হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় ইরানের প্রেসিডেন্ট এব্রাহিম রাইসি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমির আব্দুল্লাহিয়ান নিহতের ঘটনা ও সম্পর্কিত নানা খবর নিয়ে বিবিসি বাংলার লাইভ আপডেট এখানেই শেষ হলো। সারাদিনের ঘটনাপ্রবাহ পাবেন নিচের পোস্টগুলোতে।
আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
বিধ্বস্ত হেলিকপ্টার থেকে মরদেহ উদ্ধার করে নেয়া হয়েছে তাবরিজে
হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট এব্রাহিম রাইসি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির আবদোল্লাহিয়ানের মৃত্যুর খবরাখবর নিয়ে বিবিসি বাংলার লাইভ পাতা। এখানে পাবেন এ সংক্রান্ত তাৎক্ষণিক খবর এবং বিশ্লেষণ।
সরাসরি কভারেজ
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিবর্তনের দিকে নজর রাখবে পশ্চিমারা
আলী বাঘেরি কানিকে এখন অন্তর্বর্তী পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ফলে তার আগের পদ উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদটি এখন খালি হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রদূত এবং নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরের স্থায়ী প্রতিনিধি আমির সাঈদ ইরাভানিকে ওই পদে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে অনানুষ্ঠানিক প্রতিবেদনগুলোতে তুলে ধরা হচ্ছে।
নিহত পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে এখনও সমাহিত করা হয়নি এমন সময়ে তার নিয়োগ এবং প্রকাশ্য ঘোষণা গুরুত্বপূর্ণ মনে না হলেও সম্ভবত এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে একটি যার উপর পশ্চিমারা নজর রাখছে।
একজন অভিজ্ঞ কূটনৈতিক হিসেবে পরিচিত, ইংরেজিতে সাবলীল, আলোচনার শিষ্টাচারের সাথে পরিচিত এবং অতীতে সফল আলোচনা জড়িত ইরাভানির ভূমিকা ভবিষ্যতের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দুই সপ্তাহের মধ্যেই আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার বোর্ড অব গভর্নরস পরবর্তী বৈঠকের প্রস্তুতি নিতে যাচ্ছে। ফলে ইরানের পারমাণবিক ইস্যুতে আলোচনাকারীর শূন্য আসনের দিকে নজর এখন আরও তীব্র হবে।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে রাইসি লক্ষ্য অর্জন করতে পারেননি
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও রাইসির সমর্থকরা বলছেন এব্রাহিম রাইসি দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় শহীদ হয়েছেন। তারা তাকে সুবিধাবঞ্চিত ও দরিদ্রদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।
ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান ও প্রেসিডেন্সিয়াল পদপ্রার্থী হিসেবে ২০২১ সালে তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। একইসাথে মুদ্রাস্ফীতি মোকাবেলা এবং দরিদ্র ইরানিদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে কয়েক লাখ বাড়ি নির্মাণেরা প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার সমর্থন পেয়েছিলেন রাইসি। ইরানের প্রাক্তন রেভুলিউশনারি গার্ডদের পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ দিয়েছিলেন।
প্রেসিডেন্ট পদে এক হাজার দিন পার করার পর এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে তিনি প্রেসিডেন্সিয়াল প্রচারণার সময় যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন সেসব লক্ষ্যের কোনোটিই অর্জন করতে পারেননি।
ইরানিরা তিন বছর আগের থেকেও দরিদ্র এখন। যুক্তরাষ্ট্রের ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রার মূল্য মারাত্মকভাবে কমে গেছে।
ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের ইতিহাসের সর্বোচ্চ মুদ্রাস্ফীতি রয়েছে এবং তিনি স্বল্পমূল্যে বাড়ি নির্মাণের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তাও পালন করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
