'আশা করছি ভারত-পাকিস্তান ফাইনালটা আগের ম্যাচটার মতো হবে না': আসিফ ইকবাল

"ফাইনালে যে কোন কিছুই হতে পারে। আমি আশা করি, খেলাটা এ টুর্নামেন্টে পাকিস্তান-ভারত প্রথম ম্যাচটা যে রকম হয়েছিল - সেরকম একতরফা হবে না।"

ক্রিকেটের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি ভারত আর পাকিস্তানের মধ্যে আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ফাইনালের আগে বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন সাবেক পাকিস্তানী ক্রিকেটার ও অধিনায়ক আসিফ ইকবাল।

এই ফাইনাল শুরু হতে যাচ্ছে রোববার সকালে লন্ডনের ওভালে।

"এবার চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে অনেক আপসেট হয়েছে, শ্রীলংকা ভারতকে হারিয়েছে, বাংলাদেশ নিউজিল্যান্ডকে হারিয়েছে। একদিনের ক্রিকেটে কোন দলই ফেভারিট নয়, সবার সম্ভাবনাই ৫০-৫০। ম্যাচের দিন যে ভালো খেলবে সেই জিতবে" - বিবিসি বাংলার মাঠে ময়দানে অনুষ্ঠানে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলছিলেন আসিফ ইকবাল।

অন্তত ১০ বছর পর এই প্রথম একটি ৫০ ওভারের বৈশ্বিক ক্রিকেট টুর্নামেন্টের ফাইনালে উঠেছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত আর পাকিস্তান। এর আগে ২০০৭ সালে ওয়ার্ল্ড টি২০-র ফাইনালে ভারত-পাকিস্তান মুখোমুখি হয়েছিল - যাতে জিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ভারত।

ভারত যে এবার চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ফাইনালে উঠতে পারে - এটা প্রায় সব বিশ্লেষকের বিবেচনাতেই ছিল। কিন্তু ফাইনালে যে তাকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলতে হবে - তা হয়তো কারোরই ভাবনায় ছিল না। সবারই নজর ছিল ইংল্যান্ড, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, বা দক্ষিণ আফ্রিকার দিকে।

"এবার চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ফাইনালে ওঠাটাই পাকিস্তানের জন্য এক বড় অর্জন, কারণ এটা যে হবে - তা কেউ ভাবে নি। সেদিক থেকে ফাইনালের ফলাফল যাই হোক, পাকিস্তান দল ইতিমধ্যেই একটা বড় সাফল্য পেয়ে গেছে।"

আসিফ ইকবাল বলছিলেন, এই পাকিস্তানের এই দলটির টুর্নামেন্টে শুরুটা ভালো হয় নি। ভারতেরকাছে ১২৪ রানে হেরেছিল তারা গ্রুপ পর্বের খেলায়। কিন্তু এর পর একে একে দক্ষিণ আফ্রিকা, শ্রীলংকা এবং সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে চমক লাগিয়েছে তারা।

এখন স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, পাকিস্তানের রয়েছে একটি দুর্দান্ত বোলিং লাইনআপ, এবং কয়েকজন আক্রমণাত্মক ব্যাটসম্যান।

আসিফ ইকবাল মনে করছেন, এই দলটির ক্ষমতা আছে ১৯৮০-৯০এর দশকের মতোই পাকিস্তান ক্রিকেটের গৌরবের দিন ফিরিয়ে আনার ।

ভারত আর পাকিস্তান হচ্ছে উপমহাদেশের ক্রিকেটের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি - যাদের লড়াইয়ের তুলনা ক্রিকেট বিশ্বে এ্যাশেজ ছাড়া আর কোথাও নেই - কারণ এর পেছনে জড়িয়ে আছে ১৯৪৭-এর ভারত ভাগ এবং একাধিক যুদ্ধের ইতিহাসও।

পাকিস্তানের সাবেক ক্রিকেটার এবং অধিনায়ক আসিফ ইকবাল এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার সাক্ষী সেই সূচনাপর্ব থেকেই । তিনি জন্মেছিলেন অবিভক্ত ব্রিটিশ ভারতের হায়দরাবাদে, তার পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছেন পাকিস্তানের হয়ে।

তিনি অবশ্য বলছিলেন, ভারত-পাকিস্তানের ইতিহাস যাই হোক, ক্রিকেটের লড়াই শুধু ক্রিকেটেই সীমাবদ্ধ -এর সাথে অন্য কিছুর কোন সম্পর্ক নেই।

আসিফ ইকবাল বলছিলেন, "এতে কোন সন্দেহই নেই যে পাকিস্তান আর ভারতের লড়াই - ক্রিকেট খেলার সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি। ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে যেমন এ্যাশেজ - ঠিক তেমনি । ভারত-পাকিস্তান যে কোন ক্রিকেট ম্যাচ দু'দেশের ক্ষেত্রে খেলার জগতের সবচেয়ে বড় ঘটনা। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে এ দুটি দেশ একে অপরকে পছন্দ করে না।

"আসল ব্যাপারটা হলো - দু'দেশই চায় একে অপরের কাছে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব দেখাতে এবং তা জাহির করতে। খেলোয়াড়রা এবং সমর্থকরাও এটা দেখাতে চায়। কিন্তু একে কেন্দ্র করে যে তিক্ততা, উন্মাদনা বা রেষারেষি - যা খেলার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে - সেটা অনেকটাই রাজনীতিবিদ এবং কিছুটা মিডিয়ার সৃষ্টি।"

