেন।
রেল পুলিশের হিসেবে ২০১৬ সালে পূর্বাঞ্চলে রেললাইনে মারা গেছেন ৭৭০ জন, যার একটি বড় অংশ ঢাকা অঞ্চলে। আর পূর্বাঞ্চলে মারা গেছেন ১৯৬ জন। কিন্তু এর বাইরেও ঝামেলার ভয়ে মারা যাওয়ার পর অনেকে পুলিশের কাছে রিপোর্ট না করে লাশ নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। সে হিসেবে আসল সংখ্যা আরো বেশি বলেই বিশেষজ্ঞদের ধারণা।

ছবির উৎস, BBC Bangla
দুর্ঘটনা এড়াতে রেললাইনকে সুরক্ষিত করার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। রেলওয়ের মহাপরিচালক আমজাদ হোসেন বলেন, তারা রেললাইন সুরক্ষিত করার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু সাড়া খুব একটা পাননি।
তিনি বলেন, টঙ্গি থেকে ভৈরব পর্যন্ত ৬১ কিলোমিটারজুড়ে তারা অর্ধকিলোমিটার পরপর পথচারীদের সতর্ক করার জন্য ব্যানার বসিয়েছিলেন। কিন্তু তারপরও সতর্কবার্তা দেখে কেউ নিরস্ত হয়নি।
মি. হোসেন বলছেন, সারাদেশে প্রায় ৪০০০ কিলোমিটার রেলপথে প্রাচীর বা বেড়া দিয়ে রেলপথ সুরক্ষিত করা বাস্তবসম্মত নয়। এক্ষেত্রে সচেতনতা তৈরির দিকেই তারা গুরুত্ব দিচ্ছেন।
কিন্তু যে রেললাইন দিয়ে চলাফেরা করা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে তা থেকে মানুষকে বিরত রাখা যে খুব সহজ হবে না, সেটিও স্পষ্ট।