প্রেসিডেন্ট রাইসির মৃত্যুতে জাতিসংঘ মহাসচিবের শোক প্রকাশ
জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস ইরানের প্রেসিডেন্ট এব্রাহিম রাইসি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমির আব্দুল্লাহিয়ান এবং তার সহকর্মীদের মৃত্যুতে গভীর দুঃখপ্রকাশ করেছেন।
মহাসচিবের মুখপাত্র এ সংক্রান্ত একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছেন।
এতে মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক বলেছেন, "ইসলামd প্রজাতন্ত্র ইরানের জনগণ, সরকার এবং দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা প্রকাশ করেছেন মহাসচিব।"
বার্তা সংস্থা এ এফ পি জানিয়েছে, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরাও হেলিকপ্টার বিধ্বস্তে নিহতদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করেছেন।
ইরানের নিহত পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমির আব্দুল্লাহিয়ান কে ছিলেন ?,
প্রেসিডেন্ট রাইসির সাথে হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে নিহত হয়েছেন ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের ৬০ বছর বয়সী পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমির আব্দুল্লাহিয়ান। তিনি এই প্রজাতন্ত্রে গত দুই দশক ধরে কূটনীতিকের দায়িত্ব পালন করেছেন। একইসাথে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন।
২০০৭ সালের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরাকের কর্মকর্তাদের সাথে সংলাপে অংশ নেয়া কূটনৈতিক দলটির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা তাকে এতোটাই বিশ্বাস করতেন খুব সীমিত ত্রি-পক্ষীয় এই কথোপকথনের অনুমতি দিয়েছিলেন তাকে।
পরবর্তীতে তাকে তখনকার প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের প্রশাসনের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। যখন ২০১৩ সালে হাসান রুহানি ক্ষমতায় আসেন তখনও তিনি এ পদে বহাল খাকেন। সেসময় মোহাম্মদ জাভেদ জারিফকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল।
জারিফ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনায় নেতৃত্ব দেন যার ফলস্বরূপ ২০১৫ সালে ইরানের পারমানবিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং তিনি আমির আব্দুল্লাহিয়ানকে তার পদ থেকে বরখাস্ত করেন।
এই পদক্ষেপ ইরানের কট্টরপন্থীদের ক্ষুব্ধ করেছিল। একইসাথে এটাকে জারিফ ও আমির আব্দুল্লাহিয়ানের মধ্যে দ্বন্দ শুরুর চিহ্ন হিসেবে দেখা হয়েছিল।
যখন এব্রাহিম রাইসি প্রেসিডেন্ট হন, তখন আমির আব্দুল্লাহিয়ান ফিরে এসে নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে জারিফের কাছ থেকে ক্ষমতা নিয়ে নেন। কয়েক বছর আগে যে ব্যক্তি তাকে বরখাস্ত করেছিল।
ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের জন্য আরো সুবিধাজনক শর্তে পারমাণবিক চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করার জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে বাইডেন প্রশাসনের সাথে আমির আব্দুল্লাহিয়ানের পরোক্ষ আলোচনার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
শেষ দুই বছরে আমির একাধিকবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তর পরিদর্শন করেছিলেন কিন্তু ইরানে বিক্ষোভকারীদের উপর রক্তক্ষয়ী দমন সম্পর্কিত প্রশ্ন এড়িয়ে গেছেন।
একবার তিনি দাবি করেছিলেন এসব বিক্ষোভে কেউই নিহত হয়নি।
হেলিকপ্টার বিধ্বস্তে নিহত অন্যদের সম্পর্কে যা জানা যাচ্ছে
হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট এব্রাহিম রাইসির সাথে রোববার আরো সাতজন নিহত হয়েছেন। তাদের সম্পর্কে যা জানা যাচ্ছে...