"ভারত আর পাকিস্তানর মধ্যেকার বৈরিতার ইতিহাস, যুদ্ধ - এগুলোর কথা যারা বলেন, এর সাথে আসলে ক্রিকেটের কোন সম্পর্ক নেই। বরং আমি ক্রিকেটকে দুই দেশের মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবেই দেখি। আপনি রোববার ফাইনালের সময়ই এর দৃষ্টান্ত দেখতে পাবেন। দেখবেন, মাঠে ভারতীয় আর পাকিস্তানি সমর্থকরা পাশাপাশি বসে খেলা দেখছে। তারা যখন একে অপরকে খ্যাপাচ্ছে, ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করছে - তা স্রেফ মজা করার জন্যই করছে।"

"দু দেশেরই খেলোয়াড়রা এ ম্যাচটি জিততে চায়। তারা মাঠে জান-প্রাণ দিয়ে খেলে। কিন্তু খেলার পর দেখা যাবে এই খেলোয়াড়রাই আবার পরস্পরের কাঁধে হাত রেখে হাসি-ঠাট্টা করছে। আমি নিজে যখন খেলেছি, তখনও এমনই ছিল" - বলছিলেন আসিফ ইকবাল।

আসলে এক সময় পাকিস্তান দলের এই টুর্নামেন্টে খেলারই সম্ভাবনা ছিল না। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে টপকে কোন মতে তারা আট নম্বর র‍্যাংকিং পেয়ে এখানে খেলার সুযোগ পেয়েছে। আর এখন তারাই টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলছে।

আসিফ ইকবাল বলছিলেন, এ এক দারুণ ব্যাপার। এর কারণ, দলটিতে যে ক্রিকেটাররা রয়েছে তারা খুবই প্রতিভাবান। তারা খুবই সাধারণ পরিবার থেকে আসা, অনেকেরই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অভিজ্ঞতা খুবই সামান্য। কিন্তু তারাই এত ভালো খেলেছে, সেরা দলগুলোকে হারিয়ে ফাইনালে এসেছে।

তিনি বলছিলেন , পাকিস্তানের এই খেলোয়াড়দের জন্য আমার মনে হয় - তাদের খুব বেশি কোচিংএর দরকার নেই। মাঠে তাদের স্বাধীনভাবে নিজেদের মতো করে খেলতে দেয়া উচিত। কোচ এবং অধিনায়কের আসল দায়িত্ব হওয়া উচিত তাদের সুশৃঙ্খল রাখা, মাঠের বাইরে তাদের আচরণ ঠিক রাখা।

আসিফ ইকবালের মতে, "এই দলটির হাসান আলি, ফখর জামান, বাবর আজম, জুনায়েদ খান - এরা সবাই ভালো খেলোয়াড়। কিন্তু সবচেয়ে বেশি করে আমি যার কথা বলবো, সে হচ্ছে অধিনায়ক সরফরাজ আহমেদ। সে তার দলের সদস্যদের থেকে সেরা খেলাটা বের করে নিয়েছে।"

"এবার ফাস্ট বোলার মোহাম্মদ আমির এখনো তেমন সাফল্য পান নি। তার চাইতে এবার হাসান আলি বা অন্যদের বোলিং হয়তো বেশি চোখে পড়েছে - কিন্তু মনে রাখতে হবে তার দলে আমেরের উপস্থিতিটাই একটা বড় ব্যাপার। কারণ বিপক্ষ সব সময়ই আমিরের বল সাবধানে খেলে , আর অন্য বোলারদের মেরে রান করার চেষ্টা করে এবং তখনই তারা উইকেট হারায়।"

‌আসিফ ইকবাল বলছিলেন, "আমার মনে কোন সন্দেহ নেই যে এই পাকিস্তান দলটির মধ্যে আগেরকার যুগের মতোই একটি বড় দল হয়ে ওঠার সম্ভাবনা আছে। তবে হয়তো এটা হবে ৫০ ওভার এবং টি২০র মতো সীমিত ওভারের ক্রিকেটের ক্ষেত্রে। কিন্তু টেস্ট ক্রিকেটে নয়, কারণ তা ভিন্ন ধরণের খেলা।"

লন্ডনে দক্ষিণ এশীয়দের মধ্যেও সাড়া পড়েছে এই ফাইনালকে ঘিরে।

লন্ডনের ওভালে এই ফাইনালকে কেন্দ্র করে ভারত পাকিস্তানের মতোই ব্রিটেন প্রবাসী দক্ষিণ এশীয়দের মধ্যেও তৈরি হয়েছে উন্মাদনা। ব্রিটেনের এশিয়ান কমিউনিটিতে অনেকেই পরিকল্পনা করেছেন কিভাবে দল বেঁধে খেলা দেখবেন। অনেকে পিকনিকের পরিকল্পনা করেছেন।

লন্ডনে সাবেক বাংলাদেশী ক্রিকেটার এবং অনুর্ধ-২১ দলের সাবেক কোচ শহিদুল আলম রতন এ নিয়ে কথা বলেছেন বিবিসি বাংলার এ সপ্তাহের মাঠে ময়দানেতে।