ইরানের শীর্ষ কূটনীতিকদের একজন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমির আব্দুল্লাহিয়ান এবং ইরানের পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের গভর্ণর মালিক রাহমাতিও এ দুর্ঘটনায় নিহত হন।
নিহত অন্য যাত্রীদের মধ্যে ছিলেন প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধান মোহাম্মদ মেহদী মৌসাভি, সহ-পাইলট কর্ণেল মহসেন দারইয়ানুস এবং কর্ণেল সৈয়দ তাহের মোস্তাফাভি। এছাড়াও টেকনিশিয়ান মেজর বাহরুজ কাদিমী।
বিমানে আরো ছিলেন তাবরিজের শুক্রবারের ইমাম মোহাম্মদ আলি আল-এ হাশেম। ইরানের ক্রাইসিস ম্যানেজম্যান্ট এজেন্সির প্রধানের তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার পরও তিনি এক ঘণ্টা বেঁচে ছিলেন এবং প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলেন।
ইরানের আঞ্চলিক নীতি অপরিবর্তিত থাকবে,
আয়াতোল্লাহ আলি খামেনি'র ঘনিষ্ঠজনদের একজন ছিলেন প্রয়াত প্রেসিডেন্ট এব্রাহিম রাইসি।
ইরানের আঞ্চলিক নীতিমালা খামেনির হাতেই নির্ধারিত হয়।
বর্তমান অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মোখবারও একই আদর্শের অনুসারী। তিনিও খামেনির ঘনিষ্ঠ।
অতএব, ইরানের আঞ্চলিক নীতি অপরিবর্তিতই থাকবে।
রাইসির মৃত্যু কুদস্ ফোর্সের সাবেক কমান্ডার কাসেম সোলেইমানির মৃত্যুর মতো প্রভাব তৈরি করার কথা নয়। মি. সোলেইমানি আঞ্চলিক রাজনীতির পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
তার মৃত্যুতে ইরান এবং তার আঞ্চলিক মিত্ররা বিশেষ করে হেজবুল্লাহ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। এরপর কী হবে, বুঝে উঠতে পারছিল না তারা। পরে অবশ্য অবস্থান পাল্টে নিজেদের ক্ষমতা রক্ষায় মনোযোগী হয়েছিল তারা।
বর্তমানে, গাজা যুদ্ধই অঞ্চলটিতে মনোযোগের কেন্দ্রে রয়েছে। হেজবুল্লাহ'র ভাবনা যুদ্ধ যাতে লেবাননে না ছড়ায়, সেটি নিয়ে।
ইরানের অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্টকে পুতিনের ফোন, সম্পর্ক জোরদারের অঙ্গীকার
কিছুক্ষণ আগে জানা গেছে, ইরানের সদ্য দায়িত্ব নেয়া অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মোখবারকে ফোন করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
ফোনালাপে এব্রাহিম রাইসিকে একজন "নির্ভরযোগ্য অংশীদার" বলে অভিহিত করেন পুতিন।
ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
বলা হয়েছে, দুই নেতা "রাশিয়া-ইরানের সম্পর্ক আরো শক্তিশালী করতে পারস্পরিক মনোভাব" ব্যক্ত করেছেন।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণ মাত্রার হামলার সময় থেকেই মস্কোর গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সহযোগী হয়ে উঠেছে ইরান।
এর আগে, এব্রাহিম রাইসির মৃত্যুতে শোক জানান রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
রাইসিকে একজন "অসাধারণ রাজনীতিবিদ" এবং "রাশিয়ার সত্যিকারের বন্ধু" হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন তিনি।
হেলিকপ্টারের সন্ধান পাওয়ার পর চাঁদ-তারা এঁকেছিল তুর্কি ড্রোন
আবারো আলোচনায় এলো তুরস্কের ড্রােন।
বার্তা সংস্থা আনাদোলু এজেন্সি জানায়, কয়েক ঘণ্টা খোঁজাখুঁজির পর ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে দেশটির প্রেসিডেন্টের হেলিকপ্টারের সন্ধান পায় তুরস্ক থেকে পাঠানো ড্রােন।
এই ড্রোনটির নাম বায়রাকতার আকিঞ্জি।
এর আগে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য আলোচনায় আসে এই সিরিজেরই আরেকটি মডেল বায়রাকতার টিবিটু।
সোমবার ভোরে হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার এলাকায় একটি 'হিট সোর্স' (উত্তপ্ত স্থান) শনাক্ত করে আকিঞ্জি।
পরে সেখানেই ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়া যায়।
বহু মানুষ ফ্লাইট রাডার অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে ড্রোনটির গতিপথে চোখ রাখছিলেন বলে জানায় আনাদোলু এজেন্সি।
তারা একটি কৌতূহলোদ্দীপক দৃশ্য দেখে থাকবেন।
ইরান থেকে তুরস্কের ঘাঁটিতে ফেরার পথে ফ্লাইট ম্যাপে নিজের গতিপথ ব্যবহার করে চাঁদ ও তারা আঁকে ওই বায়রাকতারটি।
তুরস্কের জাতীয় পতাকায় চাঁদা-তারা প্রতীক রয়েছে।
আনাদোলু ফ্লাইট ম্যাপের একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে।
বিধ্বস্ত হেলিকপ্টার থেকে মরদেহ উদ্ধার করে নেয়া হবে তাবরিজে
ঘন কুয়াশার কারণে রোববার রাতে উদ্ধার তৎপরতা চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। তবে আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধার কাজে গতি বাড়ে।
তুর্কি বার্তা সংস্থা আনাদোলু এজেন্সি জানায়, প্রথমে তুরস্কের বায়রাকতার আকিঞ্জি ড্রোন অবস্থান সনাক্ত করে। সেখানকার অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ ইরানি কর্তৃপক্ষকে জানায় তারা।
পরে উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
রেড ক্রিসেন্ট সদস্য ও অন্যদের ধারণ করা বিভিন্ন ভিডিও প্রকাশ করে বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো।
তাতে দেখা যায়, স্ট্রেচারে করে মৃতদেহ বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবকরা। কুয়াশাচ্ছন্ন পাহাড়ি অসমতল পথে তাদেরকে বেশ বেগ পেতে হচ্ছিল।
ইরানের বিপ্লবী গার্ডস এর ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম তাসনিম জানায়, সবগুলো মরদেহই তাবরিজে নিয়ে যাওয়া হবে। কাল শেষকৃত্যের আগ পর্যন্ত সেখানকার ফরেনসিক বিভাগেই থাকবে লাশ।
প্রেসিডেন্ট রাইসি এবং তার সহচরদের গন্তব্যই ছিল তাবরিজ শহর।
আরেকটিতে ভিডিওতে, হেলিকপ্টারের একটি দরজা পড়ে থাকতে দেখা গেছে। দরজায় লেখা ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান। সেখানে সমবেত হয়ে আছেন অনেকে। পোশাক দেখে যাদের সেনাসদস্য বলেই প্রতীয়মান হয়।
অন্য এক ভিডিওতে দেখা যায়, পাহাড়ের পাদদেশে জড়ো হয়েছেন ইরানের সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তারা।
মন্ত্রিসভায় অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্টের বক্তব্য
ইরানের মন্ত্রিসভার বৈঠকে বক্তব্য রেখেছেন নবনিযুক্ত অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মোখবার।
রয়টার্সের ছবিতে দেখা যায়, বৈঠকে মাঝখানের আসনটি ফাঁকা রাখা হয়েছে।
তাতে কালো উত্তরীয়'র মতো একটি কাপড় রাখা।
তেহরানে অনুষ্ঠিত হয়েছে বৈঠকটি।
আগামী প্রায় দুই মাসের জন্য প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন মি. মোখবার।
ইমাম দুর্ঘটনার পরেও এক ঘণ্টা বেঁচে ছিলেন
আরো কিছু বিস্তারিত তথ্য এসেছে দুর্ঘটনার ব্যাপারে। বিক্ষিপ্ত দৃশ্যটা এখন আকার পাচ্ছে।
হেলিকপ্টার আরোহীদের মধ্যে ছিলেন মোহাম্মদ আলী আল-হাশেম। মি. হাশেম তাবরিজের জুমার ইমাম ছিলেন। এছাড়াও তিনি ছিলেন সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধি।
ইরানের ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট এজেন্সি'র প্রধান মোহাম্মদ নামি'র মতে আল হাশেম দুর্ঘটনার পরেও পুরো একটি ঘণ্টা বেঁচে ছিলেন। এমনকি তিনি প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ে যোগাযোগেরও চেষ্টা করেছিলেন।
"আরোহীদের সনাক্ত করতে কোনো ডিএনএন টেস্টের প্রয়োজন নেই," বলেন মি. নামি।
ক্রুসহ সর্বমোট নয়জন এই দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেছেন।
'ভালো' এবং 'সত্যিকারের' বন্ধু হারানোয় পুতিন এবং শি-র শোক
এব্রাহিম রাইসির মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
রাইসিকে একজন "অসাধারণ রাজনীতিবিদ" এবং "রাশিয়ার সত্যিকারের বন্ধু" হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন তিনি।
বার্তা সংস্থা এএফপি এ তথ্য জানিয়েছে।
পুতিন বলেন, রাইসি তার সমগ্র জীবন দেশের সেবায় এবং "প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্কোন্নয়নে" উৎসর্গ করেছিলেন।
২০২২ সালে পূর্ণমাত্রায় ইউক্রেনে আক্রমণ চালানোর সময় থেকেই, ইরান রাশিয়ার প্রধানতম মিত্রদের একটি হয়ে ওঠে।
শোক জানিয়েছেন ইরানের আরেক ঘনিষ্ঠ মিত্র চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।
মি. জিনপিং রাইসিকে চীনের জনগণের "ভালো বন্ধু" হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
রয়টার্সের প্রতিবেদন থেকে আরো জানা যাচ্ছে, রাইসির "দুঃখজনক মৃত্যকে" ইরানের জনগণের জন্য "বিশাল ক্ষতি" হিসেবে উল্লেখ করেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট।
ইরানের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার চীন। নিষেধাজ্ঞারে আওতায় থাকা ইরানের জ্বালানি তেলের অন্যতম প্রধান ক্রেতাও দেশটি।
এখন পর্যন্ত ইসরায়েলের সংশ্লিষ্টতার কোনো ইঙ্গিত নেই,
প্রেসিডেন্ট রাইসির মৃত্যুতে বিশ্ব নেতারা শোক বা প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। তবে, ইসরায়েল পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণে রাখবে অথবা সতর্কতার সাথে প্রতিক্রিয়া জানাবে।
তারা খেয়াল রাখছেন, ইরানের পক্ষ থেকে কোনো চক্রান্তের ইঙ্গিত দেয়া হয় কিনা।
ইসরায়েলের সম্পৃক্ততার ন্যূনতম আভাস থাকলেও, হোক তা সত্যি বা সন্দেহমূলক, এই অঞ্চলকে তা নতুন সংকটে ঠেলে দেবে।
এখন পর্যন্ত অবশ্য তেমন কোনো ইঙ্গিত নেই।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বরং হেলিকপ্টার দুর্ঘটনার জন্য খারাপ আবহাওয়ার ওপরই জাের দিচ্ছে।
এবং ইসরায়েলের কর্মকর্তারা গোপনে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোকে জানাচ্ছে যে ইরানে প্রেসিডেন্টের মৃত্যুর পেছনে তাদের হাত নেই।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর শোক
হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় ইরানের প্রেসিডেন্ট এব্রাহিম রাইসি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমির আবদুল্লাহিয়ান ও তাদের সফরসঙ্গীদের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মোখবারকে লেখা এক চিঠিতে শেখ হাসিনা এই শোক প্রকাশ করেছেন।
চিঠিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দুঃখের এই সময়ে, বাংলাদেশ সরকার ও আমার নিজের পক্ষ থেকে আমি ইরানের সরকার ও ভ্রাতৃপ্রতীম দেশটির জনগণের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।’
"প্রেসিডেন্ট সাঈদ রাইসি একজন জ্ঞানী ও নিঃস্বার্থ নেতা ছিলেন-যিনি তার দেশের সেবায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন এবং ইরানের জনগণের কল্যাণে কাজ করে গেছেন।" যোগ করেন তিনি।
ঘটনাস্থলের ছবি
বিধ্বস্ত হেলিকপ্টারটি সম্পর্কে যা জানা যাচ্ছে?,
ইরানের গণমাধ্যম জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বহনকারী হেলিকপ্টারটি ছিল বেল ২১২।
কপ্টারটি বয়স সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে, এই মডেলটি কানাডার সামরিক বাহিনীর জন্য ১৯৬০ সালে তৈরি করা হয়েছিল।
মনে করিয়ে দেয়া যেতে পারে, ইরানের ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্যদের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ শুরু হয়। পরবর্তী কয়েক দশক ধরে নিষেধাজ্ঞাগুলো চলমান।
যাহোক, মার্কিন কোম্পানি বেল হেলিকপ্টার ওই উড়োযানগুলো নির্মাণ করে। বিশ্বজুড়ে অনেক সরকারি-বেসরকারি সংস্থা সেগুলো ব্যবহার করে আসছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং থাইল্যান্ড পুলিশের মতো বাহিনীগুলোতেও এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।
ফ্লাইটগ্লোবালের ২০২৪ সালের ওয়ার্ল্ড এয়ার ফোর্সেস ডিরেক্টরি অনুযায়ী, ইরানের নৌ ও বিমান বাহিনীর কাছে মোট ১০টি বেল হেলিকপ্টার রয়েছে।
তবে, দেশটির সরকার কতটি পরিচালনা করে তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
যেকোনো উদ্দেশ্যেই এই এয়ারক্র্যাফটগুলোকে ব্যবহার করা যায়। মানুষ বা পণ্য পরিবহন তো বটেই অস্ত্র সজ্জিত করে যুদ্ধের জন্যও এগুলো উপযোগী।
রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত বার্তা সংস্থা জানায়, প্রেসিডেন্টকে বহনকারী কপ্টারে ছয় জন যাত্রী এবং তিনজন ক্রু ছিলেন।
ফ্লাইট সেফটি ফাউন্ডেশন নামে একটি অলাভজনক সংস্থার মতে, বেল ২১২ - এর সর্বশেষ মারাত্মক দুর্ঘটনাটি ঘটে ২০২৩ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে। দেশটির উপকূলে উড্ডয়নের সময় বিধ্বস্ত হয় ব্যক্তি মালিকানাধীন একটি হেলিকপ্টার।
ইরানে এর আগে ২০১৮ সালে সর্বশেষ একটি বেল ২১২ দুর্ঘটনায় শিকার হয়। একজন হার্ট অ্যাটাকের রোগীকে উদ্ধারে কাজ করছিল এটি।
রাইসি'র শেষকৃত্য আগামীকাল
ইরানের সংবাদমাধ্যম তাসনিম জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট এব্রাহিম রাইসি'র শেষকৃত্য আগামীকাল তাবরিজে অনুষ্ঠিত হবে।
গতকাল তাবরিজের উদ্দেশেই রওনা করেছিলেন রাইসি ও তার সফরসঙ্গীরা।
সংবাদমাধ্যম তাসনিমের দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশানি গার্ডস্ কোরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
ইরানের পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের কর্মকর্তাদের উদ্ধৃৃত করে তাসনিম আরো জানিয়েছে, প্রেসিডেন্টের পাশাপাশি তার নিহত সফরসঙ্গীদের শেষকৃত্যও হবে সেখানে।
তার আগে, মরদেহগুলো তাবরিজের ফরেনসিক বিভাগে রাখা হবে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনি এক আনুষ্ঠানিক বিৃবতিতে প্রেসিডেন্ট রাইসির স্মরণে পাঁচদিনের শোক ঘোষণা করেছেন।
দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা ইরানের উড়োযানগুলোকে অনিরাপদ করে ফেলেছে,
ইরানি গণমাধ্যমগুলোকে এখন পর্যন্ত কোনো চক্রান্তের কথা বলেনি।
ভয়াবহ আবহাওয়া পরিস্থিতিই তাদের খবরে উঠে এসেছে এবং এই দুর্ঘটনার জন্য সেটিকেই একমাত্র কারণ হিসেবে ধারণা করা হচ্ছে।
যাই হোক, প্রেসিডেন্ট রাইসির অনেক শত্রু ছিল। তিনি মারা যাওয়ায় খুশি হবেন অনেকে।
গত শতাব্দীর ৮০'র দশকে বহু ভিন্ন মতাবলম্বীর মৃত্যু পরোয়ানা লিখেছেন তিনি। ওই মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা মূলত বামপন্থী ছিলেন।
২০২১ সাল থেকে ক্ষমতায় ছিলেন মি. রাইসি। এই সময়টায় ইরানের অভ্যন্তরে ব্যাপক ক্র্যাকডাউন(কঠোর পদক্ষেপ) চালানো হয়।
তাছাড়া, তিনি শীর্ষ পদের দৌঁড়ে ছিলেন, যে পথে শত্রু তৈরি হওয়া খুবই স্বাভাবিক।
কিন্তু তিনি শত্রুতার শিকার হয়েছেন, তেমন কোনো প্রমাণ আমাদের হাতে নেই।
ইরানে সবসময়ই ইসরায়েলকে দোষারোপ করার একটা প্রবণতা আছে। ইসরায়েলি সাংবাদিকদের দেশটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এর সঙ্গে তাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।
যুদ্ধের বিচারে এটি হতো খুবই উসকানিমূলক। তাতে ইসরায়েলের কী লাভ হতো তা বলা দুষ্কর।
খারাপ আবহাওয়ার ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় বিবেচনায় নেয়া উচিত। তা হলো, বছরের পর বছর নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকায় ইরানের এয়ারক্র্যাফটগুলো অনিরাপদ হয়ে পড়েছে। কারণ, তারা স্পেয়ার পার্টস্(খুচরা যন্ত্রাংশ) বা এয়ারফ্রেম (নতুন কাঠামো) পেতো না।
১৯৯০ সালে ইরানে একটি বড় ধরনের ভূমিকম্পের খবর সংগ্রহ করতে গিয়েছিলাম। আমি শাহ আমলে কেনা একটি আমেরিকান হেলিকপ্টার ব্যবহার করেছিলাম।
কিছুদিন পর জানলাম, সেই হেলিকপ্টারটি সব আরোহীসহ বিধ্বস্ত হয়েছে।
ইরানে নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিয়োগ
ইরানের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন মন্ত্রণালয়ে উপমন্ত্রী আলি বাঘেরি কানি।
বার্তাসংস্থা রয়টার্স এ তথ্য জানিয়েছে।
হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমিরাব্দোল্লাহিয়ানের মৃত্যুর পরে মন্ত্রণালয়েরর দায়িত্ব পুনর্বন্টন করে দেশটির মন্ত্রিসভা।
নির্বাহী, সংসদ ও বিচার, সরকারের তিন বিভাগের এক বৈঠকের পর ঘোষণাটি আসে